মেলবোর্ন, ১৪ মার্চ- ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান সংঘাতে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। প্রথমবারের মতো প্রায় ২ হাজার ৫০০ মার্কিন মেরিন সেনাকে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর প্রস্তুতি নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে অঞ্চলজুড়ে বাড়ছে সামরিক তৎপরতা, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং তেলবাজারে অস্থিরতার আশঙ্কা। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনার ধারাবাহিকতায় বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, সংঘাতটি দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা আপাতত কমে গেছে এবং পরিস্থিতি আরও জটিল দিকে এগোতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের জাপানভিত্তিক সামরিক ঘাঁটি থেকে ৩১তম মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিটের প্রায় আড়াই হাজার সদস্য ইতিমধ্যে যাত্রা শুরু করেছেন। জাপানের ওকিনাওয়া দ্বীপে অবস্থিত ঘাঁটি থেকে তারা মধ্যপ্রাচ্যের দিকে অগ্রসর হচ্ছেন।
এই বাহিনীর সঙ্গে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী উভচর যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস ত্রিপোলি। এই ধরনের যুদ্ধজাহাজ থেকে সরাসরি স্থলসেনা ও সামরিক সরঞ্জাম যুদ্ধক্ষেত্রে নামানো সম্ভব। প্রয়োজনে দ্রুত উপকূলে অবতরণ করে অভিযান চালানোর সক্ষমতাও রয়েছে এতে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বাহিনীকে সাধারণত দ্রুত প্রতিক্রিয়া বাহিনী হিসেবে ব্যবহার করা হয়। সংকটপূর্ণ এলাকায় জরুরি অভিযান, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নিয়ন্ত্রণে নেওয়া অথবা বিশেষ সামরিক অভিযানে তাদের মোতায়েন করা হয়। ইরানকে ঘিরে বর্তমান পরিস্থিতিতে এই মেরিন ইউনিটকে সম্ভাব্য অভিযান বা সংকট মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত রাখা হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এটি কার্যত ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতে প্রথমবারের মতো বড় আকারে মার্কিন স্থলসেনা মোতায়েনের উদ্যোগ। এর মধ্য দিয়ে বোঝা যাচ্ছে যে যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে যুদ্ধক্ষেত্রে সামরিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছে।
খামেনিকে ধরিয়ে দিতে পুরস্কার ঘোষণা
ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি বড় পদক্ষেপ হলো দেশটির নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি ও ইসলামি বিপ্লবী গার্ডের কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তাকে ধরিয়ে দিতে পুরস্কার ঘোষণা।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ‘রিওয়ার্ডস ফর জাস্টিস’ কর্মসূচির আওতায় এ ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, এসব ব্যক্তির অবস্থান বা কার্যক্রম সম্পর্কে তথ্য দিলে তথ্যদাতাকে ১ কোটি ডলার পর্যন্ত পুরস্কার দেওয়া হতে পারে।
এই কর্মসূচি যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক নিরাপত্তা বিভাগ পরিচালনা করে। তাদের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, তালিকাভুক্ত নেতারা ইসলামি বিপ্লবী গার্ডের বিভিন্ন শাখার নেতৃত্ব দেন এবং বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের সঙ্গে জড়িত।
ঘোষণার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন নেতার ছবিও প্রকাশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বলা হয়েছে, তথ্যদাতাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রয়োজনে তাদের পুনর্বাসনের সুযোগও দেওয়া হবে।
বাগদাদে মার্কিন দূতাবাসে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার মধ্যেই ইরাকের রাজধানী বাগদাদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসে ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে। ফরাসি বার্তা সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একটি ড্রোন দূতাবাসের ভেতরে আঘাত হানে।
ইরাকের নিরাপত্তা বাহিনীর একটি সূত্রও কূটনৈতিক মিশনে হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। কয়েকটি সূত্রের বরাতে জানা গেছে, রাজধানীতে ইরানসমর্থিত দুই যোদ্ধা নিহত হওয়ার কিছুক্ষণ পরই দূতাবাসে এই হামলা হয়।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দূতাবাস প্রাঙ্গণের ভেতরে থাকা একটি হেলিপ্যাডে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে এবং সেখান থেকে ধোঁয়া উঠতে দেখা যায়।
বাগদাদের গ্রিন জোন নামে পরিচিত কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত এলাকায় অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসটি অতীতেও একাধিকবার রকেট ও ড্রোন হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছিল।
এই হামলার বিষয়ে মার্কিন দূতাবাস থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে এর আগে দূতাবাস কর্তৃপক্ষ ইরাকের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে সর্বোচ্চ পর্যায়ের সতর্কতা জারি করেছিল। সতর্কবার্তায় বলা হয়েছিল, ইরানপন্থী গোষ্ঠীগুলো অতীতে মার্কিন নাগরিক ও স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে এবং ভবিষ্যতেও এমন হামলার আশঙ্কা রয়েছে।
ইরানের খারগ দ্বীপে মার্কিন হামলা
সংঘাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ইরানের খারগ দ্বীপে মার্কিন হামলার ঘটনা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে বড় ধরনের বিস্ফোরণ ও কালো ধোঁয়া দেখা গেছে।
সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণে ভিডিওটির অবস্থান শনাক্ত করে বলা হয়েছে, এটি ইরানের খারগ দ্বীপের বিমানবন্দর ও রানওয়ের আশপাশের এলাকা। হামলায় সেখানে অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির প্রমাণ পাওয়া গেছে।
খারগ দ্বীপ ইরানের তেল রপ্তানির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির প্রায় ৯০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল এই দ্বীপের টার্মিনাল দিয়েই আন্তর্জাতিক বাজারে যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ওই দ্বীপের সব সামরিক লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করা হয়েছে। তিনি আরও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ইরান যদি হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়া অব্যাহত রাখে, তাহলে দ্বীপটির তেল অবকাঠামোও লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে।
তেলবাজারে অস্থিরতার আশঙ্কা
খারগ দ্বীপে হামলার পর বৈশ্বিক তেলবাজারে বড় ধরনের অস্থিরতার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মার্ক কিমিট বলেন, এই হামলা যুদ্ধের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
তার মতে, এখন আর সংঘাত কেবল সামরিক লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং ইরানের অর্থনৈতিক অবকাঠামোও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, ইরান যদি পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের তেল অবকাঠামোতে হামলা চালায়, তাহলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ। এই প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেলবাহী জাহাজ চলাচল করে। যদি এই পথ দীর্ঘ সময়ের জন্য বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যেতে পারে।
লেবাননে ইসরায়েলি হামলা,১২ চিকিৎসাকর্মী নিহত
এদিকে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলেও সংঘাতের প্রভাব দেখা যাচ্ছে। সেখানে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ১২ জন চিকিৎসাকর্মী নিহত হয়েছেন।
লেবাননের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানায়, বুর্জ কালাউইয়া শহরের একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলায় চিকিৎসক, প্যারামেডিক ও নার্সসহ অন্তত ১২ জন নিহত হন।
এর আগে সাওয়ানেহ শহরে পৃথক আরেকটি হামলায় হিজবুল্লাহ ও তাদের সহযোগী সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুই প্যারামেডিক নিহত হন।
মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে একের পর এক হামলা, সামরিক মোতায়েন এবং তেলবাজারের অনিশ্চয়তা মিলিয়ে পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে উঠছে। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, ইরানকে ঘিরে এই সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে তা শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপরও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।