বাংলাদেশ

ডিপি ওয়ার্ল্ড ইস্যুতে অচল চট্টগ্রাম বন্দর

শ্রমিক আন্দোলন থেকে জাতীয় অর্থনীতি, চট্টগ্রাম বন্দর সংকট কতটা ভয়াবহ

  • 5:03 am - February 08, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৪২ বার
চট্টগ্রাম বন্দর; ছবি সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ৮ ফেব্রুয়ারি- চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা এখন আর কোনো একক সিদ্ধান্ত বা শ্রমিক আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। দেশের অর্থনীতির প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত এই বন্দরের অচলাবস্থা ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে একটি বহুমাত্রিক জাতীয় সংকটে। আমদানি-রফতানি নির্ভর শিল্প, বৈদেশিক মুদ্রা আয়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক আস্থা এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা পর্যন্ত এই সংকটের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে।

বাংলাদেশের মোট আমদানি-রফতানির প্রায় ৯২ শতাংশই পরিচালিত হয় চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে। ফলে এই বন্দরে কয়েক দিন কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ার অর্থ শুধু কনটেইনার আটকে থাকা নয়, বরং পুরো অর্থনৈতিক চক্রে শ্লথ গতি তৈরি হওয়া। ছয় দিনের টানা কর্মবিরতির পর সীমিত আকারে কার্যক্রম শুরু হলেও বাস্তবে বন্দর এখনও স্বাভাবিক হয়নি। বরং আন্দোলন, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও পাল্টাপাল্টি কঠোর পদক্ষেপের কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।

বন্দরের ইয়ার্ডে কনটেইনারের পাহাড়, বহির্নোঙরে অপেক্ষমাণ জাহাজের দীর্ঘ সারি এবং শ্রমিক-কর্মচারীদের মধ্যে বাড়তে থাকা অসন্তোষ মিলিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর এখন গভীর অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

এই সংকটের সূত্রপাত হয় নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে লিজ দেওয়ার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে। গত ৩১ জানুয়ারি থেকে বন্দরের শ্রমিক ও কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ প্রকাশ পেতে শুরু করে। তাদের অভিযোগ, এত বড় একটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে কোনো কার্যকর আলোচনা করা হয়নি। আলোচনার পরিবর্তে কয়েকজন কর্মচারীকে বদলি করায় পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

এরপর ধাপে ধাপে কর্মবিরতির ঘোষণা আসে। শুরুতে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ের কর্মবিরতি থাকলেও পরে তা পূর্ণাঙ্গ কর্মসূচিতে রূপ নেয়। একপর্যায়ে জাহাজ চলাচল প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়, যা চট্টগ্রাম বন্দরের ইতিহাসে বিরল ঘটনা হিসেবে দেখা হয়।

বৃহস্পতিবার বিকেলে আন্দোলনকারীরা দুই দিনের জন্য কর্মসূচি স্থগিতের ঘোষণা দিলেও বাস্তবে বন্দর সচল হতে সময় লাগে। দীর্ঘ সময়ের অচলাবস্থায় পুরো অপারেশনাল সিস্টেম ভেঙে পড়ে। জোয়ার-ভাটার সময়সূচি, রাতের জাহাজ চলাচলের সীমাবদ্ধতা এবং জমে থাকা কাজের চাপ মিলিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খেতে হয়।

শুক্রবার সকালে জোয়ারের সময় জেটিতে আটকে থাকা জাহাজগুলোকে বের করে বহির্নোঙরে থাকা জাহাজগুলো ভেড়ানোর কাজ শুরু হয়। তবে বিকাল না গড়ানো পর্যন্ত পুরোপুরি গতি ফেরেনি। এর মধ্যেই টার্মিনাল গেটগুলোতে ট্রাকের দীর্ঘ সারি দেখা যায়, যা সংকটের বাস্তব চিত্র আরও স্পষ্ট করে তোলে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বন্দরের ইয়ার্ডে জমে আছে ৩৮ হাজারের বেশি টিইইউ কনটেইনার। এর মধ্যে প্রায় ২৯ হাজারের বেশি এফসিএল কনটেইনার, যা সরাসরি আমদানি ও রফতানির সঙ্গে যুক্ত। এই বিপুল পরিমাণ কনটেইনার জট স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রফতানি কনটেইনারের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। বন্দরের ভেতরে আটকে আছে প্রায় ১ হাজার টিইইউ রফতানি কনটেইনার। বেসরকারি ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোগুলোতে পড়ে আছে আরও ১৩ থেকে ১৪ হাজার কনটেইনার। বিভিন্ন ডিপোতে প্রায় দেড় হাজার কনটেইনার আটকে রয়েছে এবং কমলাপুর আইসিডিতে পাঠানোর অপেক্ষায় আছে আরও প্রায় ১ হাজার ৭৫০টি কনটেইনার।

নতুন করে রফতানি পণ্য বন্দরে আসতে শুরু করলেও পুরোনো জট না কাটায় পুরো ব্যবস্থাপনার ওপর চাপ বাড়ছে। এতে করে একটি জট আরেকটি জটকে জন্ম দিচ্ছে।

বহির্নোঙরের পরিস্থিতিও ভয়াবহ। বর্তমানে সেখানে জ্বালানি তেল ও গ্যাসবাহী ট্যাঙ্কারসহ ৫০টির বেশি কনটেইনার জাহাজ এবং ১০০টির বেশি বাল্ক ক্যারিয়ার অপেক্ষমাণ রয়েছে। প্রতিদিন নতুন জাহাজ আসায় বার্থিং শিডিউল ঠিক রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।

শিপিং সংশ্লিষ্টদের হিসাব অনুযায়ী, বহির্নোঙরে অপেক্ষমাণ প্রতিটি জাহাজের জন্য প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ২০ হাজার ডলার ডেমারেজ চার্জ দিতে হচ্ছে। কয়েক দিনের মধ্যেই এই ক্ষতির অঙ্ক শত শত কোটি টাকায় পৌঁছেছে।

এই সংকটের সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে তৈরি পোশাক খাতে। অনেক ফিডার ভেসেল নির্ধারিত রফতানি কনটেইনার না নিয়েই বন্দর ছেড়ে গেছে। ফলে ইউরোপ ও আমেরিকাগামী শিপমেন্ট মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক পরিচালক খায়রুল আলম সুজান বলেন, আসল সংকট এখন সামনে। বিভিন্ন ডিপোতে ১৪ হাজারের বেশি রফতানি কনটেইনার আটকে আছে। অনেক ফিডার ভেসেল পণ্য না নিয়েই চলে গেছে। এই জট কাটাতে অন্তত দুই থেকে আড়াই মাস সময় লাগতে পারে। তিনি বলেন, এটি শুধু আর্থিক ক্ষতির প্রশ্ন নয়, এটি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর বড় আঘাত।

বন্দর অচলাবস্থার প্রভাব উৎপাদন খাতেও পড়ছে। প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের ৮০০টির বেশি কনটেইনার কাঁচামাল বন্দরে আটকে আছে। প্লাস্টিক, ইলেকট্রনিকসহ বিভিন্ন শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। খাদ্যপণ্য সময়মতো রফতানি না হলে বিদেশি ক্রেতারা পণ্য গ্রহণে অস্বীকৃতি জানাতে পারে।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন চেম্বার অব কমার্স বাংলাদেশ জানিয়েছে, প্রায় ১৩ হাজার কনটেইনারে আটকে আছে আনুমানিক ৬৬ কোটি ডলারের রফতানি পণ্য। সংগঠনটি সতর্ক করেছে, এই অচলাবস্থা সরবরাহ শৃঙ্খল ও আন্তর্জাতিক আস্থার জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করছে।

ইউরোচেম জানায়, স্বাভাবিক সময়ে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে প্রতিদিন গড়ে দুই থেকে আড়াই হাজার রফতানি কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়। বর্তমানে এই প্রবাহ প্রায় বন্ধ। ইউরোপীয় ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে এবং বাংলাদেশের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো সরকারের কার্যকর হস্তক্ষেপ চেয়েছে। বিজিএমইএ জানিয়েছে, বন্দরের অচলাবস্থা অব্যাহত থাকলে রফতানি আদেশ বাতিল এবং ভবিষ্যৎ অর্ডার হারানোর ঝুঁকি রয়েছে। ডিসিসিআই জানিয়েছে, বর্তমানে প্রায় ৫৪ হাজার কনটেইনার আটকে রয়েছে এবং ব্যবসায়ীদের প্রতিদিন কনটেইনারপ্রতি ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা অতিরিক্ত খরচ গুনতে হচ্ছে।

সংকট নিরসনের চেষ্টার মধ্যেই বন্দর কর্তৃপক্ষ আন্দোলনে জড়িত ১৫ জন কর্মচারীর সম্পদ তদন্তে দুদকে চিঠি দিয়েছে এবং তাদের বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞার আবেদন করেছে। এতে শ্রমিক-কর্মচারীদের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ এই পদক্ষেপকে সমঝোতার পথে বড় বাধা হিসেবে দেখছে। সংগঠনটি রবিবার সকাল থেকে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে, যার আওতায় বহির্নোঙরও থাকবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট এখন জাতীয় অর্থনীতি, রফতানি সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির বড় পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। দ্রুত উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ ছাড়া পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হবে।

চট্টগ্রাম বন্দর কেবল একটি অবকাঠামো নয়, এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। এই বন্দরের অচলাবস্থা মানে দেশের অর্থনৈতিক চাকা থমকে যাওয়া। এখনও সময় আছে সংলাপ, সমঝোতা ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নেওয়ার। অন্যথায় এই সংকট দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

এই শাখার আরও খবর

চাঁদা না পেয়ে কক্সবাজারে গণেশ পালকে কুপিয়ে হত্যা

মেলবোর্ন, ৮ মার্চ- কক্সবাজার শহরে বাড়ি নির্মাণের চাঁদা না দেওয়ার জেরে গণেশ পাল (২৯) নামে এক হিন্দু ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। শনিবার (৭ মার্চ)…

‘সমাজ সংস্কার’-এর নামে গ্রামে নোটিশ জারি গানবাজনা বন্ধের ঘোষণা

মেলবোর্ন, ৭ মার্চ- চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার একটি গ্রামে ‘সমাজ সংস্কার’-এর কথা বলে গানবাজনা ও বাদ্যযন্ত্র বাজানো নিষিদ্ধ ঘোষণা করে নোটিশ জারি করেছিল স্থানীয় একটি জামে…

আরব আমিরাতের বিমানঘাঁটিতে ড্রোন হামলার দাবি ইরানের

মেলবোর্ন, ৭ মার্চ- মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিমানঘাঁটিতে হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরান। শনিবার দেশটির ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি)…

মুন্সীগঞ্জে হিন্দু নারী কবিরাজ হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন, প্রতিবেশী মীর হোসেন গ্রেপ্তার

মেলবোর্ন, ৭ মার্চ- মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখানে হিন্দু নারী ও স্থানীয়ভাবে পরিচিত কবিরাজ রেখা রাণী রায় হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনের দাবি করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। দীর্ঘদিন…

ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে ফুল দিতে এসে গ্রেপ্তার ৪, সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা

মেলবোর্ন, ৭ মার্চ- ঐতিহাসিক ৭ মার্চ উপলক্ষে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে ফুল দিতে এসে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন চারজন। তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দিয়ে আদালতে…

এশিয়ান কাপ শেষে ইরানে ফেরা নিয়ে শঙ্কায় নারী ফুটবলাররা, অস্ট্রেলিয়ায় সুরক্ষার দাবি জোরালো

মেলবোর্ন, ৭ মার্চ: ২০২৬ নারী এশিয়ান কাপ খেলতে অস্ট্রেলিয়ায় থাকা ইরানের নারী ফুটবল দলকে ঘিরে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মানবাধিকারকর্মী, ইরানি-অস্ট্রেলীয় কমিউনিটি এবং খেলোয়াড়দের অধিকার…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au