চাঁদা না পেয়ে কক্সবাজারে গণেশ পালকে কুপিয়ে হত্যা
মেলবোর্ন, ৮ মার্চ- কক্সবাজার শহরে বাড়ি নির্মাণের চাঁদা না দেওয়ার জেরে গণেশ পাল (২৯) নামে এক হিন্দু ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। শনিবার (৭ মার্চ)…
মেলবোর্ন, ১৩ ফেব্রুয়ারি- ‘প্রধানমন্ত্রী পুত্র’ পরিচয়ের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে কীভাবে বিএনপির একক নেতৃত্বে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করলেন তারেক রহমান, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সেই প্রশ্নের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট হয়ে উঠেছে। এই প্রথমবারের মতো তিনি সরাসরি একটি জাতীয় নির্বাচনে দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং একই সঙ্গে নিজেও নির্বাচনী লড়াইয়ে অংশ নিচ্ছেন।
নির্বাচনের মাত্র এক মাস আগে তার মা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন। যদিও এর আগে দীর্ঘদিন ধরে তিনি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন, তবু এবারই প্রথম তিনি পূর্ণাঙ্গ চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচনী প্রচার, প্রার্থী বাছাই, কৌশল নির্ধারণ এবং সাংগঠনিক তৎপরতার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছেন। তার সমর্থকেরা তাকে ‘সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবে তুলে ধরছেন, আর দল তাকে উপস্থাপন করছে ‘একক নেতা’ হিসেবে।
অন্যদিকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা তার অতীতের দুর্নীতির অভিযোগ, একাধিক মামলার ইতিহাস এবং শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। বিএনপি এসব অভিযোগকে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা বলে দাবি করে আসছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তার বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলো থেকে তিনি অব্যাহতি বা খালাস পেয়েছেন বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে।
প্রায় সতের বছর লন্ডনে রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকার পর গত ২৫ ডিসেম্বর তিনি দেশে ফেরেন। ঢাকায় ফেরার মধ্য দিয়ে দীর্ঘ নির্বাসনজীবনের অবসান ঘটে তার। দেশে ফেরার কয়েক দিনের মধ্যেই খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর ৯ জানুয়ারি দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির সভায় তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে চেয়ারম্যান ঘোষণা করা হয়। এর মধ্য দিয়ে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত দলটি খালেদা জিয়ার যুগ পেরিয়ে সরাসরি তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করে।

১৭ বছর পর দেশে ফিরে ঢাকার বিশাল জনসমাবেশে হাত নেড়ে সমর্থকদের শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, দেশ গড়ার নতুন অঙ্গীকার নিয়ে। ছবি: সংগৃহীত
২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেফতার হন তারেক রহমান। প্রায় আঠারো মাস কারাগারে থাকার পর ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে মুক্তি পেয়ে তিনি লন্ডনে চলে যান। সেখানে থেকেই তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় থাকেন। ২০১৮ সালে খালেদা জিয়া কারাবন্দি হওয়ার পর কার্যত তিনিই দলের হাল ধরেন। ভার্চুয়াল বৈঠক, বিবৃতি, সাংগঠনিক নির্দেশনা এবং তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে অনলাইন যোগাযোগের মাধ্যমে তিনি দলকে একত্র রাখার চেষ্টা করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিকূল সময়ে দলকে ভেঙে পড়তে না দেওয়া তার বড় সাফল্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোহাম্মদ মজিবুর রহমানের মতে, বিদেশে থেকেও দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখা এবং নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা তারেক রহমানের রাজনৈতিক সক্ষমতার প্রমাণ। তবে এখন দেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে নির্বাচন ও পরবর্তী সময়ে তিনি কী সিদ্ধান্ত নেন, সেটিই তার নেতৃত্বের প্রকৃত পরীক্ষা হবে।
তারেক রহমানের জন্মতারিখ নিয়ে কিছু বিতর্ক রয়েছে। দলীয় তথ্য অনুযায়ী তিনি ১৯৬৫ সালের ২০ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন, তবে নির্বাচনী হলফনামায় জন্মসাল ১৯৬৮ উল্লেখ করা হয়েছে। ঢাকার বিএএফ শাহীন কলেজে পড়াশোনা শেষে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন বলে দলীয় ওয়েবসাইটে উল্লেখ আছে, যদিও তার শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে হলফনামায় উচ্চ মাধ্যমিক উল্লেখ করা হয়েছে।

২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার পর আটক হয়ে কারাগারে গিয়েছিলেন তারেক রহমান। ছবিঃ বিবিসি
আশির দশকে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত থাকার দাবি রয়েছে তার। আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা শুরু হয় নব্বইয়ের দশকে। ২০০১ সালের নির্বাচনের সময় তিনি দলের ভেতরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় উঠে আসেন। ওই নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট বড় জয় পাওয়ার পর ‘হাওয়া ভবন’কে ঘিরে তারেক রহমানের প্রভাব ও বিতর্ক ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। সমালোচকদের ভাষ্য অনুযায়ী, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া সরকারের বাইরে থেকেও একটি প্রভাবশালী কেন্দ্র গড়ে উঠেছিল, যার সঙ্গে তারেক রহমানের নাম জড়িয়ে যায়।
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকায় শেখ হাসিনার সমাবেশে গ্রেনেড হামলার ঘটনায়ও আওয়ামী লীগ তারেক রহমানকে দায়ী করেছিল। পরবর্তী সময়ে এ সংক্রান্ত মামলায় তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। বিএনপি বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তিনি এসব মামলা থেকে অব্যাহতি পান।
দেশত্যাগের সময় তিনি রাজনীতি করবেন না এমন মুচলেকা দিয়েছিলেন কি না তা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। বিএনপির কিছু সাবেক নেতা স্মৃতিচারণমূলক লেখায় এ ধরনের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে লন্ডনে অবস্থানকালেই তিনি ধীরে ধীরে সক্রিয় রাজনৈতিক ভূমিকায় ফিরে আসেন। তার বক্তব্য প্রচারে বিধিনিষেধ আরোপ হলে তিনি সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয় হন এবং সেখান থেকেই দলীয় কার্যক্রম পরিচালনা করেন।
২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তার দেশে ফেরার পথ সুগম হয়। দেশে ফিরে তিনি সরাসরি সাংগঠনিক পুনর্গঠন, নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ এবং জনসভায় অংশগ্রহণ শুরু করেন। ২২ জানুয়ারি সিলেট থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচার শুরু করেন তিনি। তার স্ত্রী জুবাইদা রহমান এবং মেয়ে জায়মা রহমানকেও বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিতে দেখা গেছে।

মঙ্গলবার বিকেলে মহাখালীর টিঅ্যান্ডটি মাঠে কড়াইলবাসীর উদ্যোগে আয়োজিত এক দোয়া মাহফিলে তারেক রহমান। ছবিঃ সংগৃহীত
এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নিচ্ছে না। ফলে দীর্ঘদিনের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে গেছে। বিএনপির জন্য প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে এসেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। এমন প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানকে দলের অভ্যন্তরীণ ঐক্য ধরে রাখা এবং নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার চ্যালেঞ্জ নিতে হচ্ছে।
বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদের ভাষায়, প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে উঠে এসে নেতৃত্বের আসনে বসা অনেকটা ধ্বংসস্তূপ থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর মতো। কিন্তু দলীয় নেতা থেকে জাতীয় নেতা হয়ে ওঠার পথ আরও কঠিন।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, অতীতের বিতর্ক ও মামলার ইতিহাসকে পেছনে ফেলে তিনি কতটা গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে পারেন। দলের ভেতরে কিছু আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থিতা ঠেকাতে না পারা, সিদ্ধান্ত গ্রহণে দৃঢ়তা এবং জনপরিসরে তার রাজনৈতিক ভাষ্য কেমন হবে, সেদিকেও নজর রয়েছে।
‘প্রধানমন্ত্রী পুত্র’ হিসেবে রাজনীতিতে যাত্রা শুরু করলেও এখন তার সামনে লক্ষ্য একক নেতৃত্বে দলকে এগিয়ে নেওয়া। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সেই যাত্রার প্রথম বড় মঞ্চ, যেখানে তার নেতৃত্বের সাফল্য কিংবা সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
সূত্রঃ বিবিসি বাংলা
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au