মেলবোর্ন, ৯ আগষ্ট: বাংলাদেশে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্ত করে পুলিশের অধীনে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) নামে একটি বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে প্রস্তাবিত আইনের খসড়া প্রকাশের পর প্রশ্ন উঠেছে, নতুন এই বাহিনী কি র্যাবের বিকল্প হিসেবেই কাজ করবে, নাকি এর কাঠামো ও কার্যক্রমে মৌলিক কোনো পরিবর্তন আনা হচ্ছে?
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত খসড়া বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রস্তাবিত এসআরবির দায়িত্ব ও ক্ষমতার সঙ্গে র্যাবের বর্তমান কার্যক্রমের বেশ কিছু মিল রয়েছে। তবে নতুন খসড়ায় তদন্তের ক্ষমতা, নাগরিকের অভিযোগ গ্রহণ এবং বাহিনীর সদস্যদের জবাবদিহিতার মতো কিছু বিষয় যুক্ত করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আইন অনুবিভাগের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বর্তমানে খসড়াটির ওপর বিভিন্ন পক্ষের মতামত নেওয়া হচ্ছে। মতামতের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সংশোধন শেষে এটি আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। সেখানে ভেটিং শেষে বিল আকারে জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হবে। সংসদে পাস হলে আইন অনুযায়ী র্যাব বিলুপ্ত করে এসআরবি গঠন করা হবে।
এসআরবি কীভাবে গঠিত হবে
প্রস্তাবিত আইনে এসআরবিকে বাংলাদেশ পুলিশের অধীনে একটি বিশেষায়িত ইউনিট হিসেবে গঠনের কথা বলা হয়েছে।
পুলিশ ও অন্যান্য শৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদায়ন বা প্রেষণে নিয়োগের মাধ্যমে ইউনিটটি গঠন করা হবে। নির্ধারিত শর্তে প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যদেরও প্রেষণে নিয়োগ বা অস্থায়ীভাবে সংযুক্ত করার সুযোগ রাখা হয়েছে।
অর্থাৎ, পুলিশের অধীনে ইউনিটটি গঠিত হলেও এতে অন্য বাহিনীর সদস্যদেরও কাজ করার সুযোগ থাকবে।

র্যাবের কয়েকজন সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র, প্রতীকী ছবি
কী কী দায়িত্ব থাকবে এসআরবির
খসড়া আইনে প্রস্তাবিত এসআরবিকে বেশ বিস্তৃত দায়িত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে:
- দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষা
- গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ
- অবৈধ অস্ত্র, গোলাবারুদ ও বিস্ফোরক উদ্ধার
- মাদকদ্রব্য উদ্ধার
- সাইবার অপরাধ দমন
- মানবপাচার ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমন
- নারী ও শিশু নির্যাতন এবং ধর্ষণ প্রতিরোধ
- অপহরণ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা
- সন্ত্রাসী কার্যক্রম দমন
- গুম, খুন ও ভূমিদস্যুতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া
- প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহায়তা করা।
তল্লাশি ও গ্রেফতারের ক্ষমতা
খসড়ায় এসআরবিকে কিছু ক্ষেত্রে প্রবেশ, তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেফতারের ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে এসব ক্ষমতা ফৌজদারি কার্যবিধি ও প্রচলিত আইন অনুসরণ করে প্রয়োগ করতে হবে।
খসড়া অনুযায়ী, অন্য কোনো আইনে ভিন্ন কিছু বলা থাকলেও এই আইনের অধীনে তল্লাশি, আটক, জব্দ বা গ্রেফতারের ক্ষেত্রে এসআরবির একজন কর্মকর্তা ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী তদন্তকারী কর্মকর্তার ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবেন।
তবে কোনো সদস্য কাউকে গ্রেফতার করলে বা কোনো আলামত জব্দ করলে তা অবিলম্বে নিকটবর্তী থানায় হস্তান্তর করতে হবে।
তদন্তের ক্ষমতাও থাকছে
র্যাবের সঙ্গে প্রস্তাবিত এসআরবির অন্যতম পার্থক্য হিসেবে খসড়ায় ফৌজদারি অপরাধ তদন্তের ক্ষমতার বিষয়টি এসেছে।
প্রস্তাবিত আইনে এসআরবিকে ফৌজদারি অপরাধ তদন্তের দায়িত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে বাহিনীর সদস্যদের শৃঙ্খলা পরিপন্থী কর্মকাণ্ডের তদন্তের এখতিয়ার মহাপরিচালকের হাতে রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
খসড়ায় বলা হয়েছে, সুষ্ঠু তদন্ত পরিচালনার জন্য এসআরবির নিজস্ব হাজতখানা, মালখানা ও জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ থাকবে। জব্দ করা মালামাল আদালতের আদেশ বা সরকারের বিধি অনুযায়ী নিষ্পত্তি করতে হবে।
নাগরিকের অভিযোগের সুযোগ
নতুন খসড়ায় নাগরিকদের অভিযোগ জানানোর জন্য একটি অভিযোগ প্রতিকার কমিটি গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে।
এই কমিটির প্রধান হবেন ইউনিটের একজন অতিরিক্ত মহাপরিচালক। কোনো নাগরিক অভিযোগ বা সংক্ষোভ জানালে তা প্রতিকারের জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী নিরপেক্ষ ও অভিজ্ঞ অনুসন্ধান দল গঠন করে বিভাগীয় পদ্ধতিতে অনুসন্ধান করা যাবে।
তবে এই কমিটি কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
র্যাবের বিরুদ্ধে পুরনো অভিযোগ
২০০৪ সালে বিএনপি সরকারের আমলে পুলিশের বিশেষ বাহিনী হিসেবে র্যাব গঠন করা হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বাহিনীটির বিরুদ্ধে কথিত ‘ক্রসফায়ার’ বা ‘বন্দুকযুদ্ধের’ নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ ওঠে।
মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের তথ্য অনুযায়ী, র্যাব গঠনের পর বিএনপির সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার সময় পর্যন্ত ৩৮০ জন ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন।পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও র্যাবের বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ বাড়তে থাকে। কক্সবাজারের টেকনাফে মেজর (অব.) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যাকাণ্ডের আগে আলোচিত একরামুল হক হত্যার ঘটনাসহ বিভিন্ন ঘটনায় র্যাব ও এর কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে।
এসব অভিযোগের প্রেক্ষাপটে ২০২১ সালে র্যাব এবং বাহিনীটির কয়েকজন বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্র।
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বিএনপির গঠিত পুলিশ প্রশাসন সংস্কার কমিটি আনুষ্ঠানিকভাবে র্যাব বিলুপ্তির সুপারিশ করে। ওই কমিটির প্রধান ছিলেন বর্তমান স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
তাহলে নতুন কী থাকছে?
মানবাধিকার সংগঠক নূর খান লিটনের মতে, প্রস্তাবিত এসআরবিতে র্যাবের মৌলিক কাঠামো ও কার্যক্রমের বড় কোনো পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না।
তিনি বলেন, “বর্তমান র্যাব আছে, সেটাকে পুনঃস্থাপিত করা হচ্ছে এসআরবি দিয়ে। মৌলিক কোনো পার্থক্য নেই। নতুন মোড়কে পুরনো জিনিসই আইনের খসড়ায় দেওয়া আছে। আগের চেহারার নতুন বর্ণনা দেওয়া হচ্ছে।”
নূর খান লিটনের মতে, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের কারণে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা র্যাব বিলুপ্ত করে পুলিশের সদস্যদের নিয়ে বিশেষায়িত টিম গঠনের পরামর্শ দিয়ে আসছিল।
তবে প্রস্তাবিত আইনে প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যদেরও এসআরবিতে কাজ করার সুযোগ রাখা হয়েছে। এ নিয়ে আপত্তি জানিয়ে তিনি বলেন, সেনাবাহিনী ও পুলিশের কাজের ধরন ও প্রশিক্ষণ এক নয়। অভ্যন্তরীণ অপরাধ দমনে পুলিশের বিশেষায়িত টিমই বেশি উপযোগী।
তার মতে, নতুন খসড়াতেও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের যথেষ্ট সুযোগ রাখা হয়নি।
জবাবদিহিতার সুযোগ বেড়েছে কি?
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান ও পুলিশ সায়েন্সেস বিভাগের অধ্যাপক ওমর ফারুক অবশ্য খসড়ায় কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন দেখছেন।তার মতে, র্যাবের তুলনায় প্রস্তাবিত এসআরবিকে ফৌজদারি অপরাধ তদন্তের ক্ষমতা দেওয়ার বিষয়টি নতুন। একই সঙ্গে নাগরিকদের অভিযোগ জানানোর সুযোগ রাখা হয়েছে।
তিনি বলেন, “এখানে নাগরিকদের অভিযোগ করার একটা সুযোগ রাখা হয়েছে। ফলে যে কোনো নাগরিক অভিযোগ করতে পারবে। এসব অভিযোগ প্রতিকারে বাহিনীর লোকজন ছাড়া অন্যদের কর্তৃপক্ষ সংযুক্ত করতে পারবে।”
তবে নূর খান লিটনের প্রশ্ন, বাইরের ব্যক্তিদের যুক্ত করার সিদ্ধান্ত যেহেতু কর্তৃপক্ষের হাতে থাকবে, সেখানে প্রকৃতপক্ষে কতটা স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ব্যক্তি যুক্ত হবেন এবং তারা কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবেন, সেটি নিশ্চিত নয়।
অধ্যাপক ওমর ফারুকের মতে, প্রস্তাবিত এসআরবির ক্ষেত্রে সদস্যদের জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার বিষয়টি খসড়ায় তুলনামূলকভাবে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।“স্বচ্ছতা নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে এবার কিছুটা গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে মানবাধিকারকে সুরক্ষা দিয়ে বাহিনী কীভাবে কুইক রেসপন্স করবে, তা নিয়ে খসড়ায় কিছু বলা নেই,” বলেন তিনি।
মূল প্রশ্ন থাকছে মানবাধিকার সুরক্ষা নিয়ে
প্রস্তাবিত এসআরবির দায়িত্ব, ক্ষমতা ও কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, র্যাব বিলুপ্ত হলেও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, সন্ত্রাস দমন, মাদক ও অস্ত্র উদ্ধার, সংঘবদ্ধ অপরাধ দমন, গ্রেফতার এবং বিশেষ অভিযানের মতো কাজের বড় অংশই নতুন ইউনিটের হাতে থাকবে।
পার্থক্য হিসেবে যুক্ত হচ্ছে ফৌজদারি অপরাধ তদন্তের ক্ষমতা, নাগরিক অভিযোগ প্রতিকারের ব্যবস্থা এবং সদস্যদের জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার কিছু বিধান।তবে মানবাধিকার সংগঠকদের বড় উদ্বেগ হলো, অতীতে র্যাবের বিরুদ্ধে ওঠা বিচারবহির্ভূত হত্যা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ঠেকাতে প্রস্তাবিত কাঠামোয় কতটা স্বাধীন ও কার্যকর নজরদারি ও তদন্তের ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, খসড়ার ওপর পাওয়া মতামতের ভিত্তিতে আইনটিকে আরও পরিমার্জনের জন্য একটি কমিটি কাজ করছে। ফলে সংসদে বিল আকারে যাওয়ার আগে খসড়ায় আরও পরিবর্তন আসতে পারে।