মেলবোর্ন, ৪ ফেব্রুয়ারি- ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে একটি জাতীয় নির্বাচন, যাকে স্বাধীনতার পর দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনগুলোর একটি বলে মনে করছেন অনেক পর্যবেক্ষক। এটি কোনো স্বাভাবিক নির্বাচন নয়। দীর্ঘ একদলীয় শাসনের অবসান ঘটানো একটি গণঅভ্যুত্থানের পর এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন দেশটির সামনে স্পষ্ট কোনো রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা নেই।
দক্ষিণ এশিয়ার বাইরের পাঠকদের জন্য বলা যায়, বাংলাদেশ একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ, যেখানে প্রায় ১৮ কোটি মানুষের বসবাস। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত এই দেশটি তিন দিক থেকে ভারতের সীমান্তে ঘেরা। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে এবং বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে দেশটির ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। ফলে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাব শুধু দেশের ভেতরেই নয়, প্রতিবেশী দেশগুলো এবং আরও দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।
এই নির্বাচন নির্ধারণ করবে বাংলাদেশ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পথে এগোবে কিনা, দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তায় পড়বে কিনা, নাকি নতুন কোনো আদর্শিক পথে যাত্রা করবে।
প্রায় ১৫ বছর ধরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশ শাসন করেছে। এই সময়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে, বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। তবে একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক পরিসর সংকুচিত হয়েছে। নির্বাচনগুলোকে অনেকেই অবাধ ও সুষ্ঠু মনে করেননি। বিরোধী দলগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে। সমালোচক, সাংবাদিক ও অধিকারকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার এবং চাপ বাড়তে থাকে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জনঅসন্তোষ গভীর হয়।
২০২৪ সালে এই ক্ষোভ রূপ নেয় ব্যাপক গণআন্দোলনে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন এবং পরিবারতন্ত্রের প্রতি বিরক্তি মানুষকে রাস্তায় নামতে বাধ্য করে। নিরাপত্তা বাহিনী কঠোরভাবে আন্দোলন দমন করতে গেলে বহু মানুষ নিহত ও আহত হন। পরিস্থিতি সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। কয়েক সপ্তাহের টানা অস্থিরতার পর শেখ হাসিনা ভারতে চলে যান। রাজনৈতিকভাবে ভেঙে পড়ে আওয়ামী লীগ। দলের অনেক নেতা বিদেশে চলে যান বা মামলার মুখে পড়েন। ২০২৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নিতে পারছে না।
এই প্রেক্ষাপটে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। সরকারের মূল দায়িত্ব ছিল দেশকে স্থিতিশীল করা এবং একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের আয়োজন করা। ইউনূস সরকার ন্যায্যতা ও সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিলেও সমালোচকদের মতে, এই রূপান্তর প্রক্রিয়া কিছু রাজনৈতিক গোষ্ঠীকে অন্যদের তুলনায় বেশি সুবিধা দিয়েছে।
এর ফলে দেশে একটি রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে। পুরোনো ব্যবস্থা ভেঙে গেছে, কিন্তু নতুন ব্যবস্থা এখনো পুরোপুরি দাঁড়ায়নি।
আওয়ামী লীগ নির্বাচনের বাইরে থাকায় এবারের নির্বাচন মূলত দুইটি শিবিরের লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। একদিকে রয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি। শেখ হাসিনার শাসনামলে তারাই ছিল প্রধান বিরোধী শক্তি। দলের বহু নেতা বছরের পর বছর কারাবন্দি ছিলেন বা বিদেশে নির্বাসনে কাটিয়েছেন। এখন বিএনপি নিজেকে স্বাভাবিক উত্তরসূরি হিসেবে তুলে ধরছে।
বিএনপির দাবি, তারা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করবে, অর্থনীতি ঠিক করবে এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক উন্নত করবে। অনেক বিদেশি কূটনীতিক বিএনপিকে একটি পরিচিত ও পূর্বানুমানযোগ্য দল হিসেবে দেখেন। দলটি নতুন নয়, তবে রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা রয়েছে।
তবে বিএনপির অতীত নিয়েও বড় প্রশ্ন আছে। তাদের আগের শাসনামলে দুর্নীতি ও দুর্বল প্রতিষ্ঠান ছিল একটি বড় অভিযোগ। ইসলামপন্থী দলগুলোর ওপর নির্ভরশীলতাও সমালোচনার বিষয়। ফলে অনেক ভোটার এখনো পুরোপুরি আস্থা রাখতে পারছেন না, দলটি আদৌ বদলেছে কিনা সে প্রশ্নও উঠছে।
অন্যদিকে রয়েছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে একটি ইসলামপন্থী জোট। ১৯৭১ সালের ভূমিকা ও আদর্শিক অবস্থানের কারণে একসময় রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা ছিল জামায়াত। তবে আওয়ামী লীগের পতনের পর দলটি নতুন রাজনৈতিক জায়গা পেয়েছে।
জামায়াত নিজেদের শৃঙ্খলাবদ্ধ, সৎ এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের কাছাকাছি দল হিসেবে উপস্থাপন করছে। বহু এলাকায় দীর্ঘদিনের দমন-পীড়নে দুর্বল হয়ে পড়া ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলোর তুলনায় জামায়াতের সাংগঠনিক শক্তি বেশি দৃশ্যমান। তাদের সমর্থকদের বিশ্বাস, তারা নৈতিক নেতৃত্ব ও দুর্নীতিমুক্ত শাসন দিতে পারবে।
তবে ধর্মনিরপেক্ষ নাগরিক ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে জামায়াতের উত্থান গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরাও প্রশ্ন তুলছেন, এই ধারার রাজনীতি বাংলাদেশকে সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে কোন দিকে নিয়ে যেতে পারে।
অনেকে মনে করছেন, জামায়াত প্রত্যাশার চেয়েও ভালো ফল করতে পারে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপিকে সহজ বিজয়ী ধরে নেওয়া ভুল হবে। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের মধ্যে ইসলামপন্থী জোটের প্রভাব বাড়ছে।
এই তরুণদের বড় একটি অংশ একদলীয় শাসনের মধ্যেই বড় হয়েছে। তারা দুর্নীতি, দমন-পীড়ন এবং শেষ পর্যন্ত শাসনব্যবস্থার পতন প্রত্যক্ষ করেছে। তাদের কাছে আওয়ামী লীগ বা বিএনপি কেউই ন্যায়বিচার বা নিরাপত্তার প্রতীক নয়। উভয় দলকেই তারা পুরোনো ও ব্যর্থ মনে করে।
এই প্রেক্ষাপটে একটি বিতর্কিত ধারণা ছড়াচ্ছে। অনেকেই বলছেন, যদি কোনো সরকারই সত্যিকারের ন্যায়বিচার বা সংখ্যালঘু সুরক্ষা দিতে না পারে, তাহলে ভয়ের ভিত্তিতে নয়, বরং কাজের ভিত্তিতে জামায়াতকে বিচার করার সুযোগ দেওয়া উচিত।
ধর্ম ও পররাষ্ট্রনীতিও এই নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। জামায়াতপন্থীরা দাবি করছেন, তাদের দল ভারতের ওপর নির্ভর না করে আরও স্বাধীনভাবে দেশ চালাতে পারবে। শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে অন্যতম অভিযোগ ছিল, তিনি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সিদ্ধান্তে ভারতের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটিয়েছেন।
এ ধরনের অভিযোগ এখন বিএনপির বিরুদ্ধেও উঠছে। সমালোচকদের মতে, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ভারতের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছেছেন এবং ভারতের স্বার্থ চ্যালেঞ্জ করবেন না। ভারত হয়ে তার দেশে ফেরা এই ধারণাকে আরও জোরালো করেছে। এসব দাবি রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত হলেও, ভারতের ভূমিকা নিয়ে জনমনে ক্ষোভ বাড়িয়েছে।
এরই মধ্যে ভারত-সম্পৃক্ত কয়েকটি অবকাঠামো ও জ্বালানি প্রকল্প স্থগিত বা পর্যালোচনার আওতায় এসেছে বলে জানা গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কিছু গণমাধ্যমে পাকিস্তানপন্থী বক্তব্যও বেশি চোখে পড়ছে, যেগুলোর সঙ্গে শক্তিশালী ইসলামি পরিচয়ের আহ্বান জড়িয়ে আছে।
এই প্রবণতাগুলো ভোটের ফল নির্ধারণ করবে কিনা তা স্পষ্ট নয়, তবে এগুলো দেখাচ্ছে যে নির্বাচনটি শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিষয় নয়, বরং বাংলাদেশ নিজেকে অঞ্চলটির মধ্যে কীভাবে দেখতে চায়, সেই প্রশ্নও জড়িত।
এই নির্বাচনের আরেকটি কম আলোচিত বিষয় হলো আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক। বহু বছর ধরে দলটির বিশাল সমর্থকগোষ্ঠী ছিল। সেই সমর্থন হঠাৎ উধাও হয়ে যায়নি, কিন্তু এখন তাদের কোনো স্পষ্ট রাজনৈতিক ঠিকানা নেই।
এই ভোটারদের কেউ ভোটকেন্দ্রে নাও যেতে পারেন। কেউ জামায়াত ঠেকাতে বিএনপিকে ভোট দিতে পারেন। কেউ আবার জাতীয় দলের বদলে স্থানীয় নেতাদের অনুসরণ করতে পারেন। হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে এই নীরব ভোটাররাই ফল নির্ধারণ করতে পারে।
বিশ্লেষকেরা নির্বাচনের সম্ভাব্য তিনটি ফলাফল দেখছেন। প্রথমটি হলো বিএনপির নেতৃত্বে সরকার গঠন। এ ক্ষেত্রে দেশটি ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতার পথে যেতে পারে। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্য ও নিরাপত্তাভিত্তিক সম্পর্ক স্বাভাবিক হতে পারে। তবে গভীর সংস্কার ধীরগতির হবে এবং পুরোনো সমস্যা, যেমন দুর্নীতি বা রাজনৈতিক সমঝোতা, আবার ফিরে আসতে পারে।
দ্বিতীয় সম্ভাবনা হলো জামায়াত প্রভাবিত সরকার। এতে বাংলাদেশ পুরোপুরি ধর্মীয় রাষ্ট্রে পরিণত না হলেও জনআলোচনা আরও রক্ষণশীল হয়ে উঠতে পারে। সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়বে। নারী অধিকার ও ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষাব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। আন্তর্জাতিকভাবে ভারত ও পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে দূরত্ব বাড়তে পারে, যদিও চীনসহ অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাস্তবমুখী সম্পর্ক বজায় থাকবে।
তৃতীয় এবং সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি হলো কোনো দলই স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়া বা নির্বাচন নিয়ে বিরোধ তৈরি হওয়া। এতে আবারও আন্দোলন, সহিংসতা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়তে পারে। এমন পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনী প্রভাবশালী ভূমিকা নিতে পারে, যা কূটনীতিকদের সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের কারণ।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কাছে এই নির্বাচন আদর্শিক প্রশ্ন নয়, বরং নিরাপত্তার প্রশ্ন। হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায় বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সরকারের আমলে চাপের মুখে পড়েছে। আওয়ামী লীগের সময় সুরক্ষা থাকলেও রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের অভিযোগ ছিল। বিএনপির আমলে সেই সুরক্ষা সব জায়গায় সমান ছিল না। ইসলামপন্থী প্রভাবিত সরকারের ক্ষেত্রে অনেকেই আশঙ্কা করছেন, সুরক্ষা আইনের বদলে স্থানীয় ক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে।
বাংলাদেশের সঙ্গে ইসরায়েলের কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকলেও দেশের রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আরও ধর্মীয় ও জাতীয়তাবাদী বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ইসলামপন্থী ফোরামে উচ্চকণ্ঠ হতে পারে। অন্যদিকে একটি স্থিতিশীল বেসামরিক সরকার বিশ্ববাসীর কাছে দূরত্ব বজায় রেখেও পূর্বানুমানযোগ্য থাকবে।
২০২৬ সালের নির্বাচন শুধু কে ক্ষমতায় আসবে, সেই প্রশ্ন নয়। এটি নির্ধারণ করবে রাজনৈতিক পতনের পর বাংলাদেশ কী ধরনের রাষ্ট্রে পরিণত হবে। স্থিতিশীলতা, দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত নাকি নতুন কোনো আদর্শিক পথে যাত্রা, সবকিছু নির্ভর করবে পরবর্তী সরকার কীভাবে দেশ চালায়, কাদের অন্তর্ভুক্ত করে এবং অতীতের ভুল থেকে কী শেখে তার ওপর। বাংলাদেশের মতো একটি বড় ও গুরুত্বপূর্ণ দেশের ক্ষেত্রে এর প্রভাব দেশের সীমানা ছাড়িয়ে অনেক দূর পর্যন্ত অনুভূত হবে।
সূত্রঃ টাইমস অব ইসরায়েল