চব্বিশের আগস্টে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর একে একে পদত্যাগ করেছিলেন ৪৮ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য।ছবি: সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১৫ ফেব্রুয়ারি- চব্বিশের আগস্টের ছাত্র–জনতার গণ–অভ্যুত্থানের পর একে একে ৪৮টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদত্যাগ করলে দেশের উচ্চশিক্ষা অঙ্গনে এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়। পরে অন্তর্বর্তী সরকার নতুন করে উপাচার্য নিয়োগ দেয়। মেয়াদোত্তীর্ণ ও নতুন প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় মিলিয়ে তাদের সময়ে মোট ৫৬টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগ করা হয়। এখন কয়েক দিনের মধ্যে নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব নিতে যাচ্ছে। এমন প্রেক্ষাপটে বর্তমান উপাচার্যদের অনেকেই নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।
গত দেড় বছরে জারি হওয়া নিয়োগ প্রজ্ঞাপন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়–এ উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে সাময়িক ভিত্তিতে। বাকি ৫২ বিশ্ববিদ্যালয়ে চার বছরের জন্য নিয়োগ দেওয়া হলেও প্রায় সব নিয়োগপত্রেই উল্লেখ রয়েছে, রাষ্ট্রপতি ও আচার্য প্রয়োজনে যেকোনো সময় এ নিয়োগ বাতিল করতে পারবেন।
সাময়িকভাবে নিয়োগ পাওয়া কয়েকজন উপাচার্য মনে করছেন, নির্দিষ্ট মেয়াদ উল্লেখ না থাকায় নতুন সরকার চাইলে সহজেই পরিবর্তন আনতে পারে। আবার নির্দিষ্ট মেয়াদপ্রাপ্তদের মধ্যেও অনেকে একই ধরনের শঙ্কার কথা জানিয়েছেন। কেউ কেউ পরিস্থিতি বুঝে দায়িত্ব ছাড়ার কথাও ভাবছেন, যদিও অধিকাংশই দায়িত্ব অব্যাহত রাখতে আগ্রহী।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান বলেন, তিনি কোনো ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা থেকে নয়, বরং দেশের ও বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থে দায়িত্ব নিয়েছেন। গণতান্ত্রিক উত্তরণের পর শিক্ষা খাতে কাজের সুযোগ আরও বেড়েছে বলেও তার মত।
অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়াজ আহমেদ খান ইতিমধ্যে পদত্যাগের ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, বিশেষ পরিস্থিতিতে দায়িত্ব নিয়েছিলেন এবং নতুন সরকার যেন নিজেদের মতো করে প্রশাসন সাজাতে পারে, সে সুযোগ দিতে চান। তবে অংশীজনরা চাইলে দায়িত্বে থাকার বিষয়টি বিবেচনা করবেন বলেও জানান তিনি।
অনেক উপাচার্যই বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ প্রক্রিয়া পুরোপুরি অরাজনৈতিক হয়নি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক উপাচার্য জানান, দায়িত্ব গ্রহণের পর রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছে। সামনের দিনে বিরূপ পরিস্থিতি তৈরি হলে মেয়াদ থাকা সত্ত্বেও সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দলীয়করণ ও অনিয়মের অভিযোগ ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে যোগ্যতা ও দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের কথা বলা হলেও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ ও পদোন্নতিতে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ–এর এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, গণ–অভ্যুত্থানের পর উপাচার্য নিয়োগেও রাজনৈতিক ভাগাভাগির প্রভাব ছিল এবং শিক্ষক নিয়োগ ও অপসারণে চাপের ঘটনা ঘটেছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার বলেন, তাদের লক্ষ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক মান পুনরুদ্ধার এবং মুক্ত চিন্তার পরিবেশ নিশ্চিত করা। রাজনৈতিক প্রশ্নে না গিয়ে একাডেমিক উন্নয়নেই মনোযোগ দিতে চান বলে জানান তিনি।
পিরোজপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. শহীদুল ইসলাম বলেন, নির্বাচিত সরকারের সহায়তা পেলে তিনি দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখতে চান। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তৌফিক আলমও জানিয়েছেন, আপাতত রাজনৈতিক কোনো সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন না।
এদিকে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার ঘটনা নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে। যদিও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল কেন্দ্রীয়ভাবে জানিয়েছে, উপাচার্য নিয়োগ প্রক্রিয়ায় তাদের কোনো হস্তক্ষেপের সুযোগ বা ইচ্ছা নেই।
রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় আইনে রাজনৈতিক কার্যক্রমে সম্পৃক্ততার বিধিনিষেধ থাকা সত্ত্বেও কয়েকজন উপাচার্যের রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে উপস্থিতির অভিযোগ উঠেছে।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমদ মনে করেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় ঢালাও রদবদল কাম্য নয়। অভিযোগ থাকলে তা নিয়মতান্ত্রিক ও প্রভাবমুক্ত তদন্তের মাধ্যমে দেখা উচিত।
শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. সিআর আবরার বলেন, নতুন সরকারই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। তবে শিক্ষাঙ্গনে সুষ্ঠু পরিবেশ ও গতিশীল কাঠামো বজায় রাখতে সরকার সুবিবেচনাপ্রসূত পদক্ষেপ নেবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
সব মিলিয়ে নতুন সরকার গঠনের প্রাক্কালে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এক ধরনের নীরব অপেক্ষা চলছে। দায়িত্বে টিকে থাকা না সরে দাঁড়ানো—এই প্রশ্নে উপাচার্যদের অবস্থান ভিন্ন হলেও অনিশ্চয়তার ছায়া যে রয়েছে, তা স্পষ্ট।