ভারতের ককরোচদের আন্দোলনের প্রশংসায় পাকিস্তানিরা।ছবি: সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২৭ জুলাই: ভারতের মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষা (নিট) প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে গড়ে ওঠা জেন-জি শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুধু দেশটির রাজনীতিতেই প্রভাব ফেলেনি, বরং প্রতিবেশী দেশগুলোর তরুণদের মধ্যেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও নেপালের তরুণরা ভারতের আন্দোলনকারীদের সাহস, ঐক্য এবং সংগঠিত প্রতিবাদের প্রশংসা করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আন্দোলনের নানা ভিডিও, ছবি ও মিম ভাইরাল হওয়ার পর সীমান্ত পেরিয়ে তরুণদের মধ্যে সংহতির বার্তা ছড়িয়ে পড়েছে।
নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া দীর্ঘ আন্দোলনের মুখে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার একাধিক পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়। শেষ পর্যন্ত শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করলে আন্দোলনকারীরা এটিকে বড় অর্জন হিসেবে দেখেন। এই আন্দোলনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ব্যাপক ব্যবহার। প্রচলিত রাজনৈতিক প্রচারণার পরিবর্তে ইনস্টাগ্রাম রিল, মিম, স্বল্পদৈর্ঘ্য ভিডিও এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক প্রচারণার মাধ্যমে আন্দোলন সংগঠিত হয়। একই সঙ্গে এসব প্ল্যাটফর্ম আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পদক্ষেপ নথিবদ্ধ করার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ভারতের নতুন প্রজন্মকে এতদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসক্ত এবং মনোযোগহীন হিসেবে দেখার যে ধারণা প্রচলিত ছিল, সাম্প্রতিক এই আন্দোলন সেই ধারণাকে পাল্টে দিয়েছে বলে মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক। টানা কয়েক সপ্তাহ ধরে সংগঠিত ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মাধ্যমে তরুণরা তাদের দাবি আদায়ে যে দৃঢ়তা দেখিয়েছেন, তা প্রতিবেশী দেশগুলোর তরুণদেরও অনুপ্রাণিত করেছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় এক পাকিস্তানি তরুণী বলেন, “তোমরা যদি এত ভালো কাজ করো, তাহলে তোমাদের ঘৃণা করব কীভাবে?” তার এই মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচিত হয়েছে। দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্ক উত্তেজনাপূর্ণ হলেও নতুন প্রজন্মের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সংহতির এই বার্তা অনেকের নজর কেড়েছে।
শ্রীলঙ্কা ও নেপাল থেকেও ভারতের আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানানো হয়েছে। ২০২২ সালের গণআন্দোলনের অভিজ্ঞতা স্মরণ করে অনেক শ্রীলঙ্কান তরুণ ভারতের শিক্ষার্থীদের সংগ্রামের সঙ্গে নিজেদের মিল খুঁজে পেয়েছেন। শ্রীলঙ্কার কার্টুনিস্ট অবান্থা আরটিগালা তার এক কার্টুনে দেখিয়েছেন, কীভাবে ভারতীয় সরকার আন্দোলনকারীদের মোকাবিলায় চাপে পড়েছে।
এদিকে আন্দোলনের অন্যতম প্রতীক হয়ে উঠেছেন মুম্বাইয়ের তরুণী রিও আহির। পুলিশের প্রিজন ভ্যান থামিয়ে আন্দোলনকারীদের সহায়তা করার একটি স্থিরচিত্র আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। অনেকে সেই দৃশ্যের সঙ্গে ১৯৮৯ সালের চীনের তিয়েনআনমেন স্কয়ারের ঐতিহাসিক “ট্যাংক ম্যান”-এর ছবির তুলনা করেছেন।
নেপালের কনটেন্ট নির্মাতা অবিনাশ মিশ্র বলেন, ভারতের শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ ও প্রতিবাদ পুরোপুরি যৌক্তিক। তিনি আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে বলেন, “তোমাদের লড়াইয়ের লক্ষ্য যেন কখনো হারিয়ে না যায়।”
সবচেয়ে আলোচিত প্রতিক্রিয়াগুলোর একটি এসেছে পাকিস্তান থেকে। এক পাকিস্তানি তরুণ বলেন, সুযোগ পেলে তাদের দেশের তরুণদেরও একইভাবে সংগঠিত হওয়া উচিত। তিনি মন্তব্য করেন, আন্দোলনের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল ঐক্য। ধর্ম, জাতিগত পরিচয় বা রাজনৈতিক বিভাজন ভুলে ভারতীয় শিক্ষার্থীরা যেভাবে একসঙ্গে দাঁড়িয়েছেন, সেটি পাকিস্তানের জন্যও শিক্ষণীয়।
পাকিস্তানি কনটেন্ট নির্মাতা বিলাল হাসান বিদেশি অর্থায়নের অভিযোগকে ব্যঙ্গ করে বলেন, “অনেকে বলছে পাকিস্তান নাকি এই আন্দোলনে অর্থায়ন করেছে। আমাদের নিজেদের দেশ চালানোরই টাকা নেই, অন্যদের অর্থ দেব কীভাবে?”
তিনি আরও বলেন, ভারতে আন্দোলনকারীদের ওপর লাঠিচার্জ হলেও পাকিস্তানে অনেক সময় ভিন্নমতাবলম্বীদের নিখোঁজ হওয়ার মতো ঘটনাও ঘটে। তার ভাষায়, “আমাদের এখানে মানুষ এক প্লেট বিরিয়ানির জন্যও বিক্রি হয়ে যায়।”
বিলাল হাসান দুই দেশের তরুণদের সম্পর্ক নিয়ে বলেন, “দিন শেষে আমরা একে অপরকে বুঝি। কারণ আমরা একই দেশভাগের ইতিহাস থেকে উঠে এসেছি।”
বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের সাম্প্রতিক এই শিক্ষার্থী আন্দোলন শুধু একটি দাবি আদায়ের আন্দোলন নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার তরুণদের মধ্যে গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ, ঐক্য এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের নতুন আলোচনারও জন্ম দিয়েছে। প্রতিবেশী দেশগুলোর তরুণদের প্রতিক্রিয়া সেই প্রভাবকেই আরও স্পষ্টভাবে সামনে এনেছে।
সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে