মেলবোর্ন,৩০ জুন- বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর কথিত নির্যাতন এবং কারাবন্দী চিন্ময় কৃষ্ণ প্রভুকে প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়ে দেওয়া বক্তব্যের জেরে আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘের (ইসকন) কলকাতা শাখার সহ-সভাপতি ও মুখপাত্র রাধারমণ দাসকে তার সব সাংগঠনিক দায়িত্ব থেকে সাময়িকভাবে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত তাকে সংগঠনের পক্ষে গণমাধ্যম, সরকারি সংস্থা কিংবা কোনো জনসমক্ষে প্রতিনিধিত্ব করতে নিষেধ করা হয়েছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ইউএনআইয়ের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, রোববার (২৮ জুন) ইসকন কর্তৃপক্ষ এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করে। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিমবঙ্গের সরকারি স্কুলে ডিমের পরিবর্তে সয়াবিন, রাজমা ও অন্যান্য নিরামিষ খাবারভিত্তিক ‘সাত্ত্বিক’ মিড-ডে মিল চালুর পক্ষে সংগঠনের অন্যতম মুখপাত্র হিসেবে সক্রিয় ছিলেন রাধারমণ দাস, তবে তার বিরুদ্ধে নেওয়া এই সাংগঠনিক ব্যবস্থার পেছনে আরও কয়েকটি কারণ রয়েছে বলে জানিয়েছে ইসকনের অভ্যন্তরীণ সূত্র।
সংগঠনটির সূত্র বলছে, বাংলাদেশে হিন্দুদের পরিস্থিতি এবং কারাবন্দী চিন্ময় কৃষ্ণ প্রভুকে নিয়ে রাধারমণ দাসের অনুমোদনহীন প্রকাশ্য মন্তব্যই মূলত এই সিদ্ধান্তের প্রধান কারণ। ইসকন মনে করছে, এসব বক্তব্য সংগঠনের আনুষ্ঠানিক অবস্থান হিসেবে ব্যাখ্যা হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছিল, যা অপ্রয়োজনীয় বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
রাধারমণ দাস নিজেও একটি বিবৃতিতে জানিয়েছেন, তার বিরুদ্ধে নেওয়া সিদ্ধান্তের পেছনে ছয়টি নির্দিষ্ট কারণ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশে হিন্দুদের পরিস্থিতি নিয়ে মন্তব্য, চিন্ময় কৃষ্ণ প্রভুর প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন, গত ২৯ মে রিপাবলিক টিভিতে দেওয়া সাক্ষাৎকার, ভারতের সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী মানেকা গান্ধীকে আইনি নোটিশ পাঠানো, কৌতুকশিল্পী সুরলীন কৌর-এর বিরুদ্ধে সাইবার অভিযোগ দায়ের এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ১৯৭৬ সালের নিউইয়র্ক রথযাত্রায় যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঐতিহাসিক সম্পৃক্ততা নিয়ে একটি পোস্ট শেয়ার করা।
তবে ইসকনের একাধিক সূত্রের দাবি, এসবের মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে বাংলাদেশ-সংক্রান্ত মন্তব্য। বিশেষ করে চিন্ময় কৃষ্ণ প্রভুকে কেন্দ্র করে তার প্রকাশ্য অবস্থান সংগঠনের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে অস্বস্তির সৃষ্টি করে।
এদিকে পশ্চিমবঙ্গের স্কুলগুলোতে নিরামিষ মিড-ডে মিল চালুর পাইলট প্রকল্প নিয়েও আলোচনায় ছিলেন রাধারমণ দাস। রাজ্য সরকারের উদ্যোগে ইসকনের প্রস্তুত করা নিরামিষ খাবার সরবরাহের পরিকল্পনায় ডিম বাদ দেওয়াকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয়।
রাধারমণ দাস দাবি করেছিলেন, সয়াবিন, রাজমা, পনির ও ছোলার মতো খাদ্য উপাদান শিশুদের প্রয়োজনীয় প্রোটিনের চাহিদা পূরণে যথেষ্ট। তিনি আরও বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইসকন দীর্ঘদিন ধরে নিরামিষ বাঙালি খাবার পরিবেশন করে আসছে এবং একটি পূর্ণাঙ্গ খাবারের জন্য ডিম বা মাংস অপরিহার্য নয়।
তার ভাষায়, “আমাদের মেনুতে থাকবে ভাত, ডাল, খিচুড়ি ও সবজি। শুধু ডিম বা মাংস না থাকলেই পুষ্টির ঘাটতি হবে, এমন ধারণা সঠিক নয়। সয়াবিন ও রাজমার মতো খাদ্যে প্রচুর প্রোটিন রয়েছে।”
তবে ইসকনের অভ্যন্তরীণ সূত্র জানিয়েছে, ডিম ও সয়াবিনের পুষ্টিগুণ নিয়ে জনসমক্ষে রাধারমণ দাসের বিস্তারিত মন্তব্য এবং সংগঠনের খাদ্যনীতি নিয়ে অনুমোদন ছাড়াই ব্যাখ্যা দেওয়াও শীর্ষ নেতৃত্ব ভালোভাবে নেয়নি। তাদের মতে, সাত্ত্বিক খাবার নিয়ে এ ধরনের জনসম্মুখে বিশদ ব্যাখ্যা দেওয়ার কোনো অনুমতি তাকে দেওয়া হয়নি।
সাংগঠনিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পাওয়ার পর রাধারমণ দাস এক বিবৃতিতে জানান, তিনি ইসকন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তকে সম্মান করেন এবং ভবিষ্যতেও সংগঠনের নির্দেশনা মেনে চলবেন।
তিনি বলেন, “গত কয়েক বছরে ভক্ত ও শুভানুধ্যায়ীদের কাছ থেকে যে ভালোবাসা, সহযোগিতা ও সমর্থন পেয়েছি, তার জন্য আমি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ। ইসকনের ধারাবাহিক অগ্রগতি, সমৃদ্ধি ও সাফল্যের জন্য আমি সবসময় প্রার্থনা করে যাব।”