অস্ট্রেলিয়ায় সুপার ফান্ড নীতিতে পরিবর্তন, ‘নৈতিকভাবে ভুল’ বলছে বিশেষজ্ঞরা। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১১ এপ্রিল- অস্ট্রেলিয়ার আর্থিক খাতে নতুন প্রস্তাবিত একটি নীতিগত পরিবর্তন ঘিরে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। দেশটির ক্ষমতাসীন লেবার পার্টি পরিচালিত সুপার ফান্ড বা এসএমএসএফ ব্যবস্থায় একটি ‘অপ্ট-ইন’ পদ্ধতি চালুর প্রস্তাব দিয়েছে, যা নিয়ে সংশ্লিষ্ট খাতের অংশীজনদের মধ্যে অসন্তোষ ও ক্ষোভ বাড়ছে। অনেকেই এই প্রস্তাবকে ‘নৈতিকভাবে ভুল’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
অস্ট্রেলিয়ার অর্থ মন্ত্রণালয় সম্প্রতি একটি পরামর্শপত্র প্রকাশ করে জানিয়েছে, নতুন এই ব্যবস্থায় স্ব-পরিচালিত সুপার ফান্ডগুলো চাইলে নির্দিষ্ট একটি লেভি বা ফি প্রদান করে কম্পেনসেশন স্কিম অব লাস্ট রিসোর্ট-এর আওতায় আসতে পারবে। এই স্কিমটি মূলত আর্থিক প্রতারণা বা অনিয়মের শিকার গ্রাহকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য গঠিত, যেখানে যোগ্য ভুক্তভোগীরা সর্বোচ্চ প্রায় দেড় লাখ ডলার পর্যন্ত সহায়তা পেতে পারেন।
তবে প্রস্তাবিত এই ‘অপ্ট-ইন’ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, কোনো এসএমএসএফ ট্রাস্টি যদি এই স্কিমে অন্তর্ভুক্ত হতে লেভি দিতে রাজি না হন, তাহলে ভবিষ্যতে তিনি এই ক্ষতিপূরণ সুবিধা দাবি করার অধিকার হারাবেন। এই শর্তই মূলত বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছে।
এসএমএসএফ অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান নির্বাহী পিটার বার্জেস এই প্রস্তাবের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, আর্থিক খাতের অন্য কোনো অংশকে এভাবে বাধ্যতামূলক লেভি দেওয়ার শর্তে ফেলা হয় না। তার মতে, “যদি কোনো ট্রাস্টি লেভি দিতে রাজি না হন, তাহলে তাকে ভবিষ্যতে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা নৈতিকভাবে সঠিক নয়।”
তিনি আরও আশঙ্কা প্রকাশ করেন, এই প্রস্তাব কার্যকর হলে অধিকাংশ এসএমএসএফ মালিকই স্কিমে যোগ দিতে আগ্রহী হবেন না। ফলে খুব অল্পসংখ্যক অংশগ্রহণকারী নিয়ে স্কিমটি পরিচালিত হবে এবং তাদের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ পড়বে। এতে করে ক্ষতিপূরণের জন্য আরোপিত লেভির পরিমাণ অনেক বেড়ে যেতে পারে, যা সংশ্লিষ্টদের জন্য অসামঞ্জস্যপূর্ণ বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।
বর্তমানে এই ক্ষতিপূরণ স্কিমটি চারটি উপখাতের আওতায় পরিচালিত হয়—আর্থিক পরামর্শদাতা, ঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান (যেমন ব্যাংক বা ক্রেডিট কার্ড কোম্পানি), ঋণ মধ্যস্থতাকারী (যেমন মর্টগেজ ব্রোকার) এবং সিকিউরিটিজ ডিলার (যেমন বিনিয়োগ ব্যাংক)। প্রতিটি খাতে বার্ষিক লেভির একটি নির্দিষ্ট সীমা থাকলেও প্রয়োজনে আর্থিক সেবা বিষয়ক মন্ত্রী বিশেষ লেভি আরোপ করতে পারেন।
অস্ট্রেলিয়ার আর্থিক সেবা বিষয়ক মন্ত্রী ড্যানিয়েল মুলিনো এই প্রস্তাবের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে বলেন, গত বছর ক্ষতিপূরণ স্কিম পরিচালনার জন্য বিশেষভাবে ৪৭ মিলিয়ন ডলারের লেভি আরোপ করতে হয়েছিল, যা মূলত কয়েকটি আর্থিক পরামর্শ সংস্থার পতনের কারণে সৃষ্টি হওয়া ক্ষতির জন্য প্রয়োজন হয়। তার মতে, শুধুমাত্র একটি খাতের ওপর এই ব্যয় চাপিয়ে দিলে তা অত্যধিক বোঝা হয়ে দাঁড়াত, তাই বিভিন্ন খাতের মধ্যে ব্যয় ভাগ করে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।
এই প্রস্তাব এমন সময় সামনে এলো, যখন অস্ট্রেলিয়ার আর্থিক খাত সাম্প্রতিক কয়েকটি বড় ধসের প্রতিকূলতা সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে। বিশেষ করে ফার্স্ট গার্ডিয়ান এবং শিল্ড নামের দুটি বিনিয়োগ ফান্ড ধসে পড়ায় বিনিয়োগকারীরা এক বিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থ হারিয়েছেন। এই দুটি ফান্ড উচ্চ মুনাফার প্রতিশ্রুতি দিলেও শেষ পর্যন্ত হাজারো বিনিয়োগকারীকে চরম অনিশ্চয়তায় ফেলে দেয়।
ফার্স্ট গার্ডিয়ানের ক্ষেত্রে প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের বিপরীতে মাত্র ১.৬ মিলিয়ন ডলার পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে বলে জানা গেছে, যা ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। একইভাবে, অস্ট্রেলিয়ান ফিডিউসিয়ারিজ লিমিটেড-এর পতনের পর শত শত বিনিয়োগকারী ক্ষতিপূরণ পাওয়ার জন্য আইনি সহায়তা নিচ্ছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রস্তাবিত পরিবর্তন একদিকে ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থাকে টেকসই করার চেষ্টা হলেও অন্যদিকে এটি এসএমএসএফ খাতের জন্য নতুন ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। ফলে এই নীতি বাস্তবায়ন হলে আর্থিক খাতে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কী হবে, তা নিয়ে এখনই নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
সূত্রঃ স্কাই নিউজ