মেলবোর্ন, ৪ এপ্রিল- ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে একটি মার্কিন যুদ্ধবিমান ‘এফ–১৫ই’ বিধ্বস্ত হওয়ার পর সেই বিমানে থাকা একজন পাইলটকে উদ্ধার করতে অভিযান শুরু করেছে আমেরিকা। তবে শেষ খবর পর্যন্ত সেই পাইলটের ভাগ্যে ঠিক কি ঘটেছে, তা জানা যায়নি।
ইরানে নিখোঁজ পাইলটের সন্ধান যখন চলছে, তখন বিশ্ববাসীর নজর এমন এক সারভাইভাল সিস্টেমের ওপর। যা চরম প্রতিকূল পরিস্থিতিতে দারুণ কাজ করে। অধুনিক প্রযুক্তি সঙ্গে উন্নত প্রশিক্ষণের সমন্বয় রক্ষা করে পাইলটের প্রাণ।
শত্রুপক্ষের এলাকায় বিধ্বস্ত হওয়া পাইলটদের টিকে থাকার লড়াইয়ে সেই ‘সারভাইভাল সিস্টেম’ পাইলট প্যারাশুটের মাধ্যমে বেরিয়ে আসার পর (ইজেক্ট) প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকতে কিভাবে কাজ করে, তা তুলে ধরেছে ইন্ডিয়া টুডে।
কীভাবে কাজ করে এই সিস্টেম
যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার মতো উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির জন্য মার্কিন বিমান বাহিনীর ‘সারভাইভাল সিস্টেম’ মূলত প্রযুক্তি, কৌশল এবং কঠোর প্রশিক্ষণের এক অনন্য সমন্বয়। সারভাইভাল ডকট্রিনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি এই সিস্টেম কেবল একটি কিট বা সরঞ্জামের বাক্সে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি বিভিন্ন স্তরভিত্তিক প্রস্তুতি।
এই সিস্টেমে রয়েছে ইজেকশন সিটের নিচে থাকা একটি সারভাইভাল কিট, পাইলটের গায়ে থাকা একটি বিশেষ ভেস্ট, হেলমেট, রেডিও এবং অস্ত্র। এসব কিছু মিলিয়ে টিকে থাকার জন্য চারটি মূল নীতি অনুসরণ করা হয়। যার প্রথম ধাপে রয়েছে টিকে থাকার (সারভাইভাল) ব্যবস্থা। এরপর যথাক্রমে রয়েছে পালানো (এস্কেপ) বা উদ্ধার (রেসকিউ) এবং এড়িয়ে চলার ব্যবস্থা (ইভেশন)। এই চারটি ধাপকে সংক্ষেপে ‘SERE’ বলা হয়।
পাইলটদের বিশেষ SERE প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। যা তাদের প্রতিকূল পরিবেশ সহ্য করা, শত্রু পক্ষকে এড়িয়ে চলা, বন্দি হওয়া থেকে নিজেকে রক্ষা করা এবং শেষ পর্যন্ত উদ্ধারকারী দলের কাছে পৌঁছানোর জন্য প্রস্তুত করে তোলে। এই প্রশিক্ষণে কেবল সরঞ্জামের ওপর নির্ভর না করে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতার ওপরও জোর দেওয়া হয়।
সারভাইভাল কিটে কী থাকে
‘সারভাইভাল সিস্টেম’ এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটি হলো সারভাইভাল কিট। যা ইজেক্ট করার সময় প্যারাশুটের সাথে নিচে নেমে আসে। মাটিতে নামার পর এটিই হয়ে ওঠে পাইলটের জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জাম। এতে যোগাযোগ এবং পথনির্দেশক সরঞ্জামকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়।
সারভাইভাল রেডিওর মাধ্যমে উদ্ধারকারী দলের সাথে যোগাযোগ করা হয়। এছাড়া কম্পাস, সিগন্যাল মিরর এবং জিপিএস বিকন পাইলটকে নিজের অবস্থান নির্ণয় ও তা জানাতে সাহায্য করে। পাহাড় বা ঘন জঙ্গলের মতো দুর্গম এলাকায় এই সরঞ্জামগুলো অত্যন্ত কার্যকর।
ইরানের নিখোঁজ পাইলটের ক্ষেত্রে ধারণা করা হচ্ছে, তিনি জাগরোস পর্বতমালায় কোথাও রয়েছেন। যেখানে ইরান এবং মার্কিন উদ্ধারকারী- উভয় পক্ষই তাকে খুঁজছে।

এফ-৩৫ যুদ্ধ বিমানের ফাইল ছবি
উদ্ধারের জন্য সংকেত
এই কিটে অগ্নিসংকেত বা ফ্লেয়ার, ধোঁয়ার বোমা (স্মোক বোম্ব), স্ট্রোব লাইট এবং গ্লো স্টিকসহ বিভিন্ন ধরনের সিগন্যালিং সরঞ্জাম থাকে। এগুলোর মাধ্যমে পাইলট ঘন জঙ্গল বা রাতের অন্ধকারেও অনুসন্ধানকারী বিমান বা হেলিকপ্টারকে নিজের অবস্থান জানান দিতে পারেন।
খাবার, পানি ও সহনশীলতা
এই পরিস্থিতিতে একজন পাইলটের বেঁচে থাকার অর্থ কেবল শত্রুর হাত থেকে বাঁচা নয়, তার শরীরকেও সচল রাখা। এ জন্য কিটটিতে পানির প্যাকেট, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট এবং উচ্চ-শক্তি সম্পন্ন জরুরি খাদ্য থাকে। সেই খাদ্য তাকে তিন থেকে সাত দিন পর্যন্ত স্বাভাবিক রাখতে পারে। এই হালকা ওজনের খাবারগুলো দীর্ঘ সময় টিকে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় ক্যালোরি সরবরাহ করে।
চিকিৎসা সহায়তা
বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার সময় পাইলটের আহত হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা তাকে। তা মোকাবিলায় সিস্টেম কিটে প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জাম যেমন ব্যান্ডেজ এবং রক্তপাত বন্ধের ফিতা (টরনিকোয়েট) দেওয়া থাকে। এর মাধ্যমে পাইলটরা পেশাদার সাহায্য আসার আগ পর্যন্ত নিজের ক্ষতস্থান স্থিতিশীল রাখতে পারেন।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে সুরক্ষা
এই কিট চরম আবহাওয়ার সাথেও লড়তে সক্ষম। শরীরের তাপমাত্রা ধরে রাখতে থার্মাল ব্ল্যাঙ্কেট, বৃষ্টি ও বাতাস থেকে বাঁচতে পনচো এবং আগুন জ্বালানোর জন্য দিয়াশলাই থাকে। এই সরঞ্জামগুলো মরুভূমি থেকে শুরু করে তুষারপাত- সব পরিবেশেই পাইলটকে সুরক্ষা দেয়।
সমুদ্রে অবতরণের বিশেষ সরঞ্জাম
বিধ্বস্ত হওয়ার পর যদি একজন পাইলট পানির ওপর অবতরণ করেন, তবে কিটটির ধরন বদলে যায়। তখন এতে থাকে একটি বায়ুভর্তি লাইফ রাফট এবং ‘সি ডাই’ (Sea Dye)। এই রাসায়নিকটি পানিতে উজ্জ্বল রঙ ছড়িয়ে দেয় যাতে আকাশ থেকে পাইলটকে সহজে দেখা যায়। যা সামুদ্রিক উদ্ধার অভিযানে অত্যন্ত জরুরি।
শেষ অবলম্বন আত্মরক্ষা
শত্রুকে এড়িয়ে চলাই প্রধান লক্ষ্য হলেও আত্মরক্ষার জন্য পাইলটদের কাছে অস্ত্র থাকে। আগে শুধু পিস্তল দেওয়া হলেও বর্তমানে আধুনিক কিটগুলোতে ভাঁজ করা যায় এমন ছোট সারভাইভাল রাইফেল থাকে। তবে এর ব্যবহারকে ধরা হয় একদম শেষ উপায় হিসেবে।

বিধ্বস্ত হওয়ার আগ মুহূর্তে পাইলটের জরুরি অবতরণ
অভিযান অনুযায়ী পরিবর্তনযোগ্য ব্যবস্থা
মার্কিন বিমান বাহিনীর এই সিস্টেমটি পরিবর্তনযোগ্য (মডিউলার)। অর্থাৎ মিশন এবং ভূখণ্ড অনুযায়ী এটি সাজানো যায়। যেমন- আর্কটিক মিশনের জন্য বাড়তি শীতবস্ত্র, মরুভূমির জন্য পানি ও রোদ থেকে সুরক্ষা এবং সামুদ্রিক অভিযানের জন্য বিশেষ সরঞ্জাম যুক্ত করা হয়।
শত্রু সীমানায় পাইলট একা নন
শত্রু এলাকায় একজন পাইলট বিচ্ছিন্ন হতে পারেন, কিন্তু তিনি অসহায় নন। উন্নত সরঞ্জাম, কঠোর প্রশিক্ষণ এবং কৌশলগত প্রস্তুতির কারণে উদ্ধারের আগ পর্যন্ত তার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে যায়।