বাংলাদেশ ব্যাংক; ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২৭ ফেব্রুয়ারি- বাংলাদেশে সদ্য শপথ নেওয়া তারেক রহমান নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর পদে আকস্মিক পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে। সরকার বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান হাবিব মনসুরের চুক্তি বাতিল করে তাঁর স্থলে মোস্তাকুর রহমানকে নিয়োগ দিয়েছে, যিনি গত ডিসেম্বর নিজের প্রতিষ্ঠানের ঋণ পুনঃতফসিল করেছিলেন।
হঠাৎ বিদায় আহসান হাবিব মনসুরের
গত বুধবার সরকার হঠাৎ করে মোস্তাকুর রহমানকে বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর হিসেবে নিয়োগের ঘোষণা দেয়। এর মাধ্যমে দায়িত্বের মেয়াদ শেষ হওয়ার অনেক আগেই (২০২৮ সাল পর্যন্ত মেয়াদ ছিল) বিদায় নিতে হয় অর্থনীতিবিদ আহসান হাবিব মনসুরকে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। ছবিঃ সংগৃহীত
মনসুর, যিনি মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৩তম গভর্নর হিসেবে যোগ দেন, জানান যে তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে আগে কিছু জানানো হয়নি। ব্লুমবার্গ নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, টেলিভিশন সংবাদে নিজের অপসারণের খবর দেখার পরই তিনি দায়িত্ব ছেড়েছেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে মনসুরের সংস্কার কার্যক্রম আলোচিত ছিল। তাঁর সময়ে প্রবাসী আয় ধারাবাহিকভাবে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছায়, ডলারবাজারে স্থিতিশীলতা ফেরে এবং বিনিময় হার অস্থিরতা কমে আসে।
আকস্মিকভাবে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক মহলে সমালোচনার ঝড় ওঠে। জামায়াতে ইসলামীর নেতা শফিকুর রহমান একে “সরকার-সমর্থিত মব কালচারের আনুষ্ঠানিক সূচনা” বলে অভিহিত করেন। ফেসবুকে তিনি লেখেন, “বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের মতো সম্মানিত ব্যক্তিকে এভাবে অপমান করার অধিকার কারও নেই।”
এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামও তীব্র সমালোচনা করে বলেন, “ঋণখেলাপি এক ব্যবসায়ীকে বসাতে গভর্নরকে মব চাপে সরানো হয়েছে—এটি জুলাই আন্দোলনের আকাঙ্ক্ষাকে ভূলুণ্ঠিত করেছে।”
দেশের শীর্ষ দৈনিক দ্য ডেইলি স্টার প্রশ্ন তোলে—“আহসান এইচ মনসুর কি সম্মানজনক বিদায়ের যোগ্য ছিলেন না?”
মোস্তাকুর রহমান: বিতর্কিত নিয়োগ
মোস্তাকুর রহমানের নিয়োগকে কেন্দ্র করে বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে। ঐতিহ্যগতভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদে নিয়োগ দেওয়া হয় অভিজ্ঞ ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদ বা নীতিনির্ধারণী অভিজ্ঞতাসম্পন্ন প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের। কিন্তু মোস্তাকুর রহমান একজন করপোরেট হিসাবরক্ষক ও গার্মেন্টস ব্যবসায়ী। তিনি বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) কেন্দ্রীয় ব্যাংকসংক্রান্ত স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন এবং বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্যও ছিলেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। ছবিঃ সংগৃহীত
সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে তাঁর প্রতিষ্ঠান ‘হেরা সোয়েটার্স’-এর ৮৯ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিল নিয়ে। গত ডিসেম্বর মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক বিশেষ সুবিধায় ১০ বছরের জন্য, দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ঋণ পুনর্গঠন করে।
ব্যাংকিং খাতের অনেকেই এটিকে স্বার্থের সংঘাত (conflict of interest) হিসেবে দেখছেন। এক ব্যাংক নির্বাহী ডেইলি স্টার-কে বলেন, “নিজ প্রতিষ্ঠানের ঋণ বিশেষ সুবিধায় পুনঃতফসিল করা ব্যক্তি কীভাবে দেশের ব্যাংকিং খাতের স্বার্থ রক্ষা করবেন?”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অর্থনীতি অধ্যাপক দীন ইসলাম সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, “একজন সক্রিয় শিল্পোদ্যোক্তাকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর করা হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা প্রশ্নের মুখে পড়ে।”
অন্যদিকে অধ্যাপক সেলিম রায়হান মন্তব্য করেন, “সরকার কি সত্যিই ব্যাংক খাত সংস্কারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ? কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল দায়িত্ব মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং দুর্বল ব্যাংকের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া—ব্যবসায়ীর অগ্রাধিকার ভিন্ন হতে পারে।”
সরকারের ব্যাখ্যা
অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অগ্রাধিকার অনুযায়ী পরিবর্তন আনতেই পারে।
“এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। শুধু বাংলাদেশ ব্যাংক নয়, বিভিন্ন জায়গায় পরিবর্তন আসবে এবং আসতেই থাকবে,” তিনি বলেন।
তিনি আরও যোগ করেন, “নতুন সরকারের কর্মসূচি, দৃষ্টিভঙ্গি ও লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য যেখানে প্রয়োজন সেখানে পরিবর্তন করা হবে—এটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক।”
সূত্র- First Post