মেলবোর্ন ৬ এপ্রিল—
ফিলিস্তিনের নিপীড়িত মানুষদের রক্ষায় ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ‘জিহাদ’ তথা ধর্মযুদ্ধে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে ফতোয়া (ধর্মীয় ফরমান) জারি করেছেন বেশ কিছু মুসলিম পণ্ডিত। তারা সমস্ত মুসলিম এবং মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ‘জিহাদ’ করার আহ্বান জানিয়েছেন।
শনিবার (০৫ এপ্রিল) এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য জানিয়েছে মধ্যপ্রাচ্য ভিত্তিক সংবাদ মাধ্যম মিডলইস্ট আই।
অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় বসবাসকারী ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ১৭ মাস ধরে চলা ভয়াবহ যুদ্ধ চলার পর বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট মুসলিম পণ্ডিতের এই ফতোয়া জারিকে বিরল ধর্মীয় ফরমান হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, আন্তর্জাতিক মুসলিম পণ্ডিত ইউনিয়ন (আইইউএমএস) এর মহাসচিব আলী আল-কারাদাঘি শুক্রবার সমস্ত মুসলিম দেশকে তাদের ম্যান্ডেট অনুসারে এই গণহত্যা এবং ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ বন্ধে অবিলম্বে সামরিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিকভাবে হস্তক্ষেপ করার আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি গাজার জন্য যথেষ্ট সমর্থন না দেওয়ায় আরব ও মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর সমালোচনা করেন। এই ব্যর্থতাকে ধর্মীয় অপরাধ তথা গুনাহ (পাপ) হিসেবে আখ্যা দেন। বলেন, গাজা ধ্বংস হওয়ার সময় আরব ও ইসলামী সরকারগুলির সমর্থনের ব্যর্থতা ইসলামী আইন অনুসারে আমাদের নির্যাতিত ভাইদের বিরুদ্ধে বড় অপরাধ।
ফতোয়ায় আলী আল-কারাদাঘি আরও বলেন, গাজার মুসলমানদের নির্মূলের চেষ্টা করা কাফের শত্রু ইসরায়েলকে সমর্থন করা নিষিদ্ধ, তা সে যে ধরনের সমর্থনই করুক না কেন। ইসরায়েলিদের কাছে অস্ত্র বিক্রি করা নিষিদ্ধ। সুয়েজ খাল, বাব আল-মান্দাব, হরমুজ প্রণালী, অথবা অন্য কোনো স্থল, সমুদ্র বা আকাশপথের মতো বন্দর বা আন্তর্জাতিক জলপথ দিয়ে তাদের জন্য অস্ত্র পরিবহন সহজতর করা নিষিদ্ধ।
ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব মুসলিম স্কলারস যে ফতোয়া জারি করেছে, সেটিতে গাজার মুসলিমদের সমর্থনে দখলদার শত্রুর (ইসরায়েল) জন্য আকাশ, স্থল ও সমুদ্র অবরোধের দাবি করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
কারাদাঘির ফতোয়াকে সমর্থন জানিয়েছেন আরও ১৪ জন ইসলামিক ব্যক্তিত্ব। তারা যেসব মুসলিম দেশের সঙ্গে ইসরায়েলের ‘শান্তি চুক্তি’ আছে সেগুলো যেন পুনর্বিবেচনা বা পর্যালোচনা করার কথা বলেছেন।
২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ৫০ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এমনকি যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভঙ্গ করার পর থেকে, ইসরায়েল শত শত শিশুসহ ১২ শতাধিক ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে। এ অবস্থায় এমন ফতোয়া জারি করলেন আরব ইসলামিক পণ্ডিতরা।

প্রসঙ্গত, ‘ফতোয়া’ হলো একজন সম্মানিত ধর্মীয় পণ্ডিতের একটি ফরমান, যা সাধারণত কুরআন বা সুন্নাহ-নবি মুহাম্মদের বাণী এবং অনুশীলনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়। কোনো বিষয়ে স্কলাররা যদি সম্মিলিতভাবে ফতোয়া জারি করেন তাহলে সেটা অনুসরণ করা মুসলমানদের জন্য আবশ্যক হয়ে দাঁড়ায়।
শেখ আলী আল-কারাদাঘি একজন প্রভাবশালী কুর্দি সুন্নি ইসলামিক পণ্ডিত ও আরব অঞ্চলের সবচেয়ে সম্মানিত ধর্মীয় কর্তৃপক্ষদের একজন। তিনি শরিয়া ও ফিকাহের সঙ্গে ইসলামী অর্থনীতিরও বিশেষজ্ঞ। তিনি দোহার কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের শরিয়া ও ইসলামিক স্টাডিজ অনুষদের আইনশাস্ত্রের অধ্যাপক এবং তার কাতারি নাগরিকত্ব রয়েছে।
বিশ্বের ১.৭ বিলিয়ন সুন্নি মুসলমানদের মধ্যে তার নির্দেশনা উল্লেখযোগ্য গুরুত্ব বহন করে। তাই তার ফতোয়াকে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কারাদাঘি যেই ইউনিয়নের মহাসচিব তার চেয়ারম্যান ছিলেন প্রয়াত মিশরীয় ইসলামিক স্কলার ইউসুফ আল-কারাদাওয়ি। তিনি প্রখ্যাত ইসলামিক স্কলার ইবনে তাইমিয়া, ইবনে কাইয়্যিম, সাইয়্যেদ রশিদ রিদা, হাসান আল-বান্না, আবুল হাসান আলী হাসানী নদভী, আবুল আ’লা মওদুদী এবং নাঈম সিদ্দিকীর দ্বারা প্রভাবিত বলে মনে করা হয়।