মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে অস্ট্রেলিয়ায় জ্বালানি সংকট ও রেশনিংয়ের আশঙ্কা বাড়ছে। ছবি: সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১৬ মার্চ: যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান সংঘাত আরও দীর্ঘায়িত হলে অস্ট্রেলিয়াকে জ্বালানি রেশনিংয়ের মতো কঠোর পদক্ষেপ নিতে হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশ্লেষকেরা। মধ্যপ্রাচ্যের এই বহুমাত্রিক যুদ্ধ এখন তৃতীয় সপ্তাহে গড়িয়েছে, আর এর প্রভাব ইতোমধ্যেই বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তীব্রভাবে পড়তে শুরু করেছে।
অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসতে তেহরানের আগ্রহ নেই। এতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সেই বক্তব্যের বিরোধিতা করা হয়, যেখানে তিনি দাবি করেছিলেন, ইরান যুদ্ধ শেষ করতে একটি চুক্তি চাইছে।
যুদ্ধের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের সামরিক স্থাপনাগুলোতে হামলা চালাচ্ছে। এর জবাবে তেহরান প্রতিবেশী কয়েকটি রাষ্ট্রের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম দ্রুত বেড়ে গেছে। বিশেষ করে ইরান যদি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দীর্ঘ সময়ের জন্য বাধাগ্রস্ত করে, তাহলে অপরিশোধিত তেলের দাম আরও অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ট্রাম্প প্রশাসন ইঙ্গিত দিয়েছে, হরমুজ প্রণালি খুলে রাখতে এবং তেলবাহী জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে অন্য দেশগুলোকেও এগিয়ে আসতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের পরিবহনমন্ত্রী শন ডাফি ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, যথাযথ নৌ-সুরক্ষা ও বীমা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে কয়েক দিনের মধ্যেই প্রণালিটি দিয়ে আবার তেল পরিবহন শুরু হতে পারে। তবে তিনি এটাও বলেন, পরিস্থিতি একদিনেও বদলাতে পারে, আবার এক সপ্তাহও লেগে যেতে পারে।
এই সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার ৩২টি সদস্যদেশ গত সপ্তাহে জরুরি মজুত থেকে ৪০ কোটি ব্যারেল তেল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যদিও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি কেবল অস্থায়ী স্বস্তি দিতে পারে।
অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসতে তেহরানের আগ্রহ নেই। এতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সেই বক্তব্যের বিরোধিতা করা হয়, যেখানে তিনি দাবি করেছিলেন, ইরান যুদ্ধ শেষ করতে একটি চুক্তি চাইছে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়েছে। এটি ছিল সমুদ্রপথে বৈশ্বিক তেল বাণিজ্যের প্রায় ২৫ শতাংশ। ফলে এই প্রণালিতে দীর্ঘমেয়াদি বিঘ্ন ঘটলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহে বড় ধরনের চাপ তৈরি হবে।
এই সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার ৩২টি সদস্যদেশ গত সপ্তাহে জরুরি মজুত থেকে ৪০ কোটি ব্যারেল তেল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যদিও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি কেবল অস্থায়ী স্বস্তি দিতে পারে।
ডিকিন ল’ স্কুলের জ্বালানি নীতি বিশেষজ্ঞ সামান্থা হেপবার্ন এবিসিকে বলেন, যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক তেলবাজারে ইতিহাসের অন্যতম বড় সরবরাহ বিঘ্ন তৈরি হয়েছে। তাঁর ভাষায়, স্বল্পমেয়াদি মজুত দিয়ে এই সংকট সামাল দেওয়া সম্ভব হবে না, এবং পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে দ্রুত জ্বালানি রেশনিং চালু করতে হতে পারে।
তিনি বলেন, প্রথম ধাক্কা পড়বে পেট্রোল স্টেশনগুলোতে। সেখানে মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহ-সংকট দেখা দিতে পারে। তবে সংকট দীর্ঘ হলে এর প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়বে। জ্বালানির দাম বাড়লে অস্ট্রেলিয়ায় মূল্যস্ফীতিও আরও বেড়ে যেতে পারে। এতে রিজার্ভ ব্যাংক সুদের হার বাড়াতে বাধ্য হতে পারে, যা ইতোমধ্যেই গৃহঋণের চাপে থাকা লাখো মানুষের জন্য নতুন দুর্ভোগ ডেকে আনবে।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নতুন মাত্রা পেয়েছে লেবানন সীমান্তে। ইসরায়েল দেশটির উত্তর সীমান্তঘেঁষা এলাকায় একাধিক হামলা অব্যাহত রেখেছে। সোমবার স্থানীয় সময় সকালে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী জানায়, দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর অবস্থান লক্ষ্য করে তারা সীমিত ও নির্দিষ্ট স্থল অভিযান শুরু করেছে। তাদের দাবি, এর উদ্দেশ্য হচ্ছে সশস্ত্র অবকাঠামো ধ্বংস করা এবং সীমান্ত নিরাপত্তা আরও জোরদার করা।
বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, ততই তা শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বের বহু দেশের অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক অবস্থানকে চাপে ফেলবে।