বিশ্ব

মুসলিম ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে কেন দ্বন্দ্বে জড়িয়েছেন বুরকিনা ফাসোর তরুণ নেতা ইব্রাহিম ত্রাওরে

  • 8:22 pm - July 24, 2026
  • পঠিত হয়েছে:১৮৫ বার
ইব্রাহিম ত্রাওরেফাইল ছবি: রয়টার্স

মেলবোর্ন, ২৪ জুলাই: আফ্রিকার দেশ বুরকিনা ফাসোর অন্তর্বর্তী নেতা ক্যাপ্টেন ইব্রাহিম ত্রাওরে একসময় দেশটির প্রভাবশালী মুসলিম ধর্মীয় নেতাদের সমর্থন পেয়েছিলেন। তবে এখন সেই সম্পর্ক দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে। ধর্মীয় স্বাধীনতাবিষয়ক নতুন আইন, কয়েকজন প্রভাবশালী ইমামকে আটক এবং ধর্মীয় উগ্রবাদের নামে চালানো অভিযানকে কেন্দ্র করে সরকারের সঙ্গে মুসলিম সম্প্রদায়ের একটি অংশের বিরোধ তীব্র হয়েছে।

সম্প্রতি ত্রাওরে ঘোষণা দিয়েছেন, বুরকিনা ফাসোয় ‘মৌলবাদী ইসলামের’ কোনো স্থান নেই। যাঁরা ধর্মীয় উগ্রবাদ উসকে দিচ্ছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে বলেও সতর্ক করেন তিনি। এর মধ্য দিয়ে প্রভাবশালী মুসলিম ধর্মীয় পণ্ডিতদের সঙ্গে তাঁর বিরোধ আরও প্রকাশ্যে এল।

যেসব ধর্মীয় পণ্ডিতের বিরুদ্ধে ত্রাওরে ধর্মীয় উগ্রবাদ ছড়ানোর অভিযোগ তুলেছেন, তাঁদের উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, ‘যদি এটাই আপনাদের ইসলাম হয়, তবে আমরা এর বিরুদ্ধে লড়ব। উগ্রবাদীদের অবশ্যই বদলাতে হবে। না বদলালে লড়াই শুরু হয়ে গেছে।ইব্রাহিম ত্রাওরের এসব মন্তব্য সরকারের সঙ্গে বুরকিনা ফাসোর মুসলিম সম্প্রদায়ের একটি অংশের ক্রমবর্ধমান বিরোধের প্রতিই স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে।

বুরকিনা ফাসোর প্রভাবশালী সুন্নি ধর্মীয় নেতারা একসময় ত্রাওরের সমর্থক গোষ্ঠীর একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস ছিল। তবে এসব নেতাদের অনেকে এখন সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের বিরোধিতা করছেন।বুরকিনা ফাসোর প্রভাবশালী সুন্নি ধর্মীয় নেতারা একসময় ত্রাওরের সমর্থক গোষ্ঠীর একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস ছিল। তবে এসব নেতার অনেকে এখন সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের বিরোধিতা করছেন।

ত্রাওরের মতে, সহিংসতা কিংবা জোরজবরদস্তি নয়, বরং ধর্মের প্রচার হওয়া উচিত ব্যক্তিগত আচরণ ও উদাহরণের মাধ্যমে। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, কিছু কিছু মুসলিম নেতা কেন নতুন আইনের বিরোধিতা করছেন।ত্রাওরে সতর্ক করেন, যেসব ইমাম খুতবায় উগ্রবাদী চিন্তাধারা প্রচার করেন, তাঁদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে।

অন্যদিকে শান্তিপূর্ণ ইসলামের ব্যাখ্যা দেওয়া আলেমদের রাষ্ট্রীয় সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ত্রাওরে। একই সঙ্গে তাঁর অভিযোগ, বিদেশি শক্তি ধর্মকে ব্যবহার করে বুরকিনা ফাসোয় অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করছে।

বিদেশে পড়তে যাওয়া শিক্ষার্থীরা

ত্রাওরে ঘোষণা দিয়েছেন, আরব দেশগুলোয় ইসলামি আইন নিয়ে পড়াশোনা করা বুরকিনা ফাসোর শিক্ষার্থীদের দেশে ফিরিয়ে আনা হবে। তাঁর দাবি, আট লাখের বেশি শিক্ষার্থী বিদেশে ধর্মীয় শিক্ষা নিচ্ছেন, কিন্তু ব্যবহারিক পেশাগত দক্ষতা অর্জন করছেন না।

ত্রাওরে সতর্ক করেছেন, যাঁরা দেশে ফিরতে অস্বীকৃতি জানাবেন, তাঁদের নাগরিকত্ব বাতিল করা হতে পারে।গত ২০ জুন অন্তর্বর্তী পার্লামেন্টে সর্বসম্মতিক্রমে ধর্মীয় স্বাধীনতাবিষয়ক আইন পাস করা হয়। এর পর থেকেই ধর্মীয় কার্যক্রম ও বিদেশে ধর্মীয় শিক্ষা নিয়ে সরকারের নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর হচ্ছে।এর আগে জুনের শেষ দিকে দেশটির সরকার নির্দেশ দেয়, বিদেশে পড়তে যেতে হলে উচ্চশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আগাম অনুমোদন নিতে হবে। সরকারের ভাষ্য, দেশের উন্নয়ন–অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিদেশে শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতেই এ সিদ্ধান্ত।

গত ২০ জুন অন্তর্বর্তী পার্লামেন্টে সর্বসম্মতিক্রমে ধর্মীয় স্বাধীনতাবিষয়ক আইন পাস করা হয়। এর পর থেকেই ধর্মীয় কার্যক্রম ও বিদেশে ধর্মীয় শিক্ষা নিয়ে সরকারের নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করা হচ্ছে।সরকারের দাবি, রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র আরও শক্তিশালী করাই এ আইনের উদ্দেশ্য। আইনে ধর্মের নামে শিশুদের দিয়ে ভিক্ষাবৃত্তি করানো বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বচ্ছতার নিয়ম লঙ্ঘনের মতো কর্মকাণ্ডকে অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করে জরিমানা ও কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

কিন্তু মুসলিম সম্প্রদায়ের একটি অংশের অভিযোগ, এই আইন ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের ওপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি করবে।সমর্থক থেকে বিরোধীগত মে মাসের শেষ দিকে দেশের অন্যতম প্রভাবশালী সুন্নি আলেম ইমাম মোহাম্মদ ইসহাক কিন্দো নতুন আইনের সমালোচনা করলে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।এ নিয়ে প্রতিবাদ শুরু হলে ত্রাওরে সেটিকে ‘উগ্রপন্থী একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর তৎপরতা’ বলে উড়িয়ে দেন।

কিন্দোর মুক্তির দাবিতে বিক্ষোভের পর রাজধানী উয়াগাদুগুর সবচেয়ে বড় সুন্নি মসজিদ সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয় সরকার। পরে প্রায় ১০০ সমর্থককে একটি সামরিক শিবিরে নিয়ে ‘নাগরিক প্রশিক্ষণ’ দেওয়া হয় বলে নিরাপত্তা সূত্রের বরাতে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি।

ত্রাওরে ধর্মীয় উগ্রবাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিয়েছেন। নতুন আইনও কার্যকর হয়েছে। তবে আটক ধর্মীয় নেতাদের ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত। এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, সরকারের এই কঠোর অবস্থান রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করবে, নাকি দেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী সামাজিক শক্তিগুলোর একটির সঙ্গে সংঘাত আরও বাড়িয়ে তুলবে।

এর আগে এপ্রিলের মাঝামাঝি বোবো-দিউলাসো শহরে আরেক প্রভাবশালী আলেম মাহমুদ বারোকেও আটক করা হয়েছিল। শান্তি ও নিরাপত্তাবিষয়ক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান টিমবুকটু ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, কিন্দোকে আটকের পর থেকে তাঁর অবস্থান এখনো প্রকাশ করা হয়নি।

প্রতিষ্ঠানটির মতে, বিরোধ শুধু নতুন আইনকে ঘিরেই নয়, বরং ত্রাওরে সরকার ও প্রভাবশালী মুসলিম আলেমদের মধ্যে এত দিন যে অলিখিত সমঝোতা ছিল, সেটিই ভেঙে পড়ছে। ক্ষমতা দখলের পর এই আলেমদের সমর্থন ত্রাওরের রাজনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করেছিল।

ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক

অভ্যন্তরীণ এ উত্তেজনার মধ্যেই সম্প্রতি বুরকিনা ফাসোয় নিযুক্ত নতুন ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত সিমন সেরুসি ত্রাওরের কাছে পরিচয়পত্র পেশ করেছেন।আফ্রিকা ইন্টেলিজেন্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে জমা দেওয়া রাষ্ট্রদূতকে স্বীকৃতির আবেদন দীর্ঘদিন ঝুলে থাকার পর সম্প্রতি তা নীরবে অনুমোদন দেওয়া হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধবাজ ও উগ্রবাদী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সরকারের ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূতকে প্রকাশ্যে স্বাগত জানানো ত্রাওরের অবস্থানে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। একই সময়ে ইসরায়েলের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো বুরকিনা ফাসো, মালি ও নাইজার নিয়ে গঠিত অ্যালায়েন্স অব সাহেল স্টেটস (এইএস) জোটের দেশগুলোর সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।

ত্রাওরে ধর্মীয় উগ্রবাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিয়েছেন। নতুন আইনও কার্যকর হয়েছে। তবে আটক ধর্মীয় নেতাদের ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত। এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, সরকারের এই কঠোর অবস্থান রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করবে, নাকি দেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী সামাজিক শক্তিগুলোর একটির সঙ্গে সংঘাত আরও বাড়িয়ে তুলবে।

এই শাখার আরও খবর

ক্ষতসহ দীর্ঘ সময় জীবিত ছিলেন সাগর-রুনি, ১৪ বছরেও শনাক্ত হয়নি দুই অজ্ঞাত ব্যক্তির ডিএনএ

সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যাকাণ্ডের ১৪ বছর পরও অপরাধী শনাক্ত ও হত্যার রহস্য উদ্‌ঘাটন করতে পারেনি তদন্তকারী সংস্থা। ঘটনাস্থলে পাওয়া দুই অজ্ঞাতনামা…

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিরক্ষা প্রতিনিধির সঙ্গে বাংলাদেশি সামরিক কর্মকর্তার বৈঠক, যা জানা যাচ্ছে

বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের (এএফডি) সামরিক গোয়েন্দা পরিদপ্তরের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার হাসান মাহমুদের সঙ্গে দুই দিনে পৃথক বৈঠক করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসের এক প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা এবং চীনের…

ঢামেকে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স ধর্মঘট, মরদেহ ও রোগী নিতে চরম ভোগান্তি

ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে পার্কিংয়ের দাবিতে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিকদের ধর্মঘট চলছে। এতে হাসপাতাল থেকে গুরুতর অসুস্থ রোগীকে অন্য হাসপাতালে স্থানান্তর এবং মৃত ব্যক্তির মরদেহ…

ময়মনসিংহে এবার আরেক হিন্দু যুবক রবেন্দ্র ঋষিকে ছুরিকাঘাতে হত্যা

ময়মনসিংহের ভালুকায় সেলুনে ঢুকে রবেন্দ্র ঋষি নামে এক নরসুন্দরকে ছুরিকাঘাতে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সন্ধ্যায় উপজেলার জামিরদিয়া এলাকার মুক্তিযোদ্ধা মার্কেট এলাকায় এ ঘটনা…

ভারতীয় গোয়েন্দার সঙ্গে বৈঠক কেন অস্বীকার করছে জামায়াত

ভারতের উচ্চপর্যায়ের এক গোয়েন্দা কর্মকর্তার সঙ্গে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের গোপন বৈঠকের অভিযোগ ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক…

চট্টগ্রামে অস্ত্রের মুখে নারীকে জিম্মি করে ২৫ লাখ টাকা ছিনতাই

চট্টগ্রামের রাউজানে দিনদুপুরে অস্ত্রের মুখে এক নারীকে জিম্মি করে জমি কেনার জন্য নিয়ে যাওয়া ২৫ লাখ টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সকাল…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au