শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরাতে যুক্তরাষ্ট্র-ভারতের নতুন কূটনৈতিক তৎপরতা। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১৩ আগষ্ট- বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার পথ তৈরি করতে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মৃত্যুদণ্ডসহ অন্যান্য সাজা অন্তত এক বছরের জন্য স্থগিত রাখার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যে কূটনৈতিক সমঝোতা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। বাংলাদেশে থাকা কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে নর্থইস্ট নিউজ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত দুই সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের কর্মকর্তারা বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশের সরকারের জ্যেষ্ঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। এমনকি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছেও বিষয়টি তুলে ধরে ঢাকার সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার সম্ভাব্য কাঠামো নিয়ে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল ও দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক মার্কিন বিশেষ দূত সার্জিও গরের ১০ ও ১১ আগস্টের বৈঠকে আলোচনা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি অন্যান্য কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমেও বিষয়টি এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে।
নর্থইস্ট নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো শেখ হাসিনার ‘মর্যাদা’ ও ‘নিরাপত্তা’ নিশ্চিত করে তাকে বাংলাদেশে ফেরার সুযোগ তৈরি করা। তবে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রমের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়টি এখনো সমাধান হয়নি বলে দাবি করা হয়েছে।

হোয়াইট হাউসে অনুষ্ঠিত বৈঠকে হাত মেলান নরেন্দ্র মোদি ও ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে। ছবি: এএফপি
প্রতিবেদনটির দাবি, আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয়গুলোতে যুক্তরাষ্ট্র আবারও ভারতের দৃষ্টিভঙ্গিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। একই সঙ্গে ওয়াশিংটন ও নয়াদিল্লির কূটনৈতিক মধ্যস্থতায় ক্ষমতাসীন বিএনপি ও নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মধ্যে রাজনৈতিক সমঝোতার একটি প্রক্রিয়া তৈরির চেষ্টা চলছে বলেও এতে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এ দাবিরও স্বাধীনভাবে কোনো সরকারি নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি।
প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, বাংলাদেশে ‘অগণতান্ত্রিক’ শক্তির উপস্থিতিকে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র বৃহত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করছে। এ কারণেই ওয়াশিংটন, নয়াদিল্লি ও ঢাকার মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতার সঙ্গে তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের কথিত সামরিক চুক্তির বিষয়টিও প্রতিবেদনে যুক্ত করা হয়েছে। ‘মক্কা চুক্তি’ নামে উল্লেখ করা ওই চুক্তিকে ন্যাটোর যৌথ প্রতিরক্ষা নীতির আদলে তৈরি বলে দাবি করা হয়েছে। এতে তিন দেশের যেকোনো একটি আক্রান্ত হলে সেটিকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করার ব্যবস্থা রয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তবে এসব দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি।
এই প্রেক্ষাপটে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং বা ‘র’-এর প্রধান পরাগ জৈন গত ৯ ও ১০ আগস্ট তিন কর্মকর্তাকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশ সফর করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের আমন্ত্রণে এ সফর হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিনিধিদলে পরাগ জৈনের সঙ্গে ছিলেন অশ্বিন মুকুন্দ কোটনিস, রাহুল নেগি এবং শৈবল রায় চৌধুরী। ঢাকায় এসে তারা পৃথকভাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল অবসরপ্রাপ্ত ড. এ কে এম শামসুল ইসলামের সঙ্গে বৈঠক করেন বলে দাবি করা হয়েছে। শৈবল রায় চৌধুরী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরাগ জৈনের সফর বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে, কারণ তিনি বাংলাদেশ সফরের আগে চীন সফর করেছিলেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। শেখ হাসিনার নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ অবস্থান নিয়ে উদীয়মান কূটনৈতিক সমীকরণের অংশ হিসেবেই তার ঢাকা সফরকে দেখা হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন ও নিরাপত্তার বিষয়টিকে ভারত নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গেও সম্পৃক্ত একটি বিষয় হিসেবে বিবেচনা করছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এ বিষয়ে নয়াদিল্লি রাশিয়া ও ইউরোপের কয়েকটি দেশের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় রেখেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছবি: সংগৃহীত
একজন ভারতীয় কূটনৈতিক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার ‘প্রত্যাবর্তন ও নিরাপত্তা’ নিয়ে ভারতের একটি উদ্যোগকে চীন সমর্থন করেছে। তবে চীনের এই কথিত সমর্থনের ধরন ও পরিধি সম্পর্কে কোনো প্রকাশ্য প্রমাণ বা সরকারি নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি।
এদিকে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে চলমান বিচারিক কার্যক্রম নিয়েও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। গত ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ফেরার প্রত্যাশা পুনর্ব্যক্ত করেন এবং ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার ইচ্ছার কথা জানান। এরপর থেকেই তার প্রত্যাবর্তন ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয়টি নতুন করে কূটনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য কূটনৈতিক উদ্যোগটির সঙ্গে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরস্পর সম্পর্কিত। এর মধ্যে রয়েছে শেখ হাসিনার বর্তমান আইনি অবস্থান, তার সাজা স্থগিতের সম্ভাবনা, ব্যক্তিগত নিরাপত্তার নিশ্চয়তা, দেশে ফেরার শর্ত এবং আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অবস্থান।
ভারতের জন্য বিষয়টি রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা উভয় দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে নয়াদিল্লিকে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে হচ্ছে, অন্যদিকে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের সঙ্গে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত সম্পর্কের বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও বিষয়টি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং ভারতের সঙ্গে কৌশলগত সমন্বয়ের বৃহত্তর কাঠামোর অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের জন্য সম্ভাব্য যেকোনো সমঝোতা বিচারিক প্রক্রিয়া, রাজনৈতিক সমঝোতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং আদালতের রায় কার্যকরের বিষয়ে সরকারের অবস্থান নিয়ে জটিল প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শেখ হাসিনার সাজা স্থগিত করা কিংবা তাকে দেশে ফেরানোর বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত বা বাংলাদেশের সরকার এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক সমঝোতার কথা নিশ্চিত করেনি। প্রতিবেদনে বর্ণিত সব কূটনৈতিক ও গোয়েন্দা তৎপরতারও স্বাধীন সরকারি নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি।
তবু অজিত দোভাল ও সার্জিও গরের বৈঠক, ‘র’-প্রধান পরাগ জৈনের ঢাকা সফর এবং ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে সাম্প্রতিক ধারাবাহিক উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ থেকে স্পষ্ট হচ্ছে, শেখ হাসিনার ভবিষ্যৎ এখন শুধু ঢাকা-দিল্লির দ্বিপক্ষীয় ইস্যুতে সীমাবদ্ধ নেই। বিষয়টি ক্রমেই দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক নিরাপত্তা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থের বৃহত্তর সমীকরণের অংশ হয়ে উঠছে।
সূত্রঃ নর্থ ইস্ট নিউজ