সুয়েজ খাল অতিক্রম করছে ফ্রান্সের রণতরি শার্ল দ্য গল। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৭ মে- হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পিত নৌ-অভিযান ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ বড় ধরনের কূটনৈতিক বাধার মুখে পড়েছে। সৌদি আরব ও কুয়েত তাদের আকাশসীমা এবং সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি না দেওয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত অভিযানের কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছেন বলে জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসি নিউজ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল সৌদি আরবের রিয়াদের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটি ব্যবহার করতে এবং একই সঙ্গে সৌদি আকাশসীমা দিয়ে সামরিক বিমান চলাচলের অনুমতি নিতে। কিন্তু রিয়াদ সে প্রস্তাবে সম্মতি দেয়নি।
মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে এনবিসি নিউজ জানিয়েছে, গত রোববার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আকস্মিকভাবে ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ ঘোষণা করলে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় কয়েকটি দেশ অপ্রস্তুত অবস্থায় পড়ে যায়। বিষয়টি নিয়ে ট্রাম্প সরাসরি সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গেও টেলিফোনে কথা বলেন। তবে সেই আলোচনায় কোনো সমঝোতা হয়নি।
সৌদি সরকারের এক কর্মকর্তা এনবিসি নিউজকে বলেন, “সমস্যা হলো সবকিছু খুব দ্রুত ঘটছে।” যদিও একই সঙ্গে তিনি জানান, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা কমাতে পাকিস্তানের মধ্যস্থতামূলক কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে সৌদি আরব ইতিবাচকভাবে দেখছে এবং সমর্থন দিচ্ছে।
অন্যদিকে হোয়াইট হাউস দাবি করেছে, এ অভিযানের বিষয়ে আঞ্চলিক মিত্রদের আগেই অবহিত করা হয়েছিল। তবে মধ্যপ্রাচ্যের এক কূটনীতিকের ভাষ্য ভিন্ন। তিনি জানান, ট্রাম্পের প্রকাশ্য ঘোষণার আগে যুক্তরাষ্ট্র কার্যত ওমান ছাড়া অন্য কোনো দেশকে বিস্তারিতভাবে সম্পৃক্ত করেনি।
ওই কূটনীতিক বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র আগে ঘোষণা দিয়েছে, পরে আমাদের সঙ্গে সমন্বয় করেছে। যদিও এতে আমরা ক্ষুব্ধ নই, কিন্তু পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল অত্যন্ত দ্রুত।”
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ট্রাম্পের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া আকস্মিক ঘোষণায় সৌদি নেতৃত্ব বিরক্ত ও হতাশ হয়। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই রিয়াদ ওয়াশিংটনকে স্পষ্ট জানিয়ে দেয় যে, তারা এই সামরিক পরিকল্পনায় সহযোগিতা করবে না।
মার্কিন প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন, শুধু সৌদি আরব নয়, কুয়েতও তাদের দেশে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং আকাশসীমা এই অভিযানে ব্যবহারের অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, উপসাগরীয় দেশগুলোর এই অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সামরিক উত্তেজনা এড়ানোর কৌশল হতে পারে। বিশেষ করে ইরানকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি নিতে চায় না সৌদি আরব ও কুয়েত।
এদিকে ট্রাম্প প্রশাসন ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ স্থগিত করার একদিন পরই ইরান নিজেদের প্রস্তুতির বার্তা দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ইরানের বন্দর ও সামুদ্রিক সংস্থা ঘোষণা করেছে, হরমুজ প্রণালি ও আশপাশের এলাকায় চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজকে প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা দিতে তারা সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।
ইরান জানিয়েছে, তাদের জলসীমার কাছাকাছি অবস্থান করা জাহাজগুলো প্রয়োজনে জ্বালানি, খাদ্য ও চিকিৎসা সহায়তাও নিতে পারবে।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালি দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল ও গ্যাস এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে সেখানে যেকোনো সামরিক বা কূটনৈতিক উত্তেজনা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই ও গালফ নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক মিত্রদের মধ্যেও এখন সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে আগের মতো ঐকমত্য নেই। বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে সম্ভাব্য সংঘাতের ক্ষেত্রে উপসাগরীয় দেশগুলো আরও সতর্ক অবস্থান নিতে শুরু করেছে।
সূত্র: মিডল ইস্ট আই ও গালফ নিউজ