নির্বাচন কমিশনের লোগো। ছবি: সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১১ ফেব্রুয়ারি- ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও একই দিনে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া গণভোটকে কেন্দ্র করে ঢাকায় পৌঁছেছেন অন্তত ৩৯৪ জন বিদেশি নির্বাচনী পর্যবেক্ষক এবং ১৯৭ জন বিদেশি সাংবাদিক। বৃহস্পতিবার ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় এই দুই আয়োজন ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আগ্রহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। নির্বাচন প্রক্রিয়া সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ এবং গণমাধ্যমের মাধ্যমে বিশ্ববাসীর কাছে পরিস্থিতি তুলে ধরতেই তারা বাংলাদেশে এসেছেন।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানিয়েছে, আগত পর্যবেক্ষকদের মধ্যে ৮০ জন বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধি। এছাড়া দ্বিপক্ষীয় আমন্ত্রণের ভিত্তিতে বিভিন্ন দেশ থেকে ২৪০ জন পর্যবেক্ষক এসেছেন। এদের মধ্যে স্বতন্ত্র ইউরোপীয় পর্যবেক্ষকরাও রয়েছেন। পাশাপাশি ৫১ জন ব্যক্তি বিভিন্ন বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে নিজস্ব সক্ষমতায় নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করবেন।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকের এ সংখ্যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন, যা দেশ-বিদেশে বিতর্কিত হিসেবে আলোচিত হয়েছিল, সেখানে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকের সংখ্যা ছিল অনেক কম। তার আগের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ছিলেন ১৫৮ জন, দ্বাদশ নির্বাচনে ১২৫ জন এবং দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ সংখ্যা নেমে এসেছিল মাত্র ৪ জনে। সেই তুলনায় এবার অংশগ্রহণ দ্বিগুণেরও বেশি হওয়ায় নির্বাচনকে ঘিরে আন্তর্জাতিক আগ্রহের বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে।
প্রধান পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোর মধ্যে রয়েছে এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ফ্রি ইলেকশনস, যারা ২৮ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল পাঠিয়েছে। কমনওয়েলথ সেক্রেটারিয়েট থেকে এসেছেন ২৭ জন প্রতিনিধি। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট ১৯ জন পর্যবেক্ষক পাঠিয়েছে এবং ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ইনস্টিটিউট থেকে এসেছেন একজন প্রতিনিধি। এছাড়া ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থা এবং ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স অব এশিয়ান পলিটিক্যাল পার্টিজ থেকে দুজন করে প্রতিনিধি এবং ইউরোপিয়ান এক্সটার্নাল অ্যাকশন সার্ভিস থেকে একজন প্রতিনিধি অংশ নিচ্ছেন।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়াও ২১টি দেশ থেকে পর্যবেক্ষকরা বাংলাদেশে এসেছেন। দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে পাকিস্তান, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইনস, মালয়েশিয়া, জর্ডান, তুরস্ক, ইরান, জর্জিয়া, রাশিয়া, চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, কিরগিজস্তান, উজবেকিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং নাইজেরিয়া। বিভিন্ন মহাদেশ থেকে আগত প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ নির্বাচনকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।
এছাড়া ভয়েস ফর জাস্টিস, ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল, এসএনএএস আফ্রিকা, সার্ক হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশন এবং পোলিশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের প্রতিনিধিরা ব্যক্তিগত উদ্যোগে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করবেন বলে জানা গেছে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের সমন্বয় কার্যক্রমে সহায়তাকারী জ্যেষ্ঠ সচিব ও এসডিজি সমন্বয়ক লামিয়া মোরশেদ বলেন, বিভিন্ন দেশ ও সংস্থার ইতিবাচক সাড়া নির্বাচন আয়োজনকারী কর্তৃপক্ষকে উৎসাহিত করেছে। তার মতে, এটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আস্থার প্রতিফলন।
উচ্চপর্যায়ের অতিথিদের উপস্থিতিও এ আয়োজনকে বিশেষ মাত্রা দিয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন ঘানার সাবেক প্রেসিডেন্ট নানা আদ্দো দানকওয়া আকুফো-আদ্দো, ভুটানের প্রধান নির্বাচন কমিশনার ডেকি পেমা, বাংলাদেশে সাবেক তুর্কি রাষ্ট্রদূত মেহমেত ভাকুর এরকুল, যুক্তরাজ্যের হাউস অব লর্ডসের সাবেক গভর্নমেন্ট ডেপুটি চিফ হুইপ লর্ড রিচার্ড নিউবি, মালয়েশিয়ার নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তা রামলান বির হারুন এবং ইরানের পার্লামেন্ট সদস্য বেহনাম সাঈদি।
এদিকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৫০টির বেশি রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীসহ দুই হাজারেরও বেশি প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। সংসদীয় আসনের পাশাপাশি একই দিনে গণভোটও অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ভোটগ্রহণ শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করতে প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিকদের এই ব্যাপক উপস্থিতি দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ, নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং গণতান্ত্রিক চর্চা সম্পর্কে বৈশ্বিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এখন সবার নজর ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটগ্রহণ ও তার পরবর্তী পরিস্থিতির দিকে।