১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়ের ভিত্তি—পাকিস্তানমুখী নীতিগত পরিবর্তন সেই ভিত্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। ছবি: Elliott Brown, CC BY
মেলবোর্ন ৩১ জানুয়ারি: গত কয়েক মাসে পাকিস্তানের প্রতি বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থানে নরম সুর লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এই পরিবর্তন উদ্বেগ তৈরি করেছে এবং বিদেশি মিত্রদের মধ্যেও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। পাকিস্তানের প্রতি নীতিগত নমনীয়তা বাংলাদেশের ইতিহাস, জাতীয় ঐক্য ও কূটনৈতিক অবস্থানকে নতুন করে সংকটে ফেলেছে।
১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে পাকিস্তান থেকে স্বাধীনতা অর্জনের পর পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ যে নীতিগত অবস্থান ধরে রেখেছিল, সাম্প্রতিক এই পরিবর্তন সেই ঐতিহাসিক অবস্থানের ওপর এক ধরনের পুনর্বিবেচনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এর মূল্য শুধু কূটনৈতিক ক্ষেত্রেই নয়, সামাজিক ঐক্য, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থের ক্ষেত্রেও বহুমাত্রিক।
বাংলাদেশের জনগণের কাছে পাকিস্তান মানেই ১৯৭১ সালের স্মৃতি—গণহত্যা, নির্যাতন, বাস্তুচ্যুতি এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের এক ভয়াবহ অধ্যায়। এই স্মৃতি শুধু ইতিহাস নয়, বরং জাতীয় চেতনার অংশ।
অন্তর্বর্তী সরকারের পাকিস্তানমুখী কোনো অবস্থান, বাস্তব বা প্রতীকী—অনেকের কাছে তা যেন ইতিহাস থেকে সরে যাওয়ার শামিল। এটি পাকিস্তানকে যুদ্ধাপরাধের দায় থেকে মুক্ত করে দেওয়ার মতো বার্তা দেয় এবং লাখো শহীদের ত্যাগ ও নির্যাতিত মানুষের কষ্টকে উপেক্ষা করার অনুভূতি সৃষ্টি করে।
এই নীতিগত পরিবর্তন ইতিহাসকে পুনর্মূল্যায়নের নয়, বরং বিস্মরণের পথে ঠেলে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে। এখনো অনিষ্পন্ন তিনটি মৌলিক প্রশ্ন—গণহত্যার জন্য আনুষ্ঠানিক ক্ষমা, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং প্রকৃত ঐতিহাসিক সমঝোতা—পেছনে পড়ে যাচ্ছে।
ফলত মুক্তিযোদ্ধা, ১৯৭১–এর প্রত্যক্ষ সাক্ষী এবং ইতিহাস বইয়ে মুক্তিযুদ্ধ শেখা তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে।
পাকিস্তানের প্রতি নীতিগত নমনীয়তা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নতুন বিভাজন সৃষ্টি করছে। অধিকাংশ বাংলাদেশির কাছে পাকিস্তান এখনো “বহিরাগত নিপীড়ক”—অস্বীকার, দমন ও ঐতিহাসিক অন্যায়ের প্রতীক।
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও মূল্যবোধের ওপর দাঁড়িয়ে গড়ে ওঠা জাতীয় ঐক্য এই নীতিগত পরিবর্তনে দুর্বল হয়ে পড়ছে। এতে আদর্শিক ও প্রজন্মগত ব্যবধান আরও গভীর হচ্ছে।
বাংলাদেশ ইতিমধ্যে রাজনৈতিক বিভাজন, অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও সামাজিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকার উন্নয়ন ও গণতান্ত্রিক সংস্কারের বদলে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে মনোযোগ দিচ্ছে—যা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার বদলে বিভক্ত করছে এবং পররাষ্ট্রনীতিকে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে পরিণত করছে।
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি নীতিনিষ্ঠ ও বাস্তববাদী রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত ছিল—যার ভিত্তি ছিল আত্মনিয়ন্ত্রণ, ধর্মনিরপেক্ষতা, স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি। পাকিস্তানমুখী এই ঝোঁক সেই পরিচিতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
অন্যদিকে পাকিস্তান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সামরিক আধিপত্য, সন্ত্রাসবাদ সংশ্লিষ্ট অভিযোগ এবং বৈশ্বিক শক্তিগুলোর সঙ্গে জটিল সম্পর্কের কারণে অনেকাংশে বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচিত। ফলে পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থেকে বাংলাদেশ বাস্তবিক অর্থে কতটা কৌশলগত লাভ পেতে পারে, তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই নীতিগত পরিবর্তন বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের লাভজনক ও স্থিতিশীল অংশীদারিত্বকে দুর্বল করতে পারে। উন্নয়ন সহায়তা, বিনিয়োগ, বাজার সুবিধা ও আন্তর্জাতিক মর্যাদায় অবদান রাখা দেশগুলো এখন বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক দিকনির্দেশনা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে।
কূটনীতিতে প্রতীক ও বার্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তানকে ঘিরে কোনো প্রতীকী অবস্থানও বাংলাদেশের অর্জিত আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও পাকিস্তানমুখী নীতি বাংলাদেশের জন্য বড় সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। গত কয়েক দশকে বাংলাদেশ যে প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে, তা এসেছে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ, প্রযুক্তি বিনিময়, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশাধিকার থেকে।
অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত পাকিস্তানের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক বাংলাদেশের জন্য বাস্তবিক কোনো বড় সুবিধা এনে দেবে না। বরং স্থিতিশীল ও গতিশীল অর্থনীতির দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করলে বাংলাদেশের উন্নয়ন সম্ভাবনা আরও বাড়তে পারে।
পররাষ্ট্রনীতিতে অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের আস্থা সম্পূর্ণভাবে কমে গেছে। আর যদি বাংলাদেশ ধর্মীয় আবেগ, ও ঐতিহাসিক বিতর্কে জড়িত কোনো জোটের দিকে ঝুঁকে পড়ে, তবে তা দেশটির আধুনিক, স্থিতিশীল ও ভবিষ্যতমুখী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে ওঠা ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
শত্রুতা নয়, বরং ন্যায়বিচার ও ইতিহাসের সত্যের ভিত্তিতে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণই টেকসই পথ। ন্যায়বিচার ছাড়া সমঝোতা হলে তার মূল্য ভয়াবহ হতে পারে।
জাতীয় ঐক্য পুনর্গঠন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশের সরকারকে অবশ্যই ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনার প্রতি প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করতে হবে। পররাষ্ট্রনীতি এমন হতে হবে, যা জনগণের স্বাধীনতার অনুভূতি, ঐতিহাসিক স্মৃতি ও ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে না যায়।
কারণ ইতিহাসকে উপেক্ষা করে কোনো রাষ্ট্র দীর্ঘদিন এগোতে পারে না। আর যে রাষ্ট্র তার আত্মপরিচয় ভুলে যায়, তার ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
অনুবাদ: OTN বাংলা | সূত্র: Sunday Guardian | লেখক: Ashu Maan