ইসরায়েল সফরে নরেন্দ্র মোদি। ছবিঃ এক্স
মেলবোর্ন, ২৫ ফেব্রুয়ারি- ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দ্বিতীয়বারের মতো ইসরায়েল সফরে গেছেন। এই দুই দিনের সফরে তিনি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠক করবেন এবং ইসরায়েলের সংসদ কনেসেটে ভাষণ দেবেন।
নরেন্দ্র মোদি এক্স(সাবেক টুইটারে) লিখেছেন, “আজ এবং আগামীকাল আমি রাষ্ট্র সফরে ইসরায়েলে থাকব। আমাদের দেশগুলোর মধ্যে দৃঢ় ও বহুমুখী কৌশলগত অংশীদারিত্ব রয়েছে। সাম্প্রতিক কয়েক বছরে এই সম্পর্ক অনেক শক্তিশালী হয়েছে। আমি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠক করব, যেখানে আমরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর উপায় নিয়ে আলোচনা করব। এছাড়াও আমি ইসরায়েলের রাষ্ট্রপতি আইজ্যাক হার্জোগের সঙ্গে সাক্ষাৎ করব।
আজ সন্ধ্যায় আমি ইসরায়েলি সংসদ কনেসেটে ভাষণ দেব। এটি আমাদের পার্লামেন্টারি এবং গণতান্ত্রিক বন্ধনকে সম্মান জানানোর একটি সুযোগ। আমি ভারতীয় প্রবাসীদের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করব, যারা ভারত-ইসরায়েল বন্ধন শক্তিশালী করতে বড় অবদান রেখেছে।”
এই সফরকে ইসরায়েলের প্রসিডেন্ট নেতানিয়াহু ‘ঐতিহাসিক’ সফর ও নরেন্দ্র মোদিকে ‘প্রিয় বন্ধু’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
মোদির এই সফর এমন এক সময়ে হচ্ছে যখন ইসরায়েল গাজায় চলমান গণহত্যামূলক যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে। গাজায় এ পর্যন্ত অন্তত ৭২,০৭৩ জন নিহত হয়েছে। নেদারল্যান্ডসের লেইডেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সহযোগী অধ্যাপক নিকোলাস ব্লারেল বলেন, ভারত ফিলিস্তিনকে সমর্থন জানিয়ে জাতিসংঘে পশ্চিম তটের ইসরায়েলি সম্প্রসারণের নিন্দা জানিয়েছে এবং তাই এ বিষয়ে খুব সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করছে। তিনি বলেন, “ভারতের ঐতিহাসিক অবস্থান ফিলিস্তিনকে সমর্থন করার। ১৯৪৭ সাল থেকে স্বাধীনতার পর ভারত ফিলিস্তিন ম্যান্ডেট ও ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিল।”
ব্লারেল আরও বলেন, “১৯৯০-এর দশক থেকে ভারত ও ইসরায়েলের কূটনৈতিক সম্পর্ক শুরু হয়েছে। এর পর থেকে ভারত ঐতিহ্যবাহী সমর্থন ও নতুন কৌশলগত সম্পর্কের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখছে। মোদি নেতানিয়াহুর সঙ্গে খুব স্পষ্ট বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেছেন।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষক কাদিরা পেথিয়াগোডা বলেন, মোদি ও নেতানিয়াহুর বৈঠকে সম্ভবত বড় নতুন চুক্তি হবে না, বরং ধীরে ধীরে সহযোগিতা বাড়ানোর লক্ষ্যে আলোচনা হবে। ভারত তার প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব বৈচিত্র্যপূর্ণ করতে চায় এবং ইসরায়েলের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ভারতের সামরিক সক্ষমতার ওপর প্রভাব বাড়ানোর সুযোগ দিতে পারে বলে সতর্ক।
ভারত ও ইসরায়েল এআই-সক্ষম অস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার ক্ষেত্রে যৌথ উৎপাদন এবং কৃষি ও জলবায়ু সহনশীলতার মতো ক্ষেত্রে নৈতিক এআই উন্নয়নের পরিকল্পনা করছে। এছাড়াও তারা ২০২৩ সালে প্রস্তাবিত ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডর (আইএমইসি) পুনরুজ্জীবিত ও মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত করার চেষ্টা করছে।
গাজায় চলমান পরিস্থিতি সম্পর্কে মোদি সম্ভবত কনেসেটে কেবল “সন্ত্রাসবিরোধী ব্যবস্থা ও আঞ্চলিক শান্তি উদ্যোগে সমন্বয়” উল্লেখ করবেন এবং গাজার বিষয়টি নীরপেক্ষ ও কূটনৈতিক ভাষায় উল্লেখ করা হবে।
সাবেক ইসরায়েলি কূটনীতিক ইলান ফ্লুস বলেন, প্রযুক্তি, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে ভারত ও ইসরায়েলের সহযোগিতা বৃদ্ধি করা উচিত। তিনি জানান, নতুন দিল্লীতে এআই শীর্ষ সম্মেলনে ভারতীয় সরকার ও বেসরকারি খাতের সম্ভাব্য অংশীদারদের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রনধীর জয়সওয়াল জানান, মোদির সফর ভারতের ও ইসরায়েলের কৌশলগত অংশীদারিত্ব আরও গভীর করবে এবং দুই দেশের সম্পর্ককে দৃঢ় করার লক্ষ্য রয়েছে।
সাম্প্রতিক দিনে পশ্চিম তটে ইসরায়েলি সেনারা ফিলিস্তিনি বাড়ি তল্লাশি ও হামলা চালিয়েছে। সিঞ্জিল শহরে সেনারা বাড়ি ভেঙেছে, বাসিন্দাদের মারধর করেছে এবং স্থাপনা ধ্বংস করেছে। জেনিনের আনজা গ্রামে দোকান ও ভবন ধ্বংস শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে হেব্রোনের মাসাফের বানী নাঈমে বসতিদের ওপর সন্ত্রাস চালিয়ে এক মেষ প্রাণী হত্যা, ৩০টি চুরি এবং গাড়ির চাকা কাটার ঘটনা ঘটেছে।
ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির নেতা মারিয়ান আলেকজান্ডার বেবি মোদির এই সফরকে দেশের স্বাধীনতার ঐতিহ্যের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, “গাজায় চলমান গণহত্যার সময় মোদির ইসরায়েলের প্রতি বন্ধুত্ব ভারতের দীর্ঘদিনের নীতি ও ফিলিস্তিনের স্ব-নির্ধারণের অধিকারকে প্রতিহত করছে। নেতানিয়াহুর সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা ভারতকে মঞ্চে নাচাতে যাচ্ছে।”
তবে রাজনৈতিক বিজ্ঞান ও নিরাপত্তা অধ্যয়ন বিভাগের গবেষক লরেন ডেগান আমোস মনে করেন, ভারত কৌশলগত খাতে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখবে এবং আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যেও সম্পর্ক ভাঙবে না। তিনি বলেন, “ভারত কার্যকর সহযোগিতা বজায় রাখতে সচেষ্ট, পাশাপাশি বিতর্কিত বিষয়গুলোকে বহুপাক্ষিক মঞ্চে সীমাবদ্ধ রাখছে। এটি বাধ্যতামূলক অংশীদারিত্ব, নিঃশর্ত সমর্থন নয়।”
সূত্রঃ আল-জাজিরা ও ওটিএন বাংলা ডেক্স