বাংলাদেশ

মার্কিন বাজার হারানোর শঙ্কায় পোশাক খাত

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘গোপন’ বাণিজ্য চুক্তি করতে কেন তাড়াহুড়ো করছে বাংলাদেশ

  • 11:23 pm - February 06, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৭৭ বার
বাংলাদেশের একটি পোষাক কারখানায় কর্মরত শ্রমিক। ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ৬ ফেব্রুয়ারি- জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র কয়েক দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি ‘গোপন’ বাণিজ্য চুক্তি সই করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক শুল্কছাড় চুক্তির পরই এই তৎপরতা শুরু হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা আশঙ্কা করছেন, শুল্ক সুবিধায় পিছিয়ে পড়লে মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের অর্ডার কমে যেতে পারে, যার প্রভাব পড়বে লাখো শ্রমিকের কর্মসংস্থানে।

ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন বাণিজ্য চুক্তির আওতায় ভারতীয় পণ্যের ওপর শুল্ক কমে ১৮ শতাংশে নেমে এসেছে। এর পরপরই বাংলাদেশ দ্রুত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত করতে উদ্যোগ নেয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, এই চুক্তি আগামী ৯ ফেব্রুয়ারি সই হওয়ার কথা রয়েছে, যা জাতীয় নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে। ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটের আগে এমন তড়িঘড়ি চুক্তি নিয়ে ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদ মহলে প্রশ্ন উঠেছে।

বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের বড় অংশই আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান বাজার। প্রতিবছর প্রায় ৭ থেকে ৮ বিলিয়ন ডলারের পোশাক পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হয়। এ খাতে কয়েক মিলিয়ন শ্রমিক কাজ করেন, যাদের বড় অংশ নারী। উদ্যোক্তারা বলছেন, ভারতের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ যদি কম শুল্ক সুবিধা পায়, তাহলে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা সহজেই অর্ডার অন্য দেশে সরিয়ে নিতে পারেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আগে আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর কার্যকর শুল্ক হার প্রায় ৩৭ শতাংশ থেকে কমে প্রায় ২০ শতাংশে নামানো হয়েছিল। কিন্তু ভারতের শুল্ক হার ১৮ শতাংশে নামায় আবারও প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। তাই বাংলাদেশ চাইছে নতুন চুক্তির মাধ্যমে শুল্ক আরও কমিয়ে প্রায় ১৫ শতাংশে নামাতে, যাতে ভারতের সঙ্গে ব্যবধান কমানো যায়।

তবে এই সম্ভাব্য চুক্তির বিস্তারিত প্রকাশ না হওয়ায় বিতর্ক আরও ঘনীভূত হয়েছে। জানা গেছে, ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট (এনডিএ) সই করে, যার ফলে চুক্তির শর্তাবলি জনসম্মুখে, সংসদে বা শিল্পখাতের প্রতিনিধিদের কাছেও প্রকাশ করা যাচ্ছে না। এই গোপনীয়তাই সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি করেছে।

বাণিজ্য উপদেষ্টা স্ক. বশির উদ্দিন অবশ্য আশ্বস্ত করে বলেছেন, এই চুক্তিতে দেশের স্বার্থবিরোধী কিছু থাকবে না এবং যুক্তরাষ্ট্রের সম্মতি পেলে ভবিষ্যতে এটি প্রকাশও করা হতে পারে। তবে সমালোচকরা মনে করছেন, নির্বাচনের ঠিক আগে এমন একটি বড় অর্থনৈতিক চুক্তি সই করা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রশ্ন তোলে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, জনআলোচনা ও সংসদীয় পর্যালোচনা ছাড়াই চুক্তি হলে নতুন নির্বাচিত সরকারের জন্য শর্ত পরিবর্তনের সুযোগ খুবই সীমিত থাকবে। পোশাক শিল্পের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএর এক জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, “নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে এমন চুক্তি সইয়ের খবর দেখে আমরা বিস্মিত। এটি নির্বাচনের পর হওয়া উচিত ছিল, কারণ এর প্রভাব অনেক বড়।”

অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদও এই প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লেখেন, এই তড়িঘড়ি চুক্তি দেশকে ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিতে পারে এবং এর পেছনে বিদেশি লবিস্ট বা পরামর্শকদের প্রভাব থাকতে পারে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, পোশাক খাতে সামান্য শুল্ক পার্থক্যও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। ভারতের তুলনায় কাঁচামালের দাম, অবকাঠামো সীমাবদ্ধতা এবং উৎপাদন ব্যয় বেশি হওয়ায় বাংলাদেশ এমনিতেই চাপে আছে। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলো, যেগুলো যুক্তরাষ্ট্রের অর্ডারের ওপর বেশি নির্ভরশীল, তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

এই চুক্তি শুধু শুল্ক কমানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে চীনের পরিবর্তে অন্য দেশ থেকে আমদানি বাড়াতে চাপ দিতে পারে এবং মার্কিন পণ্যের মান ও নিয়ম কঠোরভাবে মানার শর্ত জুড়ে দিতে পারে। এতে বাংলাদেশের সামগ্রিক বাণিজ্য কৌশল ও ভূরাজনৈতিক অবস্থানেও প্রভাব পড়তে পারে।

সব মিলিয়ে, নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই সম্ভাব্য চুক্তি বাংলাদেশের রপ্তানি ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও, এর গোপনীয়তা ও সময় নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, চুক্তি সই হলে নতুন সরকারকে অবশ্যই এটি খতিয়ে দেখা এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশের স্বার্থ সুরক্ষিত হচ্ছে কি না তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে পোশাক শিল্পসহ সংশ্লিষ্ট খাত দ্রুত চুক্তির বিস্তারিত জানতে চাচ্ছে, যাতে তারা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ঠিক করতে পারে।

সূত্রঃ দ্য সানডে গার্ডিয়ান

এই শাখার আরও খবর

ঈদুল গাদিরে দুই হাজারের বেশি বন্দিকে সাধারণ ক্ষমা দিলেন মোজতবা খামেনি

মেলবোর্ন,০৬জুন-ইরানের গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব ঈদুল গাদির উপলক্ষে দুই হাজারের বেশি দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দির সাজা মওকুফ করেছেন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মোজতবা খামেনি। শুক্রবার ইরানের বিচার…

তৃতীয় লিঙ্গের শিক্ষার্থীদের জন্য বাউবির দরজা সবসময় খোলা: উপাচার্য

মেলবোর্ন,০৬জুন-তৃতীয় লিঙ্গের শিক্ষার্থীদের শিক্ষার মূলধারায় সম্পৃক্ত করতে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় (বাউবি) প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান। তিনি বলেছেন, শিক্ষা…

বউকে বাঁচাতে গিয়ে শাশুড়ির মৃত্যু, কটিয়াদীতে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে প্রাণ গেল দুজনের

মেলবোর্ন,০৬জুন-কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলায় মর্মান্তিক বিদ্যুৎস্পৃষ্টের ঘটনায় এক গৃহবধূ ও তার শাশুড়ির মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার দুপুরে উপজেলার আচমিতা ইউনিয়নের উখরাশাল গ্রামে এ দুর্ঘটনা ঘটে। পরিবারের এক…

চার সীমান্ত দিয়ে পুশ–ইন চেষ্টা প্রতিহত করল বিজিবি ও স্থানীয়রা

মেলবোর্ন,০৬জুন-লালমনিরহাট, পঞ্চগড়, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ অন্তত ৬০ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর (পুশ ইন) চেষ্টা করেছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)।…

ইসরায়েল ও ইরানের ওপর চটলেন লেবাননের প্রধানমন্ত্রী

মেলবোর্ন, ৫ জুন-  দক্ষিণ লেবাননে চলমান সংঘাত ও মানবিক সংকটের প্রেক্ষাপটে ইসরায়েল এবং ইরান উভয়ের প্রতিই কড়া বার্তা দিয়েছেন লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালাম। তিনি একদিকে বেসামরিক…

টাঙ্গাইলে ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে হামলা-ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ

মেলবোর্ন, ৫ জুন- টাঙ্গাইলের গোপালপুর ও ভূঞাপুর উপজেলায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসন…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au