আবদুল আলিম। ছবি : সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১৬ আগষ্ট: চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে জাহাজভাঙা কারখানায় বিষাক্ত গ্যাসের প্রভাবে আবদুল আলিম (৩৫) নিহত হওয়ার পর পাবনার সুজানগরের সৈয়দপুর গ্রামের তাঁর বাড়িতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। ছেলেকে হারিয়ে দিশাহারা বাবা মোহাম্মদ আলী। অন্যদিকে পরিবারের প্রধান উপার্জনকারীকে হারিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছে আলিমের স্ত্রী ও দুই শিশুসন্তানের ভবিষ্যৎ।
আবদুল আলিম ছিলেন চার ভাইয়ের মধ্যে সবার বড়। সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীর ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিন ইন্ডাস্ট্রিজে নিরাপত্তা ও পরিবেশ সহকারী হিসেবে কাজ করতেন তিনি। প্রায় ১৬ বছর আগে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে জীবিকার সন্ধানে চট্টগ্রামে পাড়ি জমান। পরে নিরাপত্তাবিষয়ক প্রশিক্ষণ নিয়ে ওই পদে যোগ দেন।
আলিমের স্ত্রী ও দুই ছেলে গ্রামেই থাকেন। তাদের বয়স ৬ ও ৪ বছর।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, দুর্ঘটনার সময় সহকর্মীদের চিৎকার শুনে তাঁদের উদ্ধারে ছুটে যান আলিম। একজন সহকর্মীকে উদ্ধারও করেন তিনি। কিন্তু পরে নিজেই বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হন এবং মারা যান।
রোববার সকালে সৈয়দপুর গ্রামের পৈতৃক বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাড়িজুড়ে নীরবতা। আধাপাকা ও টিনের ঘর নিয়ে তৈরি বাড়িটির ভেতরে স্বজনেরা দোয়া পড়ছিলেন। বাইরে ছিল শোকাহত পরিবেশ।
ছেলেকে হারিয়ে ভেঙে পড়েছেন কৃষক বাবা মোহাম্মদ আলী। প্রত্যক্ষদর্শী সহকর্মীদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তিনি বলেন, অন্যদের বাঁচাতে গিয়ে তাঁর ছেলে নিজেই প্রাণ হারিয়েছেন।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে মোহাম্মদ আলী বলেন, “আমার বেটা পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী ছিল। বেটার স্ত্রী ও দুইটা বেটা আছে। এহন কীভাবে এতগুলে মুখের আহার জুটপি, বুঝবের পারতেছিনে। চারদিক আন্ধার লাগতেছে।”

আবদুল আলিমের বাড়িতে সান্ত্বনা জানাতে এসেছেন প্রতিবেশী ও এলাকার লোকজন। আজ রোববার পাবনার সুজানগর উপজেলার আহম্মদপুর ইউনিয়নের সৈয়দপুর গ্রামে।ছবি: সংগৃহীত
তিনি অভিযোগ করেন, কারখানা কর্তৃপক্ষের অবহেলার কারণেই তাঁর ছেলেসহ এতগুলো প্রাণ ঝরে গেছে। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
আবদুল আলিমের চাচা মোজাম্মেল হোসেন বলেন, সহকর্মী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে তারা জানতে পেরেছেন, দুর্ঘটনাকবলিত ইয়ার্ডে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা ছিল না।
তার অভিযোগ, বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পড়ার পর দ্রুত উদ্ধারকাজ পরিচালনার জন্য যথাযথ পরিকল্পনা ছিল না। আহতদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থাও পর্যাপ্ত ছিল না। এমনকি ঘটনাস্থল থেকে বের হওয়ার প্রধান ফটকও তালাবদ্ধ ছিল বলে দাবি করেন তিনি।
মোজাম্মেল হোসেন বলেন, “ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার হওয়া প্রয়োজন। যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাদের পরিবারের দায়িত্ব কোম্পানিকেই নিতে হবে।”
গত শুক্রবার সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা কারখানায় ওই দুর্ঘটনা ঘটে। পরদিন শনিবার সকাল ৬টার দিকে আবদুল আলিমের মরদেহ তাঁর গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায়।
প্রিয় মানুষটির মরদেহ একনজর দেখতে বাড়িতে ভিড় করেন পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন ও গ্রামের মানুষ। কান্না আর আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ।
শনিবার সকাল ১০টায় জানাজা শেষে গ্রামের কবরস্থানে আবদুল আলিমের দাফন সম্পন্ন হয়।
একজন বাবার কাছে ছেলে হারানোর শোক যেমন অসহনীয়, তেমনি দুই শিশুর কাছে বাবাকে হারানোর এই শূন্যতা কতটা গভীর, তা এখনই বোঝা কঠিন। তবে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটিকে হারিয়ে তাদের সামনে যে কঠিন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হয়ে দাঁড়িয়েছে।