প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ফের লড়ার ইঙ্গিত কমলা হ্যারিসের। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১১ এপ্রিল- যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে প্রকাশ্যে ইঙ্গিত দিয়েছেন। নিউইয়র্কে রেভারেন্ড আল শার্পটনের প্রতিষ্ঠিত ন্যাশনাল অ্যাকশন নেটওয়ার্কের এক সম্মেলনে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে আবারও প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার বিষয়টি তিনি গুরুত্ব সহকারে ভাবছেন।
শুক্রবার আয়োজিত ওই সম্মেলনে উপস্থিত জনতার উদ্দেশে কমলা হ্যারিস বলেন, তিনি বিষয়টি নিয়ে সক্রিয়ভাবে চিন্তা করছেন এবং সময়মতো সিদ্ধান্ত জানাবেন। তিনি বলেন, “আমি হয়তো করব, বিষয়টি নিয়ে ভাবছি। আপনাদের জানাব।”
এর আগে ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে পরাজিত হন। সেই নির্বাচনে ট্রাম্প ইলেকটোরাল ভোটে ৩১২ বনাম ২২৬ ব্যবধানে জয় পান এবং জনপ্রিয় ভোটেও প্রায় ২৩ লাখ ভোটে এগিয়ে ছিলেন।
নিজের অভিজ্ঞতার প্রসঙ্গ তুলে হ্যারিস বলেন, তিনি চার বছর যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং প্রেসিডেন্ট হওয়ার দায়িত্ব কতটা গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল, সে বিষয়ে তাঁর সুস্পষ্ট ধারণা রয়েছে। তিনি বলেন, “আমি জানি এই দায়িত্ব কী এবং এটি পালনে কী প্রয়োজন।”
গত এক বছরে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চল, বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলে ভ্রমণ করেছেন বলে জানান। এসব সফরের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে অনেক মানুষের জন্য বিদ্যমান পরিস্থিতি কার্যকর নয়। তার মতে, বর্তমান অবস্থার পরিবর্তন প্রয়োজন এবং সেই বিবেচনায়ই তিনি ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করছেন।
প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিয়ে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে হ্যারিস বলেন, এটি ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের বিষয় নয়, বরং আমেরিকান জনগণের জন্য কী সবচেয়ে ভালো, সেটাই মূল বিবেচ্য হওয়া উচিত। তিনি বলেন, “আমি ভাবছি—কীভাবে, কোথায় এবং কার মাধ্যমে জনগণের জন্য সবচেয়ে ভালো কাজটি করা সম্ভব।”
সম্মেলনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতিরও সমালোচনা করেন। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক জোটগুলোর দুর্বল হয়ে পড়ার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই প্রথম এমন একজন প্রেসিডেন্ট দেখা যাচ্ছে, যিনি মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের গুরুত্বে বিশ্বাস করেন না। তার মতে, এর ফলে বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান দুর্বল হচ্ছে।
ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সামরিক পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন হ্যারিস। তিনি এটিকে “পছন্দনির্ভর যুদ্ধ” হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেন, এই ধরনের অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রকে দুর্বল, অবিশ্বস্ত এবং কম প্রভাবশালী করে তুলছে।
এছাড়া তিনি যুক্তরাষ্ট্রে ভোটাধিকার সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা নিয়েও সতর্ক করেন। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সুপ্রিম কোর্টকে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোয় গড়ে তোলা হয়েছে এবং শিগগিরই ভোটাধিকার আইনের গুরুত্বপূর্ণ একটি ধারা নিয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে। এই ধারাটি সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ন্যায্য প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
হ্যারিস আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, যদি এই ধারা বাতিল হয়, তাহলে বর্ণবাদপ্রভাবিত আইনগুলোর বিরুদ্ধে আইনি লড়াই করার একটি বড় সুযোগ হারিয়ে যাবে। তিনি এটিকে গণতন্ত্রের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন।
তিনি ভোটারদের সচেতন থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা না করে আগেভাগেই নিজেদের ভোটার তালিকায় নাম আছে কি না, ভোটকেন্দ্র কোথায়—এসব বিষয় যাচাই করা উচিত। কারণ, অনেক ক্ষেত্রে ভোটকেন্দ্র পরিবর্তন বা তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার মতো ঘটনা ঘটছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
দায়িত্ব ছাড়ার পর দেওয়া বিভিন্ন সাক্ষাৎকারেও কমলা হ্যারিস ভবিষ্যতে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করেননি। আল শার্পটন সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর মধ্যে হ্যারিস এখনো একটি শক্তিশালী প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব, যদিও তাকে অনেক ক্ষেত্রে উপেক্ষা করা হয়েছে।
আগামী সপ্তাহে সাউথ ক্যারোলাইনা অঙ্গরাজ্যের ডেমোক্র্যাটিক পার্টির একটি তহবিল সংগ্রহ অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে কমলা হ্যারিসের।
এদিকে একই সম্মেলনে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির আরও কয়েকজন সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট প্রার্থীও বক্তব্য দিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে মেরিল্যান্ডের গভর্নর ওয়েস মুর, ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের গভর্নর জেবি প্রিটজকার, পেনসিলভানিয়ার গভর্নর জশ শ্যাপিরো, ক্যালিফোর্নিয়ার প্রতিনিধি রো খান্না, অ্যারিজোনার সিনেটর রুবেন গালেগো, প্রতিনিধি পরিষদের সংখ্যালঘু নেতা হাকিম জেফ্রিজ এবং ম্যাসাচুসেটসের প্রতিনিধি আয়ান্না প্রেসলি উল্লেখযোগ্য।
শুক্রবার সকালে কমলা হ্যারিসের পর বক্তব্য দেন সাবেক পরিবহনমন্ত্রী পিট বাটিগিয়েগ। তিনিও ২০২৮ সালের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ইঙ্গিত দেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “আপনি আসন ধরে রাখুন, আমি সেখানে থাকব।”
বাটিগিয়েগও ট্রাম্প প্রশাসনের সমালোচনা করে বলেন, এই প্রশাসন এমন সব উদ্যোগ নিচ্ছে, যা সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য সহায়ক হতে পারে—সেগুলোকে ধ্বংস করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। একই সঙ্গে তিনি ডেমোক্র্যাটিক পার্টির নেতৃত্বে আরও শক্তিশালী ভূমিকার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন।
সম্মেলনের পরবর্তী অধিবেশনগুলোতে আরও কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সম্মেলনকে ঘিরে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ভেতরে আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা ও অবস্থান স্পষ্ট হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান