দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ৮০ বছর পর ফের সামরিক শক্তি বাড়াচ্ছে জার্মানি-জাপান। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৯ আগষ্ট- দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের প্রায় ৮০ বছর পর আবারও সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর পথে হাঁটছে জার্মানি ও জাপান। রাশিয়া ও চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক তৎপরতা, ইউরোপ ও এশিয়ায় নিরাপত্তা পরিস্থিতির পরিবর্তন এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে দুই দেশই প্রতিরক্ষা ব্যয় ও সামরিক সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। পাশাপাশি পারস্পরিক সামরিক সহযোগিতাও জোরদার করছে তারা।
১৯৪০ সালে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী অক্ষশক্তির অংশ হিসেবে জার্মানি ও জাপান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে একই শিবিরে ছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে দুই দেশের সামরিক সহযোগিতার লক্ষ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। এবার তারা আন্তর্জাতিক নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থা ও নিজেদের নিরাপত্তা জোরদারের অংশ হিসেবে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়াচ্ছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেনকে জার্মানির সামরিক ও রাজনৈতিক সমর্থন এবং চীন ও উত্তর কোরিয়ার সামরিক তৎপরতা নিয়ে জাপানের উদ্বেগ দুই দেশকে আরও ঘনিষ্ঠ করছে। এর অংশ হিসেবে ড্রোন, হেলিকপ্টার, সামরিক প্রযুক্তি, অস্ত্র এবং প্রতিরক্ষা-সংক্রান্ত দক্ষতা বিনিময়ের মতো ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানো হচ্ছে।
ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি-৭ সম্মেলনেও জার্মানি ও জাপানের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও জোরদারের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। জার্মান প্রতিরক্ষামন্ত্রী বরিস পিস্টোরিয়াস বলেছেন, নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা সমর্থনকারী জার্মানি ও জাপানের আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করা প্রয়োজন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সামরিক পরাজয় এবং যুদ্ধের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কারণে দুই দেশই দীর্ঘদিন প্রতিরক্ষা খাতে তুলনামূলকভাবে সীমিত ব্যয় করেছে। যুদ্ধের পর জার্মানি অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ও সামাজিক কল্যাণে বেশি গুরুত্ব দেয়। জাপানও সামরিক শক্তির পরিবর্তে অর্থনৈতিক উন্নয়নের দিকে মনোযোগ দেয়।
জাপানের ক্ষেত্রে সামরিক নীতিতে সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। দেশটির সংবিধানের ৯ নম্বর অনুচ্ছেদে যুদ্ধ পরিত্যাগের কথা বলা হয়েছে। দেশটির সামরিক বাহিনীর সরকারি নামও ‘সেলফ-ডিফেন্স ফোর্সেস’, অর্থাৎ আত্মরক্ষা বাহিনী। দীর্ঘদিন ধরে জাপান নিজেদের সামরিক সক্ষমতাকে মূলত প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখেছে।
জার্মানির ক্ষেত্রেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সামরিক শক্তি নিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে সতর্কতা ছিল। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউরোপের নিরাপত্তা পরিস্থিতির বড় পরিবর্তন সেই অবস্থানকে বদলে দিচ্ছে।
বিশেষ করে ২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু করার পর ইউরোপের নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়। রাশিয়ার সামরিক সক্ষমতা এবং ইউক্রেন যুদ্ধ জার্মানিসহ ইউরোপের দেশগুলোকে নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করে।
এর পাশাপাশি চীনের দ্রুত সামরিক আধুনিকায়ন এবং পূর্ব এশিয়ায় বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান তৎপরতা জাপানের নিরাপত্তা নীতিতেও পরিবর্তন এনেছে। উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক কর্মসূচিও টোকিওর উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে ইউরোপীয় নিরাপত্তা নিয়ে ওয়াশিংটনের ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়েও মিত্র দেশগুলোর মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। ফলে দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতার ওপর নির্ভরশীল জার্মানি ও জাপান নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজন অনুভব করছে।
জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মেরৎস দেশটির সামরিক ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছেন। জার্মানি দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা ঘাটতি কাটিয়ে সামরিক বাহিনীকে আধুনিক ও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা করছে। এর মধ্যে নতুন অস্ত্র কেনা, সামরিক সরঞ্জাম আধুনিকায়ন এবং প্রতিরক্ষা শিল্পের সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয় রয়েছে।
অন্যদিকে জাপানও কয়েক দশকের তুলনায় অনেক বেশি সক্রিয় প্রতিরক্ষা নীতি গ্রহণ করেছে। দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন, পাল্টা হামলার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম রপ্তানির ক্ষেত্রে যুদ্ধ-পরবর্তী বিধিনিষেধ শিথিল করার মতো পদক্ষেপ নিয়েছে দেশটি।
তবে জাপানের এই পরিবর্তিত সামরিক নীতি নিয়ে দেশের ভেতরেও বিতর্ক রয়েছে। শান্তিবাদী সংবিধান ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞতার কারণে দেশটির একটি বড় অংশ সামরিক শক্তি বাড়ানোর বিষয়ে সতর্ক। এ নিয়ে বিভিন্ন সময় বিক্ষোভও হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, জার্মানি ও জাপান সামরিক সক্ষমতা যতই বাড়াক, শুধু অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা বাজেট বৃদ্ধি যথেষ্ট নয়। দুই দেশের জনগণের মধ্যেও নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা এবং সম্ভাব্য যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে নতুন বাস্তবতা গ্রহণের মানসিকতা তৈরি করতে হবে।
দুই দেশের এই পরিবর্তনকে তাই শুধু সামরিক ব্যয় বৃদ্ধির ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যে দুই দেশ সামরিক শক্তির বদলে অর্থনৈতিক উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়েছিল, বর্তমান বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে তারাই আবার প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধির দিকে ফিরছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, চীনের উত্থান, উত্তর কোরিয়ার সামরিক তৎপরতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ভূমিকা নিয়ে অনিশ্চয়তা এই পরিবর্তনের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।