বাংলাদেশ

আল-জাজিরার বিশ্লেষণ

বাংলাদেশের নির্বাচনে ভারত, চীন ও পাকিস্তানের জন্য কী প্রত্যাশা ও ঝুঁকিগুলো কী

  • 4:19 am - February 03, 2026
  • পঠিত হয়েছে:১২১ বার
বাংলাদেশের জুলাই আন্দোলন। ছবিঃ ওটিএন বাংলা

মেলবোর্ন, ৩ ফেব্রুয়ারি- প্রায় দুই বছর আগে ২০২৪ সালের ছাত্রনেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর এবার প্রথমবারের মতো জাতীয় নির্বাচনের দিকে যাচ্ছে বাংলাদেশ। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই নির্বাচনকে ঘিরে শুধু দেশের ভেতরেই নয়, আঞ্চলিক রাজনীতিতেও ব্যাপক কৌতূহল ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে প্রতিবেশী ও প্রভাবশালী দেশ ভারত, চীন এবং পাকিস্তান নিবিড়ভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।

বর্তমানে বাংলাদেশ একটি অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে, যার নেতৃত্বে রয়েছেন নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। এই নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের মধ্যে। জানুয়ারির শেষ দিক থেকে দুই দলই আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেছে।

অন্যদিকে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ এবারের নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলন দমনে কঠোর ও প্রাণঘাতী অভিযানের অভিযোগে দলটিকে নির্বাচন থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে অনুপস্থিতিতে বিচারের মাধ্যমে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেন। তবে ভারত এখনো তাকে বাংলাদেশে প্রত্যর্পণ করেনি। শেখ হাসিনা আসন্ন নির্বাচনকে প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, অংশগ্রহণহীন কোনো সরকার বিভক্ত জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারে না।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে একটি বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। স্বাধীন বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের শিক্ষক খন্দকার তাহমিদ রেজওয়ান বলছেন, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে সবচেয়ে নিচে নেমেছে, বিপরীতে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উষ্ণ হয়েছে এবং চীনের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে।

শেখ হাসিনার প্রায় ১৫ বছরের শাসনামলে ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল অনেকটাই শীতল এবং চীনের সঙ্গে প্রতিরক্ষা, অবকাঠামো ও বাণিজ্যিক সহযোগিতা বজায় ছিল হিসাব করে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই বিন্যাস অনেকটাই বদলে গেছে।

ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কের গতিপথ

শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকাকালে ভারত বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার হিসেবে দেখত। বাংলাদেশ ভারতের এশিয়ার সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদারদের একটি। ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৪ সালের মার্চ পর্যন্ত সময়ে ভারত বাংলাদেশে প্রায় ১১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছিল, যার মধ্যে ছিল বিদ্যুৎ, বস্ত্র, কৃষিপণ্য ও ইস্পাত। একই সময়ে বাংলাদেশ থেকে ভারত প্রায় ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করে।

তবে শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ে এবং স্থল ও নৌপথে বাণিজ্যে নানা বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ওঠানামা করেছে। বিএনপি ও জামায়াত দীর্ঘদিন ধরেই আওয়ামী লীগের ভারতঘেঁষা নীতির সমালোচনা করে এসেছে।

২০২৪ সালে শেখ হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাব আরও জোরালো হয়, বিশেষ করে তাকে প্রত্যর্পণ না করায়। এর মধ্যে আন্দোলনের এক নেতার হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে ভারতবিরোধী বিক্ষোভ এবং সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগে সম্পর্ক আরও তলানিতে ঠেকে।

বিশ্লেষকদের মতে, আসন্ন নির্বাচন ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের প্রত্যাশা, নতুন সরকার যেন দিল্লির সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী হয় এবং এমন শক্তির প্রভাবমুক্ত থাকে, যাদের ভারত নিজের নিরাপত্তার জন্য হুমকি মনে করে। তবে ক্ষমতায় যে দলই আসুক, ভারতের মতো বড় প্রতিবেশীকে উপেক্ষা করা কঠিন হবে বলেই মত বিশ্লেষকদের।

পাকিস্তান ও বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠতা

শেখ হাসিনার পতনের পর পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক দ্রুত উষ্ণ হয়েছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ইউনূসের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করেছেন। দীর্ঘদিন পর দুই দেশের মধ্যে সরাসরি বাণিজ্য ও বিমান চলাচল আবার শুরু হয়েছে। সামরিক ও প্রতিরক্ষা পর্যায়েও আলোচনা হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তান মূলত প্রতিরক্ষা ও সাংস্কৃতিক কূটনীতির মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রভাব বাড়াতে চায়। এর একটি বড় লক্ষ্য হচ্ছে ভারতের পূর্ব সীমান্তে কৌশলগত চাপ তৈরি করা। পাকিস্তান প্রকাশ্যে শেখ হাসিনার পতন নিয়ে মন্তব্য না করলেও রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুযোগ নিতে আগ্রহী।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় এলে পাকিস্তান সবচেয়ে বেশি সন্তুষ্ট হবে। তবে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার এলেও পাকিস্তান আপত্তি করবে না। তবে ইসলামাবাদ চায় না, বিএনপি আবার ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করুক।

চীনের অবস্থান ও আগ্রহ

চীন বরাবরই বাংলাদেশে একটি বাস্তববাদী নীতি অনুসরণ করেছে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের পক্ষে থাকলেও ১৯৭৫ সালের পর থেকে বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ক ধারাবাহিকভাবে এগিয়েছে। শেখ হাসিনার সময় যেমন বড় বড় প্রকল্পে চীনা বিনিয়োগ হয়েছে, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারও সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে। প্রায় ২ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারের চীনা বিনিয়োগ, ঋণ ও সহায়তা ইতোমধ্যে নিশ্চিত হয়েছে।

চীন বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ায় তাদের কৌশলগত অবস্থানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। বিশ্লেষকদের মতে, বেইজিং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ না করে সব বড় রাজনৈতিক দলের সঙ্গেই যোগাযোগ রাখছে। জামায়াত ও বিএনপি উভয় দলের সঙ্গেই চীনা প্রতিনিধিদের বৈঠক হয়েছে।

চীনের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং তাদের বিনিয়োগ ও কৌশলগত স্বার্থের নিরাপত্তা। কে ক্ষমতায় আসবে, সে বিষয়ে চীনের স্পষ্ট কোনো পক্ষপাত নেই। যে দলই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে, চীন তাদের সঙ্গেই কাজ করতে প্রস্তুত থাকবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সব মিলিয়ে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন শুধু বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতিই নয়, দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত ভারসাম্যকেও প্রভাবিত করতে পারে। ভারত, পাকিস্তান ও চীন প্রত্যেকেই নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী এই নির্বাচনের ফলাফলের দিকে তাকিয়ে আছে, আর সেই ফলই নির্ধারণ করবে আগামী দিনে বাংলাদেশের আঞ্চলিক অবস্থান।

সূত্রঃ আল জাজিরা

লেখকঃ প্রিয়াংকা সরকার

এই শাখার আরও খবর

ইউরোপের মাটিতে ইতিহাস গড়ে সান মারিনোকে হারালো বাংলাদেশ

মেলবোর্ন, ৬ জুন- ইউরোপের মাটিতে ইতিহাস গড়েছে বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দল। স্বাগতিক সান মারিনোকে ২-১ গোলে হারিয়ে প্রথমবারের মতো ইউরোপের কোনো দলের বিপক্ষে জয় পেয়েছে…

আইভীর মুক্তি: আওয়ামী লীগের পুনর্গঠনের ইঙ্গিত নাকি নতুন সমীকরণ?

মেলবোর্ন, ৬ জুন- বিএনপি সরকার সেলিনা হায়াৎ আইভীকে কেন জামিন দিলো? হ্যাঁ, বাংলাদেশে আদালত জামিন দেয় না, জামিন দেয় যারা সরকারে থাকে। তো, আইভীকে কেন…

তৃতীয় লিঙ্গের শিক্ষার্থীদের জন্য বাউবির দরজা সবসময় খোলা: উপাচার্য

মেলবোর্ন,০৬জুন-তৃতীয় লিঙ্গের শিক্ষার্থীদের শিক্ষার মূলধারায় সম্পৃক্ত করতে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় (বাউবি) প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান। তিনি বলেছেন, শিক্ষা…

অস্ট্রেলিয়া সিরিজে জাতীয় দলে ফিরছেন সালাউদ্দিন, কোচিং স্টাফে বড় পরিবর্তন

মেলবোর্ন,০৬জুন-আসন্ন অস্ট্রেলিয়া সিরিজকে সামনে রেখে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের কোচিং স্টাফে বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। কোচিং স্টাফে জনবল সংকট দেখা দেওয়ায় আবারও জাতীয় দলের…

বউকে বাঁচাতে গিয়ে শাশুড়ির মৃত্যু, কটিয়াদীতে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে প্রাণ গেল দুজনের

মেলবোর্ন,০৬জুন-কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলায় মর্মান্তিক বিদ্যুৎস্পৃষ্টের ঘটনায় এক গৃহবধূ ও তার শাশুড়ির মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার দুপুরে উপজেলার আচমিতা ইউনিয়নের উখরাশাল গ্রামে এ দুর্ঘটনা ঘটে। পরিবারের এক…

চার সীমান্ত দিয়ে পুশ–ইন চেষ্টা প্রতিহত করল বিজিবি ও স্থানীয়রা

মেলবোর্ন,০৬জুন-লালমনিরহাট, পঞ্চগড়, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ অন্তত ৬০ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর (পুশ ইন) চেষ্টা করেছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)।…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au