বাংলাদেশ

অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ

৫৪৭ দিনে ৪২৫ নিয়োগ: রেকর্ড স্থাপন করেছেন চবির সদ্য বিদায়ী উপাচার্য

  • 3:24 pm - April 07, 2026
  • পঠিত হয়েছে:২৩৭ বার
অনিয়মের রেকর্ড স্থাপন করেছেন চবির সদ্য বিদায়ী উপাচার্য। ছবিঃ সমকাল

মেলবোর্ন, ৭ এপ্রিল- চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) সদ্য বিদায়ী উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্‌ইয়া আখতার ৫৪৭ দিনের দায়িত্বকালে ৪২৫ জন শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এক রেকর্ড স্থাপন করেছেন। এই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচটি সিন্ডিকেট বৈঠকে নিয়োগ প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হয়, যেখানে প্রতিটি বৈঠকে গড়ে ৮৫ জনের নিয়োগ অনুমোদিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ৬০ বছরে দায়িত্ব পালন করা অন্য ২০ উপাচার্যের কেউই এত অল্প সময়ে এত বড় সংখ্যা নিয়োগ দিতে পারেননি।

উপাচার্য ড. ইয়াহ্‌ইয়া আখতারের এই নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরুতে স্বচ্ছ ও আধুনিক বলে প্রশংসিত হলেও শেষ দিকে বিতর্কিত হয়ে ওঠে। জাতীয় নির্বাচনের আগে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার লক্ষ্যেই তিনি শুক্রবারও সিন্ডিকেট বৈঠক ডেকেছেন। একুশে ফেব্রুয়ারির জাতীয় বন্ধের দিনেও তিনি বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন এবং নিয়োগ চূড়ান্ত করেছিলেন।

তবে এই নিয়োগ নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগও উঠেছে। বলা হচ্ছে, তিনি নিজের পছন্দের ব্যক্তিদের নিয়োগ বোর্ডে রেখেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য একজন হলেন এক উপ-উপাচার্যের মেয়ে, আরেকজন উপ-উপাচার্যের গবেষণা সহযোগী, রেজিস্ট্রারের ভাই, এক প্রভোস্টের স্ত্রী এবং আরেক প্রভোস্টের ছেলে। এছাড়া বাংলা বিভাগের প্ল্যানিং কমিটির সুপারিশ উপেক্ষা করে একসঙ্গে সাতজন শিক্ষক নেওয়ার জন্য বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। নৃবিজ্ঞান ও ক্রিমিনোলজি বিভাগের জন্যও এমন নিয়োগ হয়েছে যেখানে প্রকৃত প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কলা অনুষদে পছন্দের শিক্ষার্থী নিয়োগ দিতে ফলাফলের গ্রেড কমিয়ে নীতিমালায় পরিবর্তন আনা হয়েছে।

অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) একাধিকবার নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত রাখার চিঠি দিয়েছে। এছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) নিয়োগ সংক্রান্ত অনিয়ম খতিয়ে দেখতে অভিযান চালিয়েছে।

দুদকের চট্টগ্রাম-১ এর সহকারী পরিচালক সায়েদ আলম বলেন, ‘আমরা কমিশন বরাবর রিপোর্ট জমা দিয়েছি।’

উপাচার্য প্রথমবারের মতো চবিতে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার পাশাপাশি উপস্থাপনার দক্ষতাকেও যোগ্যতার মানদণ্ড হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। প্রতিটি ধাপ এক দিনের মধ্যে সম্পন্ন করা হতো। শুরুটা চমকপ্রদ হলেও শেষের দিকে বিতর্কের কারণে প্রক্রিয়াটি বিতর্কিত হয়ে ওঠে।

বিএনপি সরকারের গঠনের পর গত ১৬ মার্চ চবির নতুন উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল-ফোরকান দায়িত্ব নেন।

নিয়োগের অনিয়ম নিয়ে তিনি বলেন, ‘বিগত উপাচার্যের আমলে অনেক নিয়োগ হয়েছে। বাস্তব প্রয়োজন কতটুকু ছিল তা খতিয়ে দেখা হবে। কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতির প্রমাণ পেলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

বিদায়ী উপাচার্য ড. ইয়াহ্‌ইয়া আখতার দাবি করেছেন, ‘সব নিয়োগ দিয়েছি যোগ্যতার ভিত্তিতে। কোনো দলীয়করণ বা স্বজনপ্রীতি করা হয়নি। নতুন দুটি হল চালু হওয়ায় কর্মকর্তা-কর্মচারীর নিয়োগ বেশি দিতে হয়েছে।’

নিয়োগের পরিসংখ্যান
৪২৫ জনের মধ্যে শিক্ষক ১২২ জন, যা মোট নিয়োগের ২৯ শতাংশ। এর মধ্যে নতুন শিক্ষক ৮১ জন এবং চবির স্কুল অ্যান্ড কলেজে ১০ জন। বাকি ৩১ জনকে অস্থায়ী থেকে স্থায়ী শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কর্মকর্তা নিয়োগ ২২ জন (৫ শতাংশ), যাদের সবাইকে স্থায়ীভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগ ২৮১ জন (৬৬ শতাংশ)।

চবি জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মোহাম্মদ জাহেদুর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘১৮ মাসে ৪২৫ জনকে নিয়োগ দেওয়া স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হতে পারে না। জামায়াত-শিবিরের লোক দিয়ে দল ভারী করতেই এই আয়োজন করা হয়েছে।’

স্বজনপ্রীতির অভিযোগ
চবি ল্যাবরেটরি স্কুলের নতুন অধ্যক্ষ মো. আবদুল কাইয়ুম রেজিস্ট্রারের ভাই। উপ-উপাচার্য অধ্যাপক শামীম উদ্দিন খানের মেয়ে মাহিরা শামীম ফিন্যান্স বিভাগে অস্থায়ী প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। এছাড়া আরবি বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ নেজাম উদ্দিনের জামাতা, শহীদ আব্দুর রব হলের প্রভোস্ট ও পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক একেএম আরিফুল হক সিদ্দিকীর স্ত্রী এবং শামসুন নাহার হলের প্রভোস্ট ও ফাইন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক বেগম ইসমত আরা হকের ছেলে নিয়োগ পেয়েছেন।

মাহিরা শামীমের নিয়োগ বোর্ডে উপাচার্য ইয়াহ্‌ইয়া আখতার প্রধান ছিলেন। বোর্ডের অধিকাংশ সদস্য ছিলেন উপ-উপাচার্যের বিভাগীয় শিক্ষক। ফার্সি বিভাগের শিক্ষক নিয়োগে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রাখা হয়, স্থানীয় প্রার্থীদের বাদ দিয়ে। ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের প্রভাষক আহমদ ইমরানুল আজিজ তালুকদারের জন্য ন্যূনতম গ্রেড ৩.৪০ করা হয়।

ক্রিমিনোলজি বিভাগের প্ল্যানিং কমিটি জানিয়েছিল নৃবিজ্ঞান বিষয়ে শিক্ষক প্রয়োজন নেই। তবু পছন্দের ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়া হয়। নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক সাইদুর রহমান বলেন, ‘উপ-উপাচার্য উপস্থিত ছিলেন, তবে কোনো বিশেষ সুবিধা পাইনি।’

গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তির নিয়োগ:
ল্যাবরেটরি স্কুলের অধ্যক্ষ মো. আব্দুল কাইয়ুম ২০১৭ সালে সৌদি আরবের জেদ্দায় বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে প্রায় ১৬ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে গ্রেপ্তার হন। তিনি দাবি করেন, ‘আমি নির্দোষ, পুলিশ আমাকে গ্রেপ্তার করেনি।’

এই নিয়োগ প্রক্রিয়া চবির ইতিহাসে বিতর্কিত হয়ে গেছে। স্বজনপ্রীতি, অনিয়ম এবং অভিযোগের ছায়ায় নতুন প্রশাসন খতিয়ে দেখছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ নীতি ও স্বচ্ছতার গুরুত্ব নতুনভাবে সামনে এসেছে।

সূত্রঃ সমকাল

এই শাখার আরও খবর

কিম জং উনের স্বাস্থ্য নিয়ে গুঞ্জন, কী জানা যাচ্ছে?

উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের শারীরিক অবস্থা নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জল্পনা ছড়িয়েছে। সম্প্রতি তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে কোমায় আছেন বলে কিছু…

ফ্রান্সজুড়ে চলছে দাঙ্গা-লুটপাট, প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে কারফিউ জারি

ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভ থেকে ছড়িয়ে পড়া দাঙ্গা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনায় রাজধানী প্যারিসের কয়েকটি এলাকা এবং দেশটির বিভিন্ন শহরে রাতের কারফিউ জারি করেছে কর্তৃপক্ষ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে…

নাটোরে বাস-ট্রাক সংঘর্ষে নিহত বেড়ে ১৪, আহত ৩২

নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার বনপাড়ায় বাস ও ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৪ জনে দাঁড়িয়েছে। এ দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ৩২ জন। আহতদের স্থানীয় বিভিন্ন…

পূজা দেখে ফেরার পথে ট্রলারডুবি, মেয়ে নিহত মা নিখোঁজ

ওটিএন বাংলা ডেস্ক :  পিরোজপুরে দুর্গাপূজা দেখে বাড়ি ফেরার পথে অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই ট্রলারডুবিতে প্রাণ গেছে আট বছরের শিশু অর্পিতা বেপারীর। এ ঘটনায় তার মা রিনা…

রেমিট্যান্স নেবে সরকার, প্রবাসীদের মরদেহের দায় কেন নেবে না?

সৌদি আরবে দুই চ নাগরিক নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সিথি আখতারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা, প্রবাসীদের আইনি সুরক্ষা এবং সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে…

ছেলেকে নায়ক বানাতে বাড়ি-গাড়ি বন্ধক রেখেছিলেন হৃতিকের বাবা

হৃতিক রোশন এখন বলিউডের অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেতা। তার বর্তমান সম্পদের পরিমাণ প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। তবে তার পরিবারের এই অবস্থানে আসার পথটি সহজ…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au