ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—উভয় দলের প্রতিনিধিরা নথিগুলো পর্যালোচনা করে একে একে চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আনছেন। মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের বিচারবিষয়ক কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট নেতা জেমি রাসকিন সাংবাদিকদের বলেন, এসব নথিতে ১৫, ১৪ এমনকি ১০ বছর বয়সী কিশোরীদের নির্যাতনের বর্ণনা রয়েছে। তিনি জানান, এক জায়গায় ৯ বছরের এক শিশুর কথাও উল্লেখ আছে। তার ভাষায়, এই তথ্যগুলো শুধু ভয়াবহ নয়, একেবারেই কল্পনাতীত ও লজ্জাজনক।
এই নথিগুলো প্রকাশের পর আবারও প্রশ্ন উঠেছে—বছরের পর বছর ধরে কীভাবে একজন প্রভাবশালী অর্থলগ্নিকারী প্রকাশ্যে শিশুদের যৌন নিপীড়ন ও পাচারের মতো অপরাধ চালিয়ে যেতে পেরেছিলেন। আইনপ্রণেতারা বলছেন, এপস্টেইনের অপরাধযজ্ঞ দীর্ঘদিন ধরে চললেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকরভাবে ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে।
এদিকে নথিতে উঠে এসেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ফ্লোরিডার পাম বিচ পুলিশের এক কর্মকর্তার মধ্যকার এক কথোপকথনের উল্লেখ। নথির বর্ণনা অনুযায়ী, ২০০৬ সালে এপস্টেইনের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরুর সময় ট্রাম্প নাকি ওই পুলিশ কর্মকর্তাকে ফোন করে বলেছিলেন, সবাই জানে এপস্টেইন কী ধরনের কাজ করছে এবং তাকে থামানো হচ্ছে দেখে তিনি স্বস্তি পেয়েছেন। নথিতে আরও বলা হয়, নিউইয়র্কের কিছু মহলে এপস্টেইনের আচরণকে ঘৃণ্য বলেও উল্লেখ করেছিলেন ট্রাম্প। তিনি এপস্টেইনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ঘিসলেইন ম্যাক্সওয়েলের দিকেও তদন্তকারীদের দৃষ্টি দিতে বলেন।

বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এপস্টেইনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। সুপার বোল উপলক্ষে প্রকাশিত বিজ্ঞাপনে অংশ নেওয়া তিনজন ভুক্তভোগী; পরিচয় গোপন রাখতে তাদের মুখ ঝাপসা করে দেখানো হয়েছে। ছবি: Davidoff Studios/Getty
তবে হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, ওই ফোনকলের বিষয়ে নিশ্চিত কোনো প্রমাণ তাদের হাতে নেই। প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট বলেন, এমন কল হয়ে থাকলেও সেটি ট্রাম্পের আগের দাবিকেই সমর্থন করে—তিনি নাকি এপস্টেইনকে তার মার-আ-লাগো ক্লাব থেকে বের করে দিয়েছিলেন। যদিও অতীতে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে ট্রাম্প বলেছিলেন, এপস্টেইনের অপরাধ সম্পর্কে তার কোনো ধারণা ছিল না। ফলে তার বক্তব্যের মধ্যেও পরস্পরবিরোধিতা দেখা যাচ্ছে।
মার্কিন বিচার বিভাগ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, প্রায় ২০ বছর আগে প্রেসিডেন্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন—এমন দাবির পক্ষে তারা এখনো নিশ্চিত কোনো প্রমাণ পায়নি।
এদিকে এপস্টেইনের সাবেক সঙ্গী ও সহযোগী ঘিসলেইন ম্যাক্সওয়েল নতুন করে আলোচনায় এসেছেন। যৌন পাচারের মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়ে তিনি বর্তমানে ২০ বছরের সাজা ভোগ করছেন। মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের ওভারসাইট কমিটি তাকে সমন করলেও তিনি অধিকাংশ প্রশ্নের জবাবে আত্মঅভিযোগের ঝুঁকি এড়াতে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর অধিকার প্রয়োগ করে নীরব থাকেন। ভিডিও কনফারেন্সে দেওয়া তার জবানবন্দিতে দেখা যায়, তিনি মাথা নিচু করে বসে ছিলেন এবং প্রায় প্রতিটি প্রশ্নেই একই উত্তর দেন।
ম্যাক্সওয়েলের আইনজীবী ডেভিড মার্কাস পরে জানান, প্রেসিডেন্ট যদি তাকে ক্ষমা করে দেন, তাহলে তিনি এপস্টেইনের নেটওয়ার্ক ও সহযোগীদের বিষয়ে প্রকাশ্যে সব সত্য বলতে প্রস্তুত। তার দাবি, ট্রাম্প ও সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন—যারা একসময় এপস্টেইনের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন—কোনো ধরনের অপরাধে জড়িত নন। তবে আইনজীবীর বক্তব্য নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
নতুন নথি প্রকাশের মধ্য দিয়ে এপস্টেইন কাণ্ড আবারও বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তুলেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই তথ্যগুলো শুধু একজন অপরাধীর ভয়াবহতা নয়, বরং ক্ষমতা, প্রভাব ও নীরবতার সুযোগে কীভাবে বছরের পর বছর শিশু নির্যাতনের মতো অপরাধ আড়ালে থেকে যায়—তার নির্মম উদাহরণ হয়ে থাকছে।