বাংলাদেশ

অসুস্থতায় মৃত্যু, তবুও ‘জুলাই শহীদ’

  • 6:34 pm - March 02, 2026
  • পঠিত হয়েছে:২০ বার
আল হামীম সায়মন। ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ২ মার্চ- ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই মারা যান রাজধানীর সবুজবাগ থানার দক্ষিণগাঁও এলাকার আল হামীম সায়মন। তার মৃত্যুর পর মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের জুলাই অভ্যুত্থান শাখা প্রকাশিত ৮৪৪ জনের গেজেট তালিকায় ১০৭ নম্বরে স্থান পায় তার নাম। সরকারিভাবে তিনি ‘জুলাই শহীদ’ হিসেবে স্বীকৃতি পান। পরিবার পায় ৩০ লাখ টাকার আর্থিক সহায়তা এবং ভবিষ্যতে আবাসনের আশ্বাস। কিন্তু প্রায় দুই বছর পর তার মৃত্যু নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। তিনি কি সত্যিই আন্দোলনে নিহত হয়েছিলেন, নাকি অন্য কোনো কারণে তার মৃত্যু হয়েছে?

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, সায়মনের মৃত্যু ঘিরে সরকারি কাগজপত্র, পারিবারিক বক্তব্য, হাসপাতালের নথি এবং স্থানীয়দের বর্ণনার মধ্যে রয়েছে বিস্তর অসঙ্গতি। অভিযোগ রয়েছে, আন্দোলনে অংশ না নিয়েও তাকে ‘জুলাই শহীদ’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

১৮ জুলাই বিকেল ৩টার দিকে একটি ফোনকল পেয়ে বাসা থেকে বের হন সায়মন। এরপর আর পরিবারের সঙ্গে তার যোগাযোগ হয়নি। রাত সাড়ে ১০টার দিকে পরিবার জানতে পারে, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার মরদেহ রাখা আছে। পরদিন ভোরে মরদেহ এলাকায় এনে জানাজা শেষে কুমিল্লার দাউদকান্দিতে গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হয়।

২০২৫ সালের ৩০ জুন সায়মনের বাবা কামরুজ্জামান রাজধানীর রামপুরা থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় অজ্ঞাত ১০০ থেকে ১৫০ জনকে আসামি করা হয়। অভিযোগ করা হয়, রামপুরা এলাকায় আন্দোলনে অংশ নেওয়ায় আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীরা তাকে পিটিয়ে হত্যা করেছে। গত আট মাসে এ মামলায় শতাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

তবে সায়মনকে যারা চিনতেন, তাদের অনেকে দাবি করেছেন, তিনি কখনো জুলাই আন্দোলনে অংশ নেননি। বরং স্থানীয় আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং আন্দোলনের বিরোধিতা করতেন। দীর্ঘদিন সবুজবাগ থানার ৭৩ নম্বর ওয়ার্ডের শেখ রাসেল জাতীয় শিশু কিশোর পরিষদের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আন্দোলনবিরোধী বিভিন্ন পোস্টও ছিল বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। মৃত্যুর পর তার অ্যাকাউন্ট থেকে সেসব পোস্ট মুছে ফেলা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয় কয়েকজন বন্ধু ও দোকানি জানান, শারীরিকভাবে কিছুটা দুর্বল প্রকৃতির ছিলেন সায়মন। তবে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে এলাকায় পরিচিত ছিলেন। তাদের দাবি, মৃত্যুর দিন তিনি আন্দোলনে যাননি।

মৃত্যুর কারণ নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে ময়নাতদন্ত না হওয়া। হাসপাতালের মৃত্যু সনদে উল্লেখ করা হয়, তাকে মৃত অবস্থায় আনা হয়েছিল এবং মৃত্যুর কারণ ময়নাতদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে। সেখানে ‘শারীরিক নির্যাতনের ইতিহাস’ কথাটিও লেখা ছিল। হাসপাতালের টিকিটে ‘বুলেট ইনজুরি’ উল্লেখ করে পুলিশ কেস হিসেবে গ্রহণের নির্দেশনা দেওয়া হয়।

কিন্তু সেদিনই ভোরে ময়নাতদন্ত ছাড়াই মরদেহ হাসপাতালের মর্গ থেকে নিয়ে যান স্বজনরা। সবুজবাগ থানার উপপরিদর্শক বিমল মধু জানান, সায়মনের বাবা লিখিতভাবে জানান তার ছেলে অসুস্থ হয়ে স্ট্রোক করে মারা গেছে এবং ভবিষ্যতে এ বিষয়ে কোনো অভিযোগ করবেন না। সুরতহাল প্রতিবেদনে শরীরে দৃশ্যমান আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি বলেও তিনি দাবি করেন।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. শারমিন আক্তার বলেন, সেদিন বিপুলসংখ্যক আহত ব্যক্তি হাসপাতালে আসছিলেন। প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে টিকিটে ‘বুলেট ইনজুরি’ লেখা হলেও পরীক্ষার সময় শরীরে স্পষ্ট আঘাত দেখা যায়নি। সন্দেহ থাকায় ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ পাঠানো হয়েছিল।

অন্যদিকে সায়মনের মা দাবি করেন, তার ছেলের বুকে গুলি লেগেছিল। বাবা বলেন, তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে এবং মাথা ফেটে রক্তাক্ত হয়েছিল। তবে সুরতহাল প্রতিবেদনের সঙ্গে তাদের বক্তব্যের মিল পাওয়া যায়নি।

এদিকে স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, সেদিন বিকেলে সায়মন কাকরাইলের একটি বারে গিয়ে অতিরিক্ত মদ্যপান করেন। তার সঙ্গে থাকা ছোট হামজা জানান, অসুস্থ হয়ে বমি শুরু করলে সেখান থেকে তাকে সিএনজিতে করে হাসপাতালে নেওয়া হয়। পথেই তিনি নিস্তেজ হয়ে পড়েন। হাসপাতালে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পুলিশের ভয়ে তিনি প্রথমে মদ্যপানের কথা বলেননি বলেও স্বীকার করেন হামজা।

অভিযোগ রয়েছে, পরে ঘটনাটি গোপন রাখতে সায়মনের পরিবার ভিন্ন বর্ণনা দাঁড় করায়। যদিও এসব অভিযোগ অস্বীকার করে কামরুজ্জামান বলেন, এলাকার কিছু মানুষ তাদের ক্ষতি করতে চায়। তিনি দাবি করেন, তার ছেলে আন্দোলনেই নিহত হয়েছেন এবং সেটি সরকারের কাছেই প্রমাণিত।

সরকারি সহায়তার ৩০ লাখ টাকা প্রথমে অস্বীকার করলেও পরে কামরুজ্জামান স্বীকার করেন যে তার নামে স্থায়ী আমানত হিসেবে টাকা রাখা হয়েছে। কেন এক বছর পর মামলা করা হলো জানতে চাইলে তিনি বলেন, তিনি নিজে মামলা করতে চাননি, পরামর্শ পেয়ে করেছেন।

রামপুরা থানার উপপরিদর্শক মাসুদ রানা জানান, মামলাটি তদন্তাধীন। বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য সংগ্রহ করা হয়েছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত মন্তব্য করা সম্ভব নয়।

দাউদকান্দি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, মরদেহ উত্তোলনের কোনো নির্দেশনা তারা পাননি। পুলিশের অতিরিক্ত আইজি খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, জুলাই-সংক্রান্ত প্রতারণার অভিযোগ তদন্ত করা হচ্ছে এবং প্রমাণ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাও অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান।

ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মৃত্যুর ১৯ মাস পরও কঙ্কাল ও রাসায়নিক পরীক্ষার মাধ্যমে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব।

সব মিলিয়ে আল হামীম সায়মনের মৃত্যু এখন বড় প্রশ্নের মুখে। তিনি কি সত্যিই আন্দোলনে নিহত ‘জুলাই শহীদ’, নাকি অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে তার মৃত্যু হয়েছে? ময়নাতদন্ত ছাড়াই দাফন, পরস্পরবিরোধী বক্তব্য এবং তদন্তের ধীরগতির কারণে এই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এখনো মেলেনি।

এই শাখার আরও খবর

আরব আমিরাতের বিমানঘাঁটিতে ড্রোন হামলার দাবি ইরানের

মেলবোর্ন, ৭ মার্চ- মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিমানঘাঁটিতে হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরান। শনিবার দেশটির ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি)…

মুন্সীগঞ্জে হিন্দু নারী কবিরাজ হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন, প্রতিবেশী মীর হোসেন গ্রেপ্তার

মেলবোর্ন, ৭ মার্চ- মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখানে হিন্দু নারী ও স্থানীয়ভাবে পরিচিত কবিরাজ রেখা রাণী রায় হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনের দাবি করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। দীর্ঘদিন…

ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে ফুল দিতে এসে গ্রেপ্তার ৪, সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা

মেলবোর্ন, ৭ মার্চ- ঐতিহাসিক ৭ মার্চ উপলক্ষে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে ফুল দিতে এসে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন চারজন। তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দিয়ে আদালতে…

এশিয়ান কাপ শেষে ইরানে ফেরা নিয়ে শঙ্কায় নারী ফুটবলাররা, অস্ট্রেলিয়ায় সুরক্ষার দাবি জোরালো

মেলবোর্ন, ৭ মার্চ: ২০২৬ নারী এশিয়ান কাপ খেলতে অস্ট্রেলিয়ায় থাকা ইরানের নারী ফুটবল দলকে ঘিরে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মানবাধিকারকর্মী, ইরানি-অস্ট্রেলীয় কমিউনিটি এবং খেলোয়াড়দের অধিকার…

তেহরান ও ইসফাহানে ইসরায়েলের নতুন দফায় ‘ব্যাপক’ বিমান হামলা

মেলবোর্ন, ৭ মার্চ- মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে ইরানের রাজধানী তেহরান ও গুরুত্বপূর্ণ শহর ইসফাহানে নতুন দফা ব্যাপক বিমান হামলা শুরু করেছে ইসরায়েল। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী…

প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে ক্ষমা চাইলেন ইরানের প্রেসিডেন্ট, হামলা স্থগিতের ঘোষণা

মেলবোর্ন, ৭ মার্চ- মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে প্রতিবেশী দেশগুলোর উদ্দেশে দুঃখ প্রকাশ করেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তিনি বলেছেন, ইরানের অন্য কোনো দেশে আগ্রাসন চালানোর…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au