মেলবোর্ন, ২০ জুলাই: ভারতের ইংরেজি দৈনিক The Statesman ‘Are Hindus Marginalized in Bangladesh?’ (বাংলাদেশে কি হিন্দুরা প্রান্তিক হয়ে পড়েছে?) শিরোনামে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধে বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং সাম্প্রতিক রামমূর্তি নির্মাণ স্থগিতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর দেশের হিন্দু সংখ্যালঘুদের মধ্যে তাদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার আশাবাদ তৈরি হয়েছিল। তবে গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে ৮১ ফুট উচ্চতার রামমূর্তি নির্মাণকাজ স্থগিত হওয়ার ঘটনায় সেই আশায় ভাটা পড়েছে বলে নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে।
গাইবান্ধার পলাশবাড়ীর শ্রীশ্রী রাধাগোবিন্দ ও কালী মন্দির প্রাঙ্গণে নির্মাণাধীন এই রামমূর্তিটি সম্পন্ন হলে এটি এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ রামমূর্তি হতে পারত বলে আয়োজকদের দাবি। কিন্তু স্থানীয় উত্তেজনা ও ইসলামি সংগঠনগুলোর ধারাবাহিক প্রতিবাদের মুখে গত ১৮ জুন মন্দির কর্তৃপক্ষ নির্মাণকাজ সাময়িকভাবে স্থগিত করার ঘোষণা দেয়।
মন্দির কমিটির ভাষ্য অনুযায়ী, সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখা এবং সব ধর্মাবলম্বীর শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করার স্বার্থেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে The Statesman-এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, প্রশাসনিক চাপ এবং কট্টরপন্থী ইসলামি গোষ্ঠীগুলোর বিরোধিতাও এই সিদ্ধান্তের পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, স্থানীয় ইমাম-উলামা পরিষদ নির্মাণকাজ বন্ধের দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে। সংগঠনটি শুধু নির্মাণ বন্ধ নয়, পুরো স্থাপনাটি অপসারণের দাবিও জানায় এবং প্রকল্পের অর্থায়নের উৎস তদন্তের আহ্বান জানায়। এ সময় এলাকায় সম্ভাব্য সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা এড়াতে প্রশাসন অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করে।

গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার শ্রী শ্রী রাধা গোবিন্দ ও কালী মন্দির। ছবিঃ https://commons.wikimedia.org/wiki/User:BadhonCR, CC BY
বাংলাদেশ খ্রিস্টান অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নির্মল রোজারিও সংবাদমাধ্যমকে বলেন, এ ধরনের চাপ ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপের শামিল। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় বহুত্ববাদের আদর্শ নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং সংবিধানে প্রত্যেক নাগরিকের ধর্ম পালনের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। তাঁর মতে, আজ যদি হিন্দুদের ধর্মীয় প্রতীক নির্মাণে বাধা দেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যতে একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারেন বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানরাও।
বর্তমানে রামমূর্তি নির্মাণকাজ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। মন্দির কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, স্থানীয় বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা শেষে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। অন্যদিকে, হিন্দু সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে সতর্ক করে বলা হয়েছে, প্রকল্পটি পুনরায় চালু করতে না দিলে দেশের ৬৪টি জেলায় রামমন্দির নির্মাণ আন্দোলন শুরু করা হতে পারে।

পলাশবাড়ীতে মন্দির প্রাঙ্গণে নির্মিত রামমূর্তি। ছবিঃ X
The Statesman-এর নিবন্ধে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশে হিন্দুরা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮ শতাংশ। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এখনও ভূমি বিরোধ, বৈষম্য এবং বিচ্ছিন্ন সাম্প্রদায়িক সহিংসতার অভিযোগ করে আসছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবে ধর্মীয় মেরুকরণও বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এছাড়া Human Rights Congress for Bangladesh Minorities (HRCBM)-এর প্রকাশিত একটি পরিসংখ্যানভিত্তিক প্রতিবেদনের উল্লেখ করে নিবন্ধে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সংখ্যালঘু হিন্দুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত সহিংসতা, নির্যাতন এবং বিচারহীনতার ঘটনাগুলোর বিস্তারিত তথ্য সেখানে তুলে ধরা হয়েছে।
বিশ্লেষণের উপসংহারে The Statesman মন্তব্য করেছে, রামমূর্তি নির্মাণের উদ্যোগ ছিল সংবিধানে নিশ্চিত ধর্মীয় স্বাধীনতারই একটি অনুশীলন। সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় অধিকার সীমিত করা হলে তা শুধু হিন্দু নয়, খ্রিস্টান ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মধ্যেও উদ্বেগ সৃষ্টি করবে এবং দেশের সামাজিক সম্প্রীতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

পলাশবাড়ীর রামমূর্তি প্রকল্প স্থগিত হওয়ার পর ধর্মীয় সহাবস্থান, সংখ্যালঘু অধিকার ও সামাজিক সম্প্রীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে The Statesman। ছবিঃ সংগৃহীত
বিশ্লেষণের উপসংহারে The Statesman মন্তব্য করেছে, রামমূর্তি নির্মাণের উদ্যোগ ছিল সংবিধানে নিশ্চিত ধর্মীয় স্বাধীনতারই একটি অনুশীলন। সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় অধিকার সীমিত করা হলে তা শুধু হিন্দু নয়, খ্রিস্টান ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মধ্যেও উদ্বেগ সৃষ্টি করবে এবং দেশের সামাজিক সম্প্রীতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
সূত্র: The Statesman