বাংলাদেশ

মব করে পদ দখল, ৭০ হাজারের বেতন বাড়িয়ে ৫ লাখ

  • 6:07 pm - March 12, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৮৩ বার
অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের কিছুদিন পর আবারও সক্রিয় হয় মববাজ চক্রটি। ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ১২ মার্চ- দেশের সরকারি সেবাকে ডিজিটাল মাধ্যমে মানুষের কাছে সহজ ও দ্রুত পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে চালু হওয়া এটুআই প্রকল্পে মবের প্রভাব, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মবের চাপে এক সময় বরখাস্ত হওয়া এক কর্মকর্তা পুনরায় প্রতিষ্ঠানে ঢুকে বড় পদ দখল করেন এবং নিজের বেতন কয়েক গুণ বাড়িয়ে নেন। যেখানে আগে তিনি মাসে ৭০ হাজার টাকা বেতন পেতেন, পরে সেটি বাড়িয়ে পাঁচ লাখ টাকায় উন্নীত করা হয়। একই ধরনের সুবিধা পেয়েছেন তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজন সহযোগীও।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে বহুল আলোচিত শব্দ হয়ে ওঠে ‘মব’। সেই সময়ের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর এটুআই কার্যালয়েও মবের প্রভাব দেখা যায় বলে অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, সেই সময় এটুআইয়ের ভেতরে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয় এবং প্রভাব খাটিয়ে পদ-পদবি দখলের ঘটনা ঘটে।

ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে সরকারি সেবাকে আরও সহজ ও স্বচ্ছ করতে এটুআই প্রকল্প চালু করা হয়েছিল। বিএনপি সরকারের শেষ সময়ে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের যৌথ উদ্যোগে এ প্রকল্পের সূচনা হয়। পরে আওয়ামী লীগ সরকার এটিকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের অধীনে স্থানান্তর করে। দেশের অধিকাংশ ই-গভর্ন্যান্স উদ্যোগ বাস্তবায়নে এটুআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। ২০২৩ সালে এটিকে প্রকল্প থেকে এজেন্সিতে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। বর্তমানে এটি এখনো প্রকল্প হিসেবেই পরিচালিত হচ্ছে এবং আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পের মেয়াদ রয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, ফাহিম আবদুল্লাহ নামের একজন ব্যক্তি এই ঘটনাপ্রবাহের কেন্দ্রীয় চরিত্র। তিনি এক সময় এটুআইয়ের ই-ফাইলিং সিস্টেমের একজন জুনিয়র কনসালট্যান্ট হিসেবে কাজ করতেন। রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ২০২৩ সালে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে শৃঙ্খলাভঙ্গ ও অদক্ষতার অভিযোগে তাকে এটুআই থেকে বহিষ্কার করা হয়।

কিন্তু ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট সকালে ফাহিম আবদুল্লাহ একদল বহিরাগত অনুসারী নিয়ে এটুআই কার্যালয়ে হাজির হন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তিনি প্রকল্প পরিচালক ও যুগ্ম প্রকল্প পরিচালকের কক্ষে গিয়ে বিভিন্ন ধরনের চাপ ও হুমকি দিতে থাকেন। এক পর্যায়ে তিনি চিৎকার করে নিজের চাকরি ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানান। এরপর তিনি নিজেকে এটুআইয়ের হেড অব প্রোগ্রাম ম্যানেজমেন্ট হিসেবে ঘোষণা করতে শুরু করেন।

এটুআইয়ের এক সাবেক কনসালট্যান্ট জানান, প্রথম দিনের ঘটনাটি সফল না হওয়ায় ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট আবারও ফাহিমের অনুসারীরা কার্যালয়ে আসে এবং একইভাবে হুমকি-ধমকি দিতে থাকে। সেদিন ফাহিম নিজে না এসে তার সাবেক কর্মস্থল কোডেস্ক সফটওয়্যার সলিউশন লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তালহা ইবনে আলাউদ্দিনসহ কয়েকজনকে পাঠান। তারা এটুআইয়ের প্রজেক্ট ম্যানেজার মো. মামুনুর রশিদ ভূঁইয়ার ওপর নানা ধরনের চাপ সৃষ্টি করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের কিছুদিন পর আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে ওই মব চক্র। অভিযোগ রয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নামহীন ফেসবুক পেজে মনগড়া অভিযোগ তুলে তদন্তের দাবি জানানো হয় এবং বিভিন্ন দপ্তরের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়।

২০২৪ সালের ২০ আগস্টের একটি ভিডিওতে দেখা যায়, কয়েকজন ছাত্রনেতাসহ ১০ থেকে ১২ জনের একটি দল তৎকালীন অতিরিক্ত সচিব মামুনুর রশীদকে ঘিরে রেখেছে। ওই ঘটনার নেতৃত্বে তালহা ইবনে আলাউদ্দিন নামের এক ছাত্রনেতা ছিলেন বলে জানা যায়। পরিস্থিতি শান্ত করতে ওই সময় অতিরিক্ত সচিব বলেন, অভিযোগের তদন্ত চলছে এবং প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তবে ওই দিনই এটুআইয়ের ১৪ জন কর্মকর্তা ও কনসালট্যান্টকে দায়িত্ব পালন থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, তাদের কাউকে কোনো লিখিত নোটিশ দেওয়া হয়নি। বরং একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে জানানো হয় যে সবাই যেন কার্যালয় ত্যাগ করেন।

দায়িত্ব পালন থেকে বিরত রাখা কর্মকর্তাদের মধ্যে ছিলেন পলিসি অ্যাডভাইজার আনির চৌধুরী, ই-গভর্নমেন্ট এনালিস্ট ফরহাদ জাহিদ শেখ, প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট স্পেশালিস্ট মাজেদুল ইসলাম, প্রজেক্ট এনালিস্ট পূরবী মতিন, টেকনোলজি এনালিস্ট হাফিজুর রহমান, ক্যাপাসিটি ডেভেলপমেন্ট স্পেশালিস্ট মানিক মাহমুদ, রিসোর্স মবিলাইজেশন স্পেশালিস্ট নাসের মিয়া, ডিএফএস স্পেশালিস্ট তহুরুল হাসান, সলিউশন আর্কিটেকচার স্পেশালিস্ট রেজওয়ানুল হক জামী, সিনিয়র কনসালট্যান্ট আসাদ উজ্জামান, ই-নথি ইমপ্লিমেন্টেশন এক্সপার্ট আল ফাত্তাহ, সিনিয়র সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার তানভীর কাদের ইমন, অ্যাডমিন কনসালট্যান্ট ওমর ফারুক এবং সিনিয়র কনসালট্যান্ট সালাউদ্দিন।

এর কিছুদিন পর নাটকীয়ভাবে আবার এটুআইতে ফিরে আসেন ফাহিম আবদুল্লাহ। ২০২৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর তাকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, যথাযথ যোগ্যতা বা অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও তাকে প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্টের প্রধান পদে বসানো হয়। অথচ এটুআইয়ের কারিগরি সহায়তা প্রকল্প প্রস্তাব অনুযায়ী এ পদে নিয়োগের জন্য অন্তত আট বছরের প্রাসঙ্গিক অভিজ্ঞতা এবং চার বছরের প্রকল্প ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা থাকা বাধ্যতামূলক।

নিয়োগের পর ফাহিমের বেতন কয়েক ধাপে বাড়ানো হয়। এটুআইয়ের অভ্যন্তরীণ নথি অনুযায়ী, ২০২২ সালের অক্টোবর মাসে তার বেতন ছিল ৭০ হাজার টাকা। পরে ধাপে ধাপে সেটি বাড়িয়ে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে চার লাখ টাকা এবং ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে পাঁচ লাখ টাকা করা হয়।

একইভাবে তার সহযোগী মাজেদুল আলম মাহির বেতন ৭০ হাজার টাকা থেকে প্রায় তিন লাখ টাকায় উন্নীত হয়। আরেক সহযোগী আরিফুর রহমানের বেতন দুই লাখ টাকা থেকে বেড়ে সাড়ে চার লাখ টাকায় দাঁড়ায়। অন্য কয়েকজন কনসালট্যান্টের ক্ষেত্রেও একই ধরনের বেতন বৃদ্ধির ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে এটুআই প্রকল্প থেকে কর্মকর্তা অপসারণের ঘটনায় জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির সঙ্গে টানাপোড়েন তৈরি হয়। ২০২৪ সালের অক্টোবরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক নোটে সংস্থাটি জানায়, তাদের অধীনে কর্মরত কর্মকর্তারা বাংলাদেশ সরকারের সরাসরি কর্মচারী নন এবং তাদের নিয়োগ ও কার্যক্রম জাতিসংঘের নীতিমালা অনুযায়ী পরিচালিত হয়।

পরবর্তীতে ২০২৫ সালের জুনে জাতিসংঘের অডিট ও তদন্ত দপ্তর এ বিষয়ে তদন্ত শুরু করে। তদন্ত শেষে সংস্থাটি জানায়, অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি এবং মামলাটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, পদ দখলের পর এটুআই কার্যালয়ে এক ধরনের প্রভাবশালী অবস্থান তৈরি করেন ফাহিম আবদুল্লাহ। নিয়মের বাইরে গিয়ে তিনি সরকারি গাড়ি ব্যবহার করছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তিনি। তার দাবি, মবের সঙ্গে তার নিয়োগের কোনো সম্পর্ক নেই এবং যথাযথ প্রক্রিয়ায়ই তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক মো. আবদুর রফিক বলেন, বিষয়টি সাংবাদিকদের মাধ্যমে তিনি জেনেছেন। অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করা হবে এবং সত্যতা পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সূত্রঃ কালের কণ্ঠ

এই শাখার আরও খবর

মানবাধিকার পরিস্থিতি উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রীর কাছে আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোর চিঠি

মেলবোর্ন, ১৬ মার্চ- বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়নে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকারবিষয়ক কয়েকটি সংগঠন। চিঠিতে তারা…

লেবাননের দক্ষিণে স্থল অভিযানের ঘোষণা ইসরায়েলের, সংঘাতে নিহত অন্তত ৮৫০

মেলবোর্ন, ১৬ মার্চ- লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে স্থল অভিযান শুরু করার ঘোষণা দিয়েছে ইসরায়েল। আলজাজিরার সরাসরি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর ৯১তম ব্রিগেড তাদের ঘোষিত ‘ফরোয়ার্ড ডিফেন্স…

খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী

মেলবোর্ন, ১৬ মার্চ- নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দেশব্যাপী নদী, নালা, খাল ও জলাধার খনন এবং পুনঃখনন কর্মসূচির উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সোমবার দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার…

স্কুলে ভর্তি পরীক্ষা আবার চালুর আলোচনা, শিশুদের ওপর চাপ বাড়ার আশঙ্কা

মেলবোর্ন, ১৬ মার্চ- বিদ্যালয়ের প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার্থী ভর্তিতে আবারও ভর্তি পরীক্ষা চালুর বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিষয়টি রোববার জাতীয় সংসদেও উত্থাপিত হয়েছে। তবে শিক্ষাবিদ ও…

হরমুজ ইস্যুতে যুদ্ধজাহাজ পাঠাতে বললেন ট্রাম্প, সাড়া দিল না জাপান ও অস্ট্রেলিয়া

মেলবোর্ন, ১৬ মার্চ- হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মিত্র দেশগুলোর প্রতি যৌথ উদ্যোগে নৌবাহিনী পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে তার এই আহ্বানের…

শত্রুদের তথ্য দেওয়ার অভিযোগে ইরানে ৫০০ জন গ্রেপ্তার

মেলবোর্ন, ১৬ মার্চ- শত্রুদের কাছে সংবেদনশীল তথ্য সরবরাহের অভিযোগে ইরানে অন্তত ৫০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন দেশটির পুলিশপ্রধান আহমেদরেজা রাদান। রোববার দেওয়া এক…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au