বাংলাদেশ

মার্কিন বাজার হারানোর শঙ্কায় পোশাক খাত

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘গোপন’ বাণিজ্য চুক্তি করতে কেন তাড়াহুড়ো করছে বাংলাদেশ

  • 11:23 pm - February 06, 2026
  • পঠিত হয়েছে:১২৪ বার
বাংলাদেশের একটি পোষাক কারখানায় কর্মরত শ্রমিক। ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ৬ ফেব্রুয়ারি- জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র কয়েক দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি ‘গোপন’ বাণিজ্য চুক্তি সই করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক শুল্কছাড় চুক্তির পরই এই তৎপরতা শুরু হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা আশঙ্কা করছেন, শুল্ক সুবিধায় পিছিয়ে পড়লে মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের অর্ডার কমে যেতে পারে, যার প্রভাব পড়বে লাখো শ্রমিকের কর্মসংস্থানে।

ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন বাণিজ্য চুক্তির আওতায় ভারতীয় পণ্যের ওপর শুল্ক কমে ১৮ শতাংশে নেমে এসেছে। এর পরপরই বাংলাদেশ দ্রুত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত করতে উদ্যোগ নেয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, এই চুক্তি আগামী ৯ ফেব্রুয়ারি সই হওয়ার কথা রয়েছে, যা জাতীয় নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে। ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটের আগে এমন তড়িঘড়ি চুক্তি নিয়ে ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদ মহলে প্রশ্ন উঠেছে।

বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের বড় অংশই আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান বাজার। প্রতিবছর প্রায় ৭ থেকে ৮ বিলিয়ন ডলারের পোশাক পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হয়। এ খাতে কয়েক মিলিয়ন শ্রমিক কাজ করেন, যাদের বড় অংশ নারী। উদ্যোক্তারা বলছেন, ভারতের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ যদি কম শুল্ক সুবিধা পায়, তাহলে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা সহজেই অর্ডার অন্য দেশে সরিয়ে নিতে পারেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আগে আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর কার্যকর শুল্ক হার প্রায় ৩৭ শতাংশ থেকে কমে প্রায় ২০ শতাংশে নামানো হয়েছিল। কিন্তু ভারতের শুল্ক হার ১৮ শতাংশে নামায় আবারও প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। তাই বাংলাদেশ চাইছে নতুন চুক্তির মাধ্যমে শুল্ক আরও কমিয়ে প্রায় ১৫ শতাংশে নামাতে, যাতে ভারতের সঙ্গে ব্যবধান কমানো যায়।

তবে এই সম্ভাব্য চুক্তির বিস্তারিত প্রকাশ না হওয়ায় বিতর্ক আরও ঘনীভূত হয়েছে। জানা গেছে, ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট (এনডিএ) সই করে, যার ফলে চুক্তির শর্তাবলি জনসম্মুখে, সংসদে বা শিল্পখাতের প্রতিনিধিদের কাছেও প্রকাশ করা যাচ্ছে না। এই গোপনীয়তাই সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি করেছে।

বাণিজ্য উপদেষ্টা স্ক. বশির উদ্দিন অবশ্য আশ্বস্ত করে বলেছেন, এই চুক্তিতে দেশের স্বার্থবিরোধী কিছু থাকবে না এবং যুক্তরাষ্ট্রের সম্মতি পেলে ভবিষ্যতে এটি প্রকাশও করা হতে পারে। তবে সমালোচকরা মনে করছেন, নির্বাচনের ঠিক আগে এমন একটি বড় অর্থনৈতিক চুক্তি সই করা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রশ্ন তোলে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, জনআলোচনা ও সংসদীয় পর্যালোচনা ছাড়াই চুক্তি হলে নতুন নির্বাচিত সরকারের জন্য শর্ত পরিবর্তনের সুযোগ খুবই সীমিত থাকবে। পোশাক শিল্পের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএর এক জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, “নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে এমন চুক্তি সইয়ের খবর দেখে আমরা বিস্মিত। এটি নির্বাচনের পর হওয়া উচিত ছিল, কারণ এর প্রভাব অনেক বড়।”

অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদও এই প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লেখেন, এই তড়িঘড়ি চুক্তি দেশকে ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিতে পারে এবং এর পেছনে বিদেশি লবিস্ট বা পরামর্শকদের প্রভাব থাকতে পারে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, পোশাক খাতে সামান্য শুল্ক পার্থক্যও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। ভারতের তুলনায় কাঁচামালের দাম, অবকাঠামো সীমাবদ্ধতা এবং উৎপাদন ব্যয় বেশি হওয়ায় বাংলাদেশ এমনিতেই চাপে আছে। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলো, যেগুলো যুক্তরাষ্ট্রের অর্ডারের ওপর বেশি নির্ভরশীল, তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

এই চুক্তি শুধু শুল্ক কমানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে চীনের পরিবর্তে অন্য দেশ থেকে আমদানি বাড়াতে চাপ দিতে পারে এবং মার্কিন পণ্যের মান ও নিয়ম কঠোরভাবে মানার শর্ত জুড়ে দিতে পারে। এতে বাংলাদেশের সামগ্রিক বাণিজ্য কৌশল ও ভূরাজনৈতিক অবস্থানেও প্রভাব পড়তে পারে।

সব মিলিয়ে, নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই সম্ভাব্য চুক্তি বাংলাদেশের রপ্তানি ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও, এর গোপনীয়তা ও সময় নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, চুক্তি সই হলে নতুন সরকারকে অবশ্যই এটি খতিয়ে দেখা এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশের স্বার্থ সুরক্ষিত হচ্ছে কি না তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে পোশাক শিল্পসহ সংশ্লিষ্ট খাত দ্রুত চুক্তির বিস্তারিত জানতে চাচ্ছে, যাতে তারা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ঠিক করতে পারে।

সূত্রঃ দ্য সানডে গার্ডিয়ান

এই শাখার আরও খবর

দীর্ঘ সময় ইতালির ক্ষমতায় থাকা মেলোনিকে মোদির শুভেচ্ছা, কী ছিল বার্তায়?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইতালির সবচেয়ে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নতুন রেকর্ড গড়েছেন জর্জিয়া মেলোনি। এই সাফল্যে তাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র…

বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দাম ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ: জাতিসংঘ

জলবায়ু পরিবর্তন, যুদ্ধ এবং বাণিজ্যিক অস্থিরতার প্রভাবে বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গত আগস্টে আন্তর্জাতিক খাদ্যপণ্যের মূল্যসূচক বেড়ে ২০২২ সালের নভেম্বরের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে…

বন্ডাই সন্ত্রাসী হামলার আগে ইহুদিবিদ্বেষের হুমকি অবমূল্যায়িত হয়েছিল: মাইক বার্জেস

সিডনি: বন্ডাই সন্ত্রাসী হামলার আগে অস্ট্রেলিয়ায় ক্রমবর্ধমান ইহুদিবিদ্বেষের ভয়াবহতা নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিরা যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে পারেননি বলে মন্তব্য করেছেন অস্ট্রেলিয়ান সিকিউরিটি ইন্টেলিজেন্স অর্গানাইজেশনের (এএসআইও) মহাপরিচালক মাইক…

মাদরাসায় সাত বছরের শিশুকে ছয় মাস ধরে বলাৎকার করছিলেন ৬জন

সাভার পৌর এলাকার শাহীবাগ মহল্লার মারকাযুল উলূম আশ-শরইয়্যাহ মাদরাসায় সাত বছরের এক শিশু শিক্ষার্থীকে প্রায় ছয় মাস ধরে বিভিন্ন সময়ে বলাৎকার ও শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ…

বাংলাদেশে পানির লবণাক্ততা: নীরব স্বাস্থ্যঝুঁকিতে উপকূলের মানুষ

বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে নিরাপদ পানীয় জল দিন দিন দুর্লভ হয়ে উঠছে। জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, জলোচ্ছ্বাস ও নদীপথে লবণাক্ত পানি প্রবেশের কারণে উপকূলের বিস্তীর্ণ…

বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রায় ঢাকায় উদযাপিত হলো জন্মাষ্টমী

যথাযোগ্য মর্যাদায় হিন্দু সম্প্রদায়ের আরাধ্য ভগবান শ্রী কৃষ্ণের জন্মতিথি, শুভ জন্মাষ্টমী ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও আনন্দ উৎসবের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয়েছে। জন্মাষ্টমী উপলক্ষে শুক্রবার রাজধানী ঢাকাসহ…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au