নির্বাচনের আগে প্রবাসী বাঙালিদের ঘিরে পশ্চিনবঙ্গ বিজেপির জোর তৎপরতা। ছবিঃ আনন্দবাজার
মেলবোর্ন, ২৬ ফেব্রুয়ারি- বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে ভিন্রাজ্যে কর্মসূত্রে বা জীবিকার টানে থাকা বাঙালিদের ভোটযুদ্ধে টানতে সক্রিয় হয়ে উঠেছে পশ্চিমবঙ্গ বিজেপি। ‘প্রবাসী শ্রমিক’ কিংবা ‘কর্মসূত্রে প্রবাসী’ যে নামেই ডাকা হোক, রাজ্য ছেড়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা এই বড় অংশের মানুষকে ভোটের সময়ে পশ্চিমবঙ্গে ফেরানো গেলে নির্বাচনী সমীকরণ বদলে যেতে পারে বলে মনে করছেন দলের নেতারা। সেই লক্ষ্যেই একের পর এক রাজ্যে গিয়ে বৈঠক শুরু করেছেন পশ্চিমবঙ্গের পদ্ম নেতারা।
বিজেপির কৌশল অনেকটা বিহার ও পঞ্জাবের রাজনৈতিক দলগুলির অনুসৃত পথের আদলে। বিহারে আরজেডি দীর্ঘদিন ধরে কলকাতা ও শহরতলিতে বসবাসকারী বিহারি ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে নির্বাচনের আগে তাঁদের নিজ রাজ্যে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। প্রয়োজনে যাতায়াতের খরচও জোগানো হয়েছে। পঞ্জাবে আম আদমি পার্টি ২০১৭ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিদেশে, বিশেষ করে কানাডায় থাকা পঞ্জাবিদের দেশে ফিরিয়ে প্রচারে কাজে লাগিয়েছিল। যদিও সে বছর জয় আসেনি, কিন্তু ২০২২ সালে একই ধারায় সংগঠিত প্রচারের ফল পায় আপ।
এই অভিজ্ঞতা সামনে রেখেই পশ্চিমবঙ্গ বিজেপি এবার ভিন্রাজ্যে থাকা বাঙালিদের নিয়ে পরিকল্পনা সাজাচ্ছে। বিভিন্ন রাজ্যের বড় শহরে গিয়ে সেখানে বসবাসকারী বাঙালি সমাজের সঙ্গে বৈঠক করছেন দলের সাংসদ ও নেতারা। তাঁদের অনুরোধ করা হচ্ছে, আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে ভোট দিতে যেন তাঁরা পশ্চিমবঙ্গে ফেরেন। যাঁদের পক্ষে যাতায়াতের খরচ বহন করা কঠিন, তাঁদের খরচ বহনের আশ্বাসও দেওয়া হচ্ছে। এমনকি গুজরাত, কর্নাটক, কেরল বা তামিলনাড়ুর মতো দূরবর্তী রাজ্য থেকে যাঁদের কয়েক দিনের ছুটি প্রয়োজন, তাঁদের কর্মস্থলের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে সবেতন ছুটির ব্যবস্থা করার কথাও বলা হচ্ছে।
দলের নেতারা একা এই কাজ করছেন না। দুর্গাপুজোর সময়ে ‘প্রবাসী বাঙালি মিলন’ ধরনের যে সব কর্মসূচি হয়েছিল, সেই সব সংগঠনকেই আবার সক্রিয় করা হয়েছে। তাঁদের মাধ্যমে বৈঠকে ডাকা হচ্ছে প্রবাসী বাঙালিদের। সেখানে পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান পরিস্থিতি, উন্নয়ন এবং পরিবর্তনের প্রশ্ন তুলে আলোচনা চলছে। স্থানীয় বিজেপি নেতৃত্ব ঘরে ঘরে যোগাযোগ, প্রচার এবং ছুটির ব্যবস্থার বিষয়টি দেখছে।
রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য সম্প্রতি গুজরাত সফরে গিয়েছেন। নরেন্দ্র মোদীর রাজ্য গুজরাতে, বিশেষ করে সুরতে বিপুল সংখ্যক বাঙালি বাস করেন বলে দলের দাবি। সুরতে কর্মরত বাঙালিদের অনেকেই হিরে, সোনা ও জরির কাজের সঙ্গে যুক্ত। শমীক জানান, সেখানে ১৫টি দুর্গাপুজো কমিটির প্রতিনিধিরা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরাও ছিলেন। তাঁর দাবি, পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে অনেকেই অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন এবং পরিবর্তনের পক্ষে মত দিয়েছেন।
রাজ্য বিজেপির প্রাক্তন সভাপতি ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার বলেন, দল শুধু প্রবাসী শ্রমিকদের নয়, বৃহত্তর প্রবাসী বাঙালি সমাজের কাছেও পৌঁছাচ্ছে। তাঁর মতে, যাঁদের অধিকাংশের ভোট এখনও পশ্চিমবঙ্গে রয়েছে, তাঁদের সক্রিয়ভাবে ভোটে অংশ নিতে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। আর যাঁরা আর পশ্চিমবঙ্গের ভোটার নন, তাঁরাও আত্মীয়-পরিজনদের প্রভাবিত করতে পারেন। বিভিন্ন রাজ্যে উন্নয়নের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তাঁরা নিজেদের পরিচিতদের সঙ্গে আলোচনা করবেন বলেই দলের আশা।
রাজ্য বিজেপির সাধারণ সম্পাদক লকেট চট্টোপাধ্যায় ও জ্যোতির্ময় সিংহ মাহাতো জানিয়েছেন, প্রবাসীদের আত্মীয়স্বজন পশ্চিমবঙ্গে রয়েছেন। তাঁদের মাধ্যমে ভোটের আগে বার্তা পৌঁছে দেওয়া হবে। লকেট যাচ্ছেন উত্তরাখণ্ডের দেহরাদূন ও হরিদ্বারে। জ্যোতির্ময় যাচ্ছেন ঝাড়খণ্ডের বোকারো। রানাঘাটের সাংসদ জগন্নাথ সরকার উত্তরপ্রদেশের লখনউ ও গোয়ায় বৈঠক করে এসেছেন। রায়গঞ্জের সাংসদ কার্তিক পাল গিয়েছেন বিহারের পটনায়। মহারাষ্ট্রের পুণেতেও দলীয় জনসংযোগ হয়েছে। আগামী কয়েক সপ্তাহে আরও কয়েকটি রাজ্যে সফরের পরিকল্পনা রয়েছে।
এদিকে সংখ্যার হিসাব নিয়েও মতভেদ রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তৈরি ‘পরিযায়ী শ্রমিক কল্যাণ বোর্ড’-এর প্রধান ও তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ সামিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, অন্যান্য রাজ্যে কর্মরত বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকের সংখ্যা ৩০ লক্ষের বেশি। কিন্তু সুকান্ত মজুমদারের দাবি, কর্মসূত্রে ভিন্রাজ্যে থাকা বাঙালির সংখ্যা অন্তত ৭০ লক্ষ। তাঁর বক্তব্য, সরকারি হিসাব মূলত শারীরিক শ্রমনির্ভর কর্মীদের নিয়ে, এর বাইরে আরও বহু বাঙালি রয়েছেন যাঁরা তথ্যপ্রযুক্তি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা অন্যান্য পেশায় কর্মরত। শমীক ভট্টাচার্যের দাবি, শুধু বেঙ্গালুরুতেই ১৫ লক্ষ বাঙালি কাজ করেন। সুরতে আড়াই লক্ষের বেশি।
সব মিলিয়ে, ভিন্রাজ্যে ছড়িয়ে থাকা বাঙালিদের ভোটে সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে এবার সংগঠিত প্রচারে নেমেছে পশ্চিমবঙ্গ বিজেপি। নির্বাচনের আগে এই উদ্যোগ কতটা বাস্তব ফল দেবে, তা এখন দেখার বিষয়।
সূত্রঃ আনন্দবাজার