কঙ্গোতে যুক্তরাষ্ট্রের বিতাড়িত অভিবাসীদের দুর্বিষহ জীবন, বাড়ছে সংকট
মেলবোর্ন, ২৩ এপ্রিল- যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিভিন্ন দেশে বিতাড়িত লাতিন আমেরিকার একটি অভিবাসী দল এখন আফ্রিকার দেশ গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে (ডিআর কঙ্গো) আটকে পড়েছেন। উন্নত জীবনের…
মেলবোর্ন, ৪ ফেব্রুয়ারি- বৃহস্পতিবার বিকেলের এক সময় কক্সবাজারের বালুখালী রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পে নিজের বাঁশ ও ত্রিপলের ঘরে মেঝেতে বসার জায়গা গুছিয়ে নিচ্ছিল ১৯ বছর বয়সী মাহমুদুল হাসান। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেখানে ঢুকে পড়ে ৩৫ জন ছোট শিশু। বয়সে নিজেও কিশোর হলেও এই শিশুদের শিক্ষক হাসান। তারা রাখাইন ভাষায় তাকে অভিবাদন জানায়, “সয়ার, নে কাওং লা?” অর্থাৎ, স্যার আপনি কেমন আছেন।
এই শিশুরা হাসানের পরিচালিত একটি কমিউনিটি স্কুলের শিক্ষার্থী। প্রায় ৮০ জন শিশু এখানে পড়াশোনা করে। হাসান তাদের বার্মিজ, ইংরেজি ও গণিত শেখান।
ঠিক পাশেই, মোটরসাইকেলে করে এক বাংলাদেশি সরকারি কর্মকর্তা মাইকে ঘোষণা দিচ্ছিলেন অন্য একটি বিষয়ে। তিনি ক্যাম্পজুড়ে প্রচার করছিলেন আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে নির্দেশনা।
মাইকে ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, ৯ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রোহিঙ্গা শরণার্থীরা যেন দোকান বন্ধ রাখে এবং ক্যাম্পের বাইরে না যায়। কেউ যদি কোনো রাজনৈতিক প্রচারণায় জড়িত পাওয়া যায়, তাহলে তাকে ‘কঠোর শাস্তি’ দেওয়া হবে। এমনকি তার নিবন্ধন কার্ড ও স্বল্পমূল্যের খাদ্য সহায়তা পাওয়ার অনুমতিপত্রও বাতিল করা হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়।
কক্সবাজারের বিভিন্ন ক্যাম্পে বর্তমানে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী বসবাস করছেন। ২০১৭ সালে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর ভয়াবহ অভিযানের মুখে তারা বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হন। সে সময় অনেক দেশ মুখ ফিরিয়ে নিলেও, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ মানবিক কারণে তাদের আশ্রয় দেয়।
তবে নির্বাচনের সময় দেওয়া এসব সতর্কবার্তা রোহিঙ্গাদের আবারও মনে করিয়ে দেয়, বাংলাদেশে তাদের জীবন এক অনিশ্চিত অপেক্ষার জীবন। সীমিত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, খাদ্য রেশন, কাজের সুযোগ এবং চলাচলের স্বাধীনতা নিয়ে তারা বছরের পর বছর ধরে আটকে আছেন।
১২ কোটি ৭০ লাখ ভোটার যখন নতুন সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন রোহিঙ্গা শরণার্থীরা জানেন, এই নির্বাচনে তারা প্রকৃত অংশীজন নন।
মাহমুদুল হাসান আল জাজিরাকে বলেন, “আমার নতুন কোনো প্রত্যাশা নেই। আমি সম্মানের সঙ্গে, মানবাধিকার নিয়ে বাঁচতে চাই। এই জীবন আমি বেছে নিইনি।”
তবে তিনি স্বীকার করেন, নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রধান দুই রাজনৈতিক জোট বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা উখিয়া ও টেকনাফ অঞ্চলে রোহিঙ্গাদের সমস্যার কথা বলেছেন। জাতীয় পর্যায়ের নেতারাও এই সংকট নিয়ে কথা বলছেন। এটুকুই তার সামান্য আশার জায়গা।
সহিংসতা, বিচার ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
হাসান ২০১৭ সালে মাত্র ১০ বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে বাংলাদেশে আসে। মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো হত্যাযজ্ঞ বর্তমানে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে সম্ভাব্য গণহত্যা হিসেবে তদন্তাধীন। ২০২৪ সালের নভেম্বরে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত মিয়ানমারের সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইংয়ের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করে। এর পর থেকে বাংলাদেশেই বিশ্বের সবচেয়ে বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী অবস্থান করছে।
রোহিঙ্গা প্রবাসী নেতা ও আরাকান রোহিঙ্গা ন্যাশনাল কাউন্সিলের সহসভাপতি নে সান লুইন বলেন, বাংলাদেশ সরকার ও জনগণের প্রতি তারা কৃতজ্ঞ হলেও ‘অ-একীভূতকরণ’ নীতির কারণে রোহিঙ্গারা সমাজের প্রান্তেই রয়ে গেছে। ক্যাম্পগুলো কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘেরা, রোহিঙ্গা শিশুরা বাংলাদেশের মূলধারার শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রবেশ করতে পারে না।
তার মতে, নতুন সরকারকে রোহিঙ্গাদের জীবনমান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও জীবিকার সুযোগ বাড়াতে হবে এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে কাজ করতে হবে।
তবে বাস্তবতা হলো, জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক দাতাদের অর্থায়নে পরিচালিত ক্যাম্পগুলোর সহায়তা ক্রমেই কমে যাচ্ছে।
রোহিঙ্গা সংগঠন ইউনাইটেড কাউন্সিল অব দ্য রোহিঙ্গার সভাপতি সাইয়েদ উল্লাহ বলেন, নিরাপত্তাহীনতা, অর্থসংকট, শিক্ষা সংকট ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তায় মানবিক পরিস্থিতি দিন দিন খারাপ হচ্ছে।
৬৪ বছর বয়সী রোহিঙ্গা দোকানি হাফেজ আহমেদ বলেন, ক্যাম্পের চিকিৎসাসেবা খুবই সীমিত। গুরুতর অসুস্থ হলে বেসরকারি হাসপাতালে যেতে বলা হয়, কিন্তু সেই সামর্থ্য তাদের নেই। তিনি বলেন, “রেশন কমে গেছে। এটা একেবারেই যথেষ্ট নয়।”
ভাঙা স্বপ্ন ও বিপজ্জনক যাত্রা
তরুণ শিক্ষক হাসানের ভাষায়, ক্যাম্পের জীবন মানসিকভাবে ভীষণ যন্ত্রণাদায়ক। তিনি বলেন, “ক্যাম্পের জীবন মানে কারাগারের মতো। আমি একজন বিশ্বমানের শিক্ষক হতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ভাগ্যহীন একজন মানুষ হয়ে নিজেকে কী বলব?”
এই হতাশা থেকেই অনেক রোহিঙ্গা আবার বিপজ্জনক পথে পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে পাঁচ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা সমুদ্রপথে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা শুরু করেছে। এদের মধ্যে অনেকে বাংলাদেশ থেকেও পালানোর চেষ্টা করেছে। ছয় শতাধিক মানুষ নিখোঁজ বা নিহত হয়েছে।
২৩ বছর বয়সী বিবি খাদিজা মালয়েশিয়া যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। মানবপাচারকারীর কবল থেকে সন্তানসহ পালিয়ে ফিরতে গিয়ে স্থানীয়দের হাতে মারধরের শিকার হন। পরে এক অচেনা ব্যক্তি তাকে সাহায্য করেন।
রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতা
২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র আন্দোলনের পর শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেন। এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
বিএনপি ও জামায়াত উভয় দলই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলছে। বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসনই তাদের লক্ষ্য। জামায়াতও আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর ভূমিকার কথা উল্লেখ করেছে।
তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক তানভীর হাবিব মনে করেন, এবারের নির্বাচনে রোহিঙ্গা ইস্যু বড় বিষয় হয়ে ওঠেনি।
মানবাধিকার সংগঠন ফর্টিফাই রাইটসের পরিচালক জন কুইনলি সতর্ক করে বলেন, রোহিঙ্গাদের কেবল নির্বাচনী রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার না করে একটি সমন্বিত কৌশল দরকার।
অনিশ্চিত সমাধান, একটাই চাওয়া
সব আলোচনা ও বিতর্কের মাঝেও রোহিঙ্গা শরণার্থীদের চাওয়া খুবই স্পষ্ট। কক্সবাজারের ক্যাম্পে বসে হাফেজ আহমেদ বলেন, “আমি আমার দেশে মরতে চাই। অধিকার নিয়ে নিজ ঘরে ফিরতে চাই।”
বাংলাদেশের নির্বাচন রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে তাদের জীবন যে এখনও অনিশ্চয়তায় ঘেরা, সেটাই সবচেয়ে বড় বাস্তবতা।
সূত্রঃ আল জাজিরা
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au