ইরানের পতাকাবাহী কার্গো জাহাজ আটক করেছে যুক্তরাষ্ট্র: ট্রাম্প
মেলবোর্ন, ২০ এপ্রিল-মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক পদক্ষেপকে ঘিরে। ইরানের পতাকাবাহী একটি কার্গো জাহাজ আটক করার দাবি করেছে ওয়াশিংটন, আর তেহরান…
মেলবোর্ন, ২০ এপ্রিল- ২০২৪ সালে বাংলাদেশের জুলাই–আগস্ট আন্দোলনে ব্যবহৃত ৭.৬২ ক্যালিবারের প্রাণঘাতী গুলির উৎস এবং সেগুলোর সরবরাহ ঘিরে একাধিক গুরুতর অভিযোগ উঠে এসেছে। সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ সূত্র ও কিছু গোপন নথির বরাতে নর্থইস্ট নিউজ দাবি করেছে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর আর্টিলারি বিভাগে কর্মরত কিছু কর্মকর্তার সঙ্গে ওই সময় ব্যবহৃত ৭.৬২ ক্যালিবারের প্রাণঘাতী গুলি সরবরাহের সম্ভাব্য সংযোগ থাকতে পারে।
নর্থইস্ট নিউজের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এসব গোপন নথির ব্যাপারে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, একই সময়ে বিভিন্ন গোয়েন্দা নথি ও সামরিক রেকর্ড বিশ্লেষণে সাবেক ও বরখাস্ত হওয়া কিছু সেনা কর্মকর্তার বিদেশি বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর সঙ্গে দীর্ঘদিনের যোগাযোগের অভিযোগও উঠে এসেছে। বিশেষ করে বরখাস্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসিনুর রহমান-কে ঘিরে সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
২০২৫ সালের ২৩ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের একটি আদালত কক্ষে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার উল্লেখও নথিতে পাওয়া যায়। সেখানে তৎকালীন প্রধান প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম প্রতিরক্ষা আইনজীবী নাজনীন নাহারকে অশালীন ভাষায় অপমান ও হুমকি দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। আদালতে উপস্থিত সিনিয়র আইনজীবীরা নীরব থাকলেও বিচারকদের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি বলে দাবি করা হয়।
ওই সময় আদালত কক্ষ ত্যাগ করার সময় বরখাস্ত সেনা কর্মকর্তা হাসিনুর রহমান নাজনীন নাহারকে হুমকি দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে আরেক আইনজীবীকে উদ্দেশ্য করে কটূক্তি করার অভিযোগও উঠে আসে। ঘটনাটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ না হওয়ার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে নথিতে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। ছবিঃ সংগৃহীত
বিদেশি বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ
গোপন নথি অনুযায়ী, হাসিনুর রহমানের বিরুদ্ধে ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অব আসাম এবং এনএসসিএন (আই-এম), পাশাপাশি বাংলাদেশের হরকাতুল জিহাদ ও হিযবুত তাহরীরের সঙ্গে যোগাযোগ ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে।
সামরিক আদালতের নথিতে উল্লেখ রয়েছে, ব্রিগেডিয়ার কামরুল ইসলামের নেতৃত্বে একটি কোর্ট মার্শালে তাকে বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের দায়ে দণ্ড দেওয়া হয় এবং চাকরিচ্যুত করা হয়।
২০০৯ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)-এর তৎকালীন অতিরিক্ত মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিয়াউল হাসানের নেতৃত্বে ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালিত হয় বলে নথিতে উল্লেখ আছে। ওই সময় হরকাতুল জিহাদের একটি সশস্ত্র গ্রুপও নিষ্ক্রিয় করা হয়।
র্যাবের তদন্তে হাসিনুর রহমানের বিরুদ্ধে বিদেশি বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর সঙ্গে গভীর সম্পর্কের প্রমাণ পাওয়া যায় বলেও দাবি করা হয়।
২০১২ সালের ১৫ মার্চ সামরিক আদালতের রায়ে হাসিনুর রহমানকে চাকরিচ্যুত করে চার বছর তিন মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তার সহযোগী আফজালুল হক ও মঈনুল করিমকেও আলাদা আদেশে চাকরিচ্যুত করা হয়।
তবে ২০১৪ সালের ২১ এপ্রিল তৎকালীন সেনাপ্রধান (অব.) ইকবাল করিম ভূঁইয়ার উদ্যোগে তার আগাম মুক্তির বিষয়টি নথিতে উল্লেখ রয়েছে, যা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
২০২৩-২৪ সালের রাজনৈতিক ও সামরিক যোগাযোগের অভিযোগ
নথিতে আরও দাবি করা হয়েছে, ২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে সাবেক সেনা কর্মকর্তারা একটি সমন্বিত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরিকল্পনায় যুক্ত ছিলেন। জুলাই–আগস্ট ২০২৪ সময়ে তাদের কয়েকজনের আর্টিলারি ও গোয়েন্দা বিভাগের কিছু কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ ছিল বলেও অভিযোগ করা হয়।
নথি ও বিভিন্ন সূত্রের দাবি অনুযায়ী, ঢাকায় ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্ট আন্দোলনের সময় নিহতদের বড় অংশের ওপর ৭.৬২ মিলিমিটার স্নাইপার রাইফেল ব্যবহার করা হয়েছিল। এসব অস্ত্র সাধারণত সেনাবাহিনীর নির্দিষ্ট ইউনিটে ব্যবহৃত হয়।
অভিযোগ রয়েছে, আন্দোলনের সময় কিছু বিদেশি ভাড়াটে সদস্য ও বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর উপস্থিতিও ছিল। তবে এসব দাবির স্বতন্ত্র ও আনুষ্ঠানিকভাবে যাচাই করা তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি।

বাংলাদেশের জুলাই আন্দোলন। ছবিঃ ওটিএন বাংলা
গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন হিসেবে উঠে এসেছে, বরখাস্ত ও অবসরপ্রাপ্ত কিছু কর্মকর্তার হাতে কীভাবে প্রাণঘাতী অস্ত্র পৌঁছাল এবং এসব অস্ত্র আন্দোলনের সময় কীভাবে ব্যবহৃত হলো।
এছাড়া ইউএলএফএ, ন্যাগা বিচ্ছিন্নতাবাদী এবং রোহিঙ্গা সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর উপস্থিতির অভিযোগ থাকলেও এ বিষয়ে এখনো কার্যকর কোনো প্রকাশ্য ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
নথিতে আরও দাবি করা হয়েছে, কিছু বরখাস্ত কর্মকর্তা বিদেশি প্রশিক্ষণ ও কার্যক্রম থেকে অর্থ উপার্জন করে তা শেয়ারবাজার ও ক্রিপ্টোকারেন্সিতে বিনিয়োগ করেছেন।
এছাড়া কিছু বিদেশি নাগরিক ও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বাংলাদেশে উপস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে, তবে এসব বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
৭.৬২ ক্যালিবারের গুলি কতটা ভয়াবহ
৭.৬২ ক্যালিবারের গুলি সাধারণত সামরিক ব্যবহারের জন্য তৈরি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন গোলাবারুদ। এটি মূলত যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত রাইফেল, স্নাইপার রাইফেল এবং কিছু মেশিনগানে ব্যবহার করা হয়।
এই ধরনের গুলির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর উচ্চ গতি, শক্তিশালী আঘাতক্ষমতা এবং দীর্ঘ দূরত্বে কার্যকারিতা। সাধারণত এটি ছোট বা হালকা অস্ত্রের গুলির তুলনায় অনেক বেশি ধ্বংসাত্মক।
৭.৬২ ক্যালিবারের গুলি যখন কোনো লক্ষ্যবস্তুকে আঘাত করে, তখন শুধু প্রবেশস্থানেই ক্ষতি সীমাবদ্ধ থাকে না। এর শক্তিশালী গতিশক্তির কারণে শরীরের ভেতরে ব্যাপক টিস্যু ক্ষতি, রক্তনালির ছিন্ন হওয়া এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ধ্বংস হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে এটি একাধিক অঙ্গকে একসঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত করে, যা প্রাণঘাতী ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

৭.৬২ ক্যালিবারের গুলি। ছবিঃ সংগৃহীত
বিশেষ করে স্নাইপার রাইফেলে ব্যবহৃত ৭.৬২ ক্যালিবার গুলি দীর্ঘ দূরত্ব থেকেও নির্ভুলভাবে লক্ষ্যভেদ করতে সক্ষম। এই কারণে এটি সামরিক বাহিনীর বিশেষ ইউনিটে ব্যবহৃত হয়, যেখানে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করার প্রয়োজন পড়ে।
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের গুলির আঘাতে আহত ব্যক্তিকে দ্রুত চিকিৎসা না দেওয়া হলে বাঁচার সম্ভাবনা খুবই কম থাকে। কারণ এটি শরীরের ভেতরে “হাই-এনার্জি ট্রমা” সৃষ্টি করে, যা সাধারণ অস্ত্রের ক্ষতির চেয়ে অনেক বেশি জটিল।
সাধারণ নাগরিক ব্যবহারের অস্ত্রের তুলনায় ৭.৬২ ক্যালিবার গুলি তাই অনেক বেশি প্রাণঘাতী হিসেবে বিবেচিত হয়। এটি মূলত যুদ্ধ পরিস্থিতি ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যে ব্যবহারের জন্য নয়।
*উপস্থাপিত অভিযোগ ও নথিগুলো অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং এর অনেক অংশই তদন্তাধীন বা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত নয়। তবে এগুলো সামরিক শৃঙ্খলা, গোয়েন্দা কার্যক্রম এবং রাজনৈতিক আন্দোলনের সময় অস্ত্র ব্যবহারের উৎস নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি করেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ছাড়া এসব দাবির সত্যতা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
সূত্রঃ নর্থইস্ট নিউজ
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au