ইমাম নিয়োগকে কেন্দ্র করে বিএনপি–জামায়াত সংঘর্ষ, নিহত ১
মেলবোর্ন, ৮ মার্চ- রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলায় ঈদগাহ মাঠে ঈদের নামাজ পড়ানোর ইমাম নিয়োগকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বিএনপি ও জামায়াত নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে…
মেলবোর্ন, ৮ ফেব্রুয়ারি: বাংলাদেশের কারাগারে আবারও এক রাজনৈতিক বন্দির মৃত্যু হয়েছে। প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা, সাবেক মন্ত্রী, শিক্ষাবিদ ও সংসদ সদস্য রমেশ চন্দ্র সেন (৮৬) শনিবার রাতে বিচারিক হেফাজতে মৃত্যুবরণ করেছেন। প্রায় ১৮ মাস ধরে কারাবন্দি অবস্থায় তিনি গুরুতর অসুস্থতায় ভুগছিলেন এবং একের পর এক মামলায় জামিন বঞ্চিত ছিলেন।
তার মৃত্যু বাংলাদেশের কারাগার ব্যবস্থায় রাজনৈতিক বন্দি ও সংখ্যালঘুদের প্রতি আচরণ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। পরিবারের কাছে এই মৃত্যু হঠাৎ করে আসেনি।
এক স্বজন বলেন, “তিনি আমাদের বারবার বলতেন শরীর ক্রমেই খারাপ হচ্ছে। চিকিৎসা চেয়েছেন, জামিন চেয়েছেন—কিন্তু কিছুই কাজে আসেনি।”
জনজীবন থেকে কারাগারের কুঠুরিতে
১৮ মাস আগেও রমেশ চন্দ্র সেন ছিলেন সম্মানিত জনব্যক্তিত্ব। আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন রাজনীতি ও শিক্ষাক্ষেত্রে সক্রিয় ছিলেন। কিন্তু একপর্যায়ে জনতার হামলা ও অপমানের শিকার হওয়ার অভিযোগের পর স্পষ্ট অভিযোগ ছাড়াই তাকে পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।
পরিবারের অভিযোগ, তার মুক্তি ঠেকাতে একের পর এক মামলা দায়ের করা হয়। এক ঘনিষ্ঠজন বলেন, “যখনই জামিনের সম্ভাবনা তৈরি হতো, তখনই নতুন মামলা সামনে আসত।”
কারাগারে অবনতিশীল স্বাস্থ্য
কারাগারে থাকার সময় তার শারীরিক অবস্থা ক্রমশ খারাপ হতে থাকে। পরিবার জানায়, বয়সজনিত নানা রোগে ভুগছিলেন এবং নিয়মিত চিকিৎসার প্রয়োজন ছিল। তবু স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে জামিন বারবার নাকচ করা হয়।
স্বজনদের দাবি, তাকে ন্যূনতম চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে এবং গুরুতর অসুস্থতা সত্ত্বেও ইচ্ছাকৃতভাবে কারাগারে রাখা হয়েছে। পরিবারের এক সদস্য বলেন, “তার যথাযথ চিকিৎসা হয়নি, মর্যাদা দেওয়া হয়নি, এমনকি মৌলিক মানবাধিকারও নিশ্চিত করা হয়নি।”
শনিবার রাতে কারাগারেই তার মৃত্যু হয়। পরে কর্তৃপক্ষ অসুস্থতাজনিত কারণ দেখিয়েছে।
সরকারি ব্যাখ্যা
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এ ধরনের ব্যাখ্যা এখন প্রায় নিয়মিত ঘটনা। অধিকারকর্মীদের তথ্য অনুযায়ী, শুধু ২০২৫ সালেই বাংলাদেশের কারাগারে অন্তত ১০৭ জন বন্দির মৃত্যু হয়েছে, যাদের বড় একটি অংশ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কর্তৃপক্ষ ‘হৃদ্রোগে আক্রান্ত’ বা ‘হঠাৎ অসুস্থতা’কে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
অধিকারকর্মীরা বলছেন, স্বাধীন তদন্ত না থাকায় এসব মৃত্যুর প্রকৃত কারণ যাচাই হয় না। একজন অধিকারকর্মীর ভাষায়, “হেফাজতে মৃত্যু এখানে কাগজপত্রের বিষয় হয়ে গেছে, সম্ভাব্য অপরাধ হিসেবে নয়।”
সংবিধানের দায়বদ্ধতা
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদে আটক ব্যক্তির জীবন ও মর্যাদা রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে। এক জ্যেষ্ঠ আইনজীবী বলেন, “রাষ্ট্র যখন কাউকে আটক করে, তখন তার বেঁচে থাকার দায়ও রাষ্ট্রের কাঁধে পড়ে। হেফাজতে মৃত্যু হলে রাষ্ট্রকে জবাবদিহি করতে হয়।” তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, বাস্তবে কার্যকর তদন্ত খুবই বিরল।
রমেশ চন্দ্র সেনের মৃত্যু বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্যমতে, শুধু জানুয়ারি মাসেই হেফাজতে অন্তত ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।
প্রলয় চাকির মৃত্যুও একই ধরনের ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল; সেবারও পরিবার অভিযোগ করেছিল, চিকিৎসার আবেদন উপেক্ষা করা হয়েছিল। আওয়ামী লীগের পাবনা জেলার সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক ও সংগীতশিল্পী প্রলয় চাকী (৬০) কারা হেফাজতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। তবু বড় ধরনের জবাবদিহি দেখা যায়নি। প্রলয় চাকীর ছেলে সনি চাকীর অভিযোগ, তাঁর বাবার বিরুদ্ধে কোনো মামলা ছিল না। তাঁকে হয়রানি করা হয়েছে। কারাগারে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলেও প্রথমে তাঁদের জানানো হয়নি। কারাগারে যথাযথ চিকিৎসার অভাবে তিনি মারা গেছেন।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
জুলাই আন্দোলনের পর দলীয় সূত্র অনুযায়ী, বর্তমানে আওয়ামী লীগের দুই শতাধিক শীর্ষ নেতা ও দায়িত্বশীল ব্যক্তি কারাবন্দি রয়েছেন। বিরোধী নেতা ও মানবাধিকার কর্মীদের মতে, এসব হেফাজতে মৃত্যুকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখা যায় না। একজন অধিকারকর্মী বলেন, “এটা শুধু একজন মানুষের গল্প নয়। এটা এমন একটি ব্যবস্থার কথা বলে, যেখানে কারাগারের দেয়ালের ভেতরে বন্দিরা ধীরে ধীরে নিঃশব্দে ঝরে পড়ছে।”
রমেশ চন্দ্র সেনের পরিবারের কাছে বিষয়টি আরও নির্মম বাস্তবতায় ধরা দিয়েছে। এক স্বজন বলেন, “তিনি জীবিত অবস্থায় কারাগারে গিয়েছিলেন। আর ফিরে আসতে পারেননি।”
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au