ঢাকা আলিয়া মাদরাসায় ফের উত্তেজনা, ককটেল উদ্ধার
মেলবোর্ন, ৮ আগষ্ট- রাজধানীর পুরান ঢাকার বকশীবাজারে সরকারি আলিয়া মাদরাসায় ফের উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। সম্ভাব্য সংঘাতের আশঙ্কায় মাদরাসা ও আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করেছে পুলিশ।…
মেলবোর্ন, ৮ আগষ্ট: রাজনীতি শেখ হাসিনার জীবনের প্রায় প্রতিটি অধ্যায়কে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।
বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনা টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকাকালে ‘আয়রন লেডি’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন। দেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের উত্তরাধিকারী হিসেবে তাঁর জীবন ও রাজনৈতিক পথচলাও বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে।
বাংলাদেশে তাঁকে সর্বশেষ দেখা গিয়েছিল একটি সামরিক হেলিকপ্টারে দেশ ছেড়ে পালানোর সময়। তখন কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা সরকারবিরোধী গণবিক্ষোভের চূড়ান্ত পর্যায়ে হাজারো আন্দোলনকারী তাঁর সরকারি বাসভবনে প্রবেশ করেন।
সেই ঘটনার দুই বছর পর ৭৮ বছর বয়সী শেখ হাসিনার বিরল এক প্রকাশ্য উপস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে—তিনি এখনো তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সমাপ্তি মেনে নিতে প্রস্তুত নন।
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হওয়া সত্ত্বেও, ২০২৪ সালে দেশ ছাড়ার পর প্রথম প্রকাশ্য বক্তব্যে তিনি আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন।
নয়াদিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবের একটি ছোট ও জনাকীর্ণ কক্ষে বড় পর্দায় অডিও সংযোগের মাধ্যমে তাঁর বক্তব্য শোনানো হয়। উপস্থিত সাংবাদিকেরা মনোযোগ দিয়ে তাঁর কথা শোনার চেষ্টা করেন।
তবে বাংলাদেশের আদালতে যেসব অপরাধে তিনি দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন এবং মৃত্যুদণ্ড পেয়েছেন, সেসব অভিযোগ মোকাবিলা করার পরিবর্তে পুরো আয়োজনটি আওয়ামী লীগের একটি পরিকল্পিত রাজনৈতিক পুনরাবির্ভাবের মতো মনে হয়েছে।
নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নিয়ে আত্মসমালোচনা বা ব্যাখ্যা দেওয়ার পরিবর্তে শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ফিরে রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ পুনরুদ্ধারের কথাই তুলে ধরেছেন।
বর্তমান পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনার জন্য বাংলাদেশে ফেরার সম্ভাবনা খুব একটা আকর্ষণীয় নয়। মৃত্যুদণ্ড ছাড়াও তাঁর বিরুদ্ধে হত্যা, হত্যাচেষ্টা ও অপহরণের অভিযোগসহ একাধিক ফৌজদারি মামলা রয়েছে। বিএনপি সরকারও বারবার বলেছে, দেশে ফিরলেই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হবে।
তবে শেষ পর্যন্ত তিনি ঢাকাগামী কোনো উড়োজাহাজে উঠবেন কি না, সেটিই হয়তো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়।
দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়ে শেখ হাসিনা একদিকে নিজের রাজনৈতিক অনমনীয়তা তুলে ধরতে পারছেন, অন্যদিকে অনুগত নেতাকর্মীদের বোঝাতে চাইছেন যে তিনি তাঁদের পরিত্যাগ করেননি। একই সঙ্গে তিনি নিজেকে আবারও বাংলাদেশের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছেন।
তাঁর প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের জন্যও বড় ধরনের রাজনৈতিক সংকট তৈরি করতে পারে।
বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে বিচারের মুখোমুখি করার দাবি জানিয়ে আসছে। কিন্তু তাঁকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনলে কয়েক বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতার পর সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা শান্ত হতে শুরু করা পরিস্থিতি আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে।
ওপি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্তের মতে, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকলেও শেখ হাসিনার এই বক্তব্য দলটির হতাশ ও নিষ্ক্রিয় নেতাকর্মীদের মনোবল ফিরিয়ে আনতে পারে।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগে বর্তমানে নেতৃত্বের বড় ধরনের সংকট রয়েছে এবং দলটির অধিকাংশ জ্যেষ্ঠ নেতা দেশ ছেড়ে চলে গেছেন। তাঁর ধারণা, নেতাকর্মীদের আবারও সক্রিয় ও অনুপ্রাণিত করতেই শেখ হাসিনা এই ঘোষণা দিয়েছেন।
অধ্যাপক দত্ত মনে করেন, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে আওয়ামী লীগের সমর্থকদের ব্যাপক সমাবেশ ও রাজনৈতিক সংঘবদ্ধতা তৈরি হতে পারে—এমন আশঙ্কা বিএনপি সরকারের মধ্যে রয়েছে। এর ফলে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনার এখনো যে প্রভাব রয়েছে, সেটি বিএনপির অজানা নয়।
অনুষ্ঠানের আগে বাংলাদেশ সরকার দেশের গণমাধ্যমগুলোকে তাঁর বক্তব্য প্রচারের বিষয়ে সতর্ক করেছিল। একই সঙ্গে নয়াদিল্লিতে তাঁকে এমন একটি আয়োজনের সুযোগ দেওয়ায় ভারতের সমালোচনাও করা হয়।
অধ্যাপক দত্ত মনে করেন, শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের বিষয়টিও ভবিষ্যতে আলোচনাযোগ্য হয়ে উঠতে পারে। তাঁর মতে, সরকার হয়তো একপর্যায়ে বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করে নিজেদের একটি প্রতিহিংসামুক্ত ও পরিবর্তিত বাংলাদেশ হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইতে পারে।
তবে এটি সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং ক্ষমতাসীন সরকারের ভবিষ্যৎ কৌশলের ওপর নির্ভর করবে।
অনুষ্ঠানের আগের দিনগুলোতে বাংলাদেশ সরকার শেখ হাসিনাকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়ায় ভারতের তীব্র সমালোচনা করে। ঢাকা একে দুই দেশের ইতোমধ্যে উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্কের ক্ষেত্রে আরেকটি নেতিবাচক ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করে।
জবাবে নয়াদিল্লি জানিয়েছে, এটি ছিল একটি ব্যক্তিগত আয়োজন এবং এর ওপর ভারত সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না।
তবে বাস্তবতা হলো, শেখ হাসিনার মতো বিতর্কিত ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কোনো রাজনীতিক ভারত সরকারের অনুমোদন ছাড়া নয়াদিল্লিতে এত উচ্চপর্যায়ের প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন—এমনটি কল্পনা করা কঠিন।
অধ্যাপক দত্তের ভাষায়, ভারত সরকার যদি এই আয়োজন না চাইত, তাহলে সেটি অনুষ্ঠিত হতো না।
শেখ হাসিনাকে ভারতে আশ্রয় দেওয়ার সিদ্ধান্ত এখনো গভীরভাবে বিতর্কিত। ২০২৪ সালের আন্দোলনে নিহত আনুমানিক ১ হাজার ৪০০ মানুষের পরিবারের কাছে নয়াদিল্লিতে তাঁর অবস্থান ন্যায়বিচার না পাওয়ার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
তবে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে প্রত্যর্পণের পরিবর্তে ভারতে নির্বাসিত অবস্থায় রাখাই হয়তো উভয় সরকারের জন্য সুবিধাজনক।
বাংলাদেশের বিএনপি সরকার একদিকে ভারতকে একজন দণ্ডিত সাবেক নেতার রক্ষাকর্তা হিসেবে তুলে ধরতে পারছে, অন্যদিকে শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে যে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরি হতে পারে, সেটিও এড়িয়ে যাচ্ছে।
অপরদিকে ভারত এমন একজন রাজনীতিককে নিজের ভূখণ্ডে ধরে রেখেছে, যিনি কয়েক দশক ধরে ভারতের স্বার্থের প্রতি অনুগত ছিলেন এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক অভিজাত ও জনগণের একটি অংশের মধ্যে এখনো প্রভাব ও সমর্থন ধরে রাখতে পারেন।
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা বাস্তবে কার্যকর হবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত। কিন্তু তাঁর বক্তব্য প্রমাণ করে, নির্বাসনে থেকেও বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে তিনি পুরোপুরি বিদায় নেননি।
তাঁর প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নতুন করে সক্রিয় করতে পারে, বিএনপি সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়াতে পারে এবং বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
শেখ হাসিনা সত্যিই দেশে ফিরলে তাঁকে গ্রেপ্তার, বিচার ও সম্ভাব্য রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া মোকাবিলা করতে হবে। আর তিনি না ফিরলেও, দেশে ফেরার প্রতিশ্রুতি দিয়েই নিজেকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যেতে পারবেন।
তাই প্রশ্নটি শুধু শেখ হাসিনা দেশে ফিরবেন কি না—তা নয়। বরং তাঁর ফিরে আসার সম্ভাবনা বাংলাদেশের ভঙ্গুর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ এবং ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে কোন দিকে নিয়ে যাবে, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: এবিসি নিউজ; প্রকাশিত ৬ আগস্ট ২০২৬।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au