কাতারে সড়ক দুর্ঘটনায় ৫ বাংলাদেশিসহ নিহত ৬
মেলবোর্ন, ২২ জুন- মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতারে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় পাঁচ বাংলাদেশিসহ ছয়জন নিহত হয়েছেন। রোববার সকালে দেশটির আল শাহানিয়া এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতদের মধ্যে…
মেলবোর্ন, ২২ জুন- দীর্ঘদিনের উত্তেজনা ও সংঘাতের পর মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শুরু হওয়া উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় বড় ধরনের অচলাবস্থা দেখা দিয়েছে। সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত বৈঠকের মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কড়া হুঁশিয়ারিকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ইরানি গণমাধ্যমগুলোর দাবি, ট্রাম্পের বক্তব্যের প্রতিবাদে ইরানের প্রতিনিধিদল বৈঠক ছেড়ে বেরিয়ে যায়। ফলে বহু প্রত্যাশিত আলোচনার মূল পর্ব শুরু হওয়ার আগেই তা অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে।
রোববার পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় সুইজারল্যান্ডের বারগেনস্টকে একটি পাহাড়ি রিসোর্টে মুখোমুখি হয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদল। সম্প্রতি দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের বিভিন্ন শর্ত কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে এবং ভবিষ্যৎ শান্তি প্রক্রিয়ার রূপরেখা নির্ধারণ করতেই এই বৈঠকের আয়োজন করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভান্স। অপরদিকে ইরানের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে ছিলেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। বৈঠকের শুরুতে পাকিস্তান ও কাতারের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে প্রায় ৮০ মিনিট ধরে প্রাথমিক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর উভয় পক্ষের মধ্যে সরাসরি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হওয়ার কথা ছিল।
তবে বৈঠকের প্রথম পর্ব শেষ হওয়ার আগেই পরিস্থিতি নাটকীয় মোড় নেয়।
আলোচনার শুরুতে পরিবেশ ছিল আশাব্যঞ্জক। জেডি ভান্স ইরানের জনগণের প্রতি বন্ধুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের একটি নতুন অধ্যায় শুরু করতে চায়। তিনি জানান, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেও দুই দেশের মধ্যে নতুন ধরনের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পক্ষে। ভান্সের ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের মৌলিক পরিবর্তন চায় এবং আলোচনার মাধ্যমে দীর্ঘদিনের সংকট নিরসনের পথ খুঁজতে আগ্রহী।
তিনি আরও বলেন, লেবাননসহ পুরো অঞ্চলে যুদ্ধবিরতি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র বদ্ধপরিকর। তার মতে, গত কয়েক মাসে লেবাননের সংঘাত প্রশমনে অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্র বেশি কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়েছে।
কিন্তু শান্তি ও সমঝোতার এই বার্তার কিছুক্ষণের মধ্যেই ওয়াশিংটন থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন সুরে বক্তব্য আসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছ থেকে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প অভিযোগ করেন, লেবাননে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলো অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, এসব কর্মকাণ্ড অবিলম্বে বন্ধ না হলে যুক্তরাষ্ট্র আবারও ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা নিতে পারে। যদিও তিনি সরাসরি হিজবুল্লাহর নাম উল্লেখ করেননি, তবে তার বক্তব্য যে লেবাননে সক্রিয় ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ গোষ্ঠীকে কেন্দ্র করেই ছিল, তা স্পষ্ট বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এর কিছুক্ষণ পর একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প আরও কঠোর অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ইরান যদি সমঝোতায় না আসে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালীর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে। তার ভাষায়, প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্র ওই জলপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সেখানে চলাচলকারী জাহাজ থেকে টোল আদায় করতে পারে।
শুধু তাই নয়, সুইজারল্যান্ডে অবস্থানরত ইরানি প্রতিনিধিদের প্রতিও তিনি সরাসরি সতর্কবার্তা দেন। ট্রাম্প বলেন, ইরান যদি হরমুজ প্রণালী বন্ধ রাখার নীতি অব্যাহত রাখে, তাহলে দেশটির অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়তে পারে এবং বিদেশে অবস্থানরত নেতারাও দেশে ফিরতে পারবেন না।
ট্রাম্পের এই বক্তব্য প্রকাশের পরপরই ইরানি প্রতিনিধিদলের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। ইরানি গণমাধ্যমগুলোর বরাতে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স জানায়, মার্কিন প্রেসিডেন্টের বক্তব্যকে অপমানজনক ও উসকানিমূলক হিসেবে বিবেচনা করে ইরানের প্রতিনিধিরা বৈঠক ত্যাগ করেন। এর ফলে নির্ধারিত মূল বৈঠক আর শুরু করা সম্ভব হয়নি।
যদিও ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনায় স্থায়ীভাবে ইতি টানার ঘোষণা দেয়নি, তবে তারা আলোচনায় ফিরবে কি না, সে বিষয়েও স্পষ্ট কোনো অবস্থান জানায়নি।
এ ঘটনায় দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানান ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মুহাম্মদ বাঘেই গালিবাফ। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের হুমকিকে ইরান ভয় পায় না এবং প্রয়োজন হলে তেহরানও যথাযথ জবাব দিতে প্রস্তুত।
তিনি বলেন, যদি আমেরিকার হুমকির এত শক্তি থাকত, তাহলে আজ তাদের এমন অবস্থায় পৌঁছাতে হতো না। ইরানকে ভয় দেখিয়ে কোনো লাভ হবে না। একই সঙ্গে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে আরও দায়িত্বশীল ভাষা ব্যবহারের আহ্বান জানান।
কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, এই বৈঠকে মূলত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা ছিল। এর মধ্যে ছিল ইরানের তেল রপ্তানির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা আংশিক শিথিল করা, বিদেশে আটকে থাকা ইরানি অর্থ ছাড় করার বিষয় এবং সাম্প্রতিক সমঝোতা স্মারকের বাস্তবায়ন অগ্রগতি পর্যালোচনা।
তবে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে উল্লেখযোগ্য কোনো আলোচনা হয়নি। বরং লেবাননের চলমান সংঘাত এবং সেখানে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে।
ইরানের অবস্থান স্পষ্ট। তারা বলছে, লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক অভিযান বন্ধ না হলে পরবর্তী পর্যায়ের কোনো আলোচনা এগোনো সম্ভব নয়। তাদের মতে, সমঝোতা স্মারকের অন্যতম প্রধান শর্তই ছিল অঞ্চলজুড়ে সংঘাত বন্ধ করা।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র মনে করছে, লেবাননে সংঘাত অব্যাহত রাখার পেছনে হিজবুল্লাহ এবং তার পৃষ্ঠপোষক ইরানের ভূমিকা রয়েছে। ফলে ওয়াশিংটন এখন লেবানন ইস্যুকেই তেহরানের ওপর চাপ প্রয়োগের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।
পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে লেবাননের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ। রোববারই ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ ঘোষণা করেন, লেবাননে যেকোনো নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলায় ইসরায়েলি বাহিনীর ওপর কোনো সীমাবদ্ধতা নেই। তিনি জানান, সেনাবাহিনী এখনো লেবাননে সক্রিয় রয়েছে এবং প্রয়োজন হলে আরও অভিযান চালাবে।
এর জবাবে হিজবুল্লাহ প্রধান নঈম কাসেম বলেন, লেবাননের ভূখণ্ডে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর উপস্থিতি মেনে নেওয়া হবে না। প্রয়োজন হলে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে এবং উপযুক্ত জবাব দেওয়া হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে বর্তমানে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে লেবানন সংকট। দুই পক্ষই নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকায় সমঝোতার সম্ভাবনা ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে।
একদিকে জেডি ভান্স শান্তি, সহযোগিতা ও নতুন সম্পর্কের বার্তা দিয়েছেন, অন্যদিকে ট্রাম্পের কঠোর হুঁশিয়ারি সেই ইতিবাচক পরিবেশকে মুহূর্তের মধ্যে নষ্ট করে দিয়েছে। ফলে সুইজারল্যান্ডে শুরু হওয়া এই আলোচনা এখন কার্যত অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেছে।
আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলের ধারণা, ইরানি প্রতিনিধিদল আলোচনায় ফিরে না এলে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক সমঝোতা স্মারকের ভবিষ্যৎও প্রশ্নের মুখে পড়বে। আর যদি দুই পক্ষ আবার আলোচনার টেবিলে ফিরতে ব্যর্থ হয়, তাহলে অঞ্চলে সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সূত্রঃ আনন্দবাজার
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au