বাড়ির দাম কমার পক্ষে তারা কি না, তা বলতে রাজনৈতিক নেতারা সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। — ছবি: বিয়ন্ডইমেজেস
মেলবোর্ন, ১৬ আগষ্ট: অস্ট্রেলিয়ার বড় শহরগুলোতে বাড়ির দাম দ্রুত কমে যাওয়ার পূর্বাভাসের পর ‘নেগেটিভ ইকুইটি’ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। তবে অর্থনীতিবিদ ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, পরিস্থিতি নিয়ে সতর্ক থাকার প্রয়োজন থাকলেও এটি এখনো বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকি হয়ে ওঠেনি।
অস্ট্রেলিয়ার ব্যাংক এএনজেড চলতি সপ্তাহে পূর্বাভাস দিয়েছে, দেশটির প্রধান শহরগুলোতে বাড়ির দাম ৫ দশমিক ২ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ১৪ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। অর্থের হিসাবে সম্ভাব্য পতনের পরিমাণ হতে পারে প্রায় ৫৬ হাজার ১৭ ডলার থেকে ২ লাখ ৩৬ হাজার ৩১২ ডলার।
কোনো বাড়ি বা সম্পদের বর্তমান বাজারমূল্য যদি ওই সম্পদের বিপরীতে নেওয়া ঋণের বকেয়া অর্থের চেয়ে কমে যায়, তখন তাকে ‘নেগেটিভ ইকুইটি’ বলা হয়।
ধরা যাক, কোনো ব্যক্তির বাড়ির মর্টগেজের বাকি আছে ৫ লাখ ডলার। কিন্তু বাড়িটির বর্তমান বাজারমূল্য নেমে এসেছে ৪ লাখ ৫০ হাজার ডলারে। সেক্ষেত্রে ওই ব্যক্তির নেগেটিভ ইকুইটি দাঁড়াবে ৫০ হাজার ডলার।
সাধারণত বাড়ির দাম কমে গেলে, বাজারের সর্বোচ্চ দামের সময় বাড়ি কিনলে অথবা খুব কম ডাউন পেমেন্ট দিয়ে বাড়ি কিনলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। অস্ট্রেলিয়ার ৫ শতাংশ ডিপোজিটে প্রথম বাড়ি কেনার সরকারি ব্যবস্থায় যারা বাড়ি কিনেছেন, তাদের কেউ কেউ তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে থাকতে পারেন।
বাড়ির দাম কমার সম্ভাবনার জন্য ফেডারেল সরকারের করনীতির পরিবর্তনকে দায়ী করেছে বিরোধী জোট।
শ্যাডো ট্রেজারার টিম উইলসন অভিযোগ করেছেন, প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজের সরকার সম্পত্তির মালিকদের দীর্ঘদিনের বিভিন্ন কর সুবিধা সীমিত করার উদ্যোগ নিয়েছে।
তিনি বলেন, এর ফলে যারা এখনো বাড়ির বাজারে প্রবেশ করতে পারেননি, সেই তরুণ অস্ট্রেলিয়ানদের পাশাপাশি বয়স্ক মানুষ ও দীর্ঘদিন সঞ্চয় করা পরিবারগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তার দাবি, এ কারণেই নেগেটিভ ইকুইটির ঘটনা বাড়ছে।
তবে বাড়ির দাম কমা আদৌ খারাপ কি না, তা নিয়ে রাজনৈতিকভাবে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বিভিন্ন দল। কারণ অস্ট্রেলিয়ার প্রায় ৬৭ শতাংশ মানুষ নিজেদের বাড়ির মালিক এবং তাদের মধ্যে প্রায় ২৫ শতাংশের বাড়ির বিপরীতে মর্টগেজ রয়েছে।
হাউজিংমন্ত্রী ক্লেয়ার ও’নিল জুন মাসে বাড়ি বিক্রির নিলামে কম সাফল্যের হার দেখা যাওয়ার পর বাজারে ‘সংশোধন’ বা কারেকশন চলছে বলে মন্তব্য করেছিলেন। পরে ট্রেজারার জিম চালমার্সকে সেই মন্তব্যের ব্যাখ্যা কিছুটা নরম করতে হয়।
অন্যদিকে বিরোধী দলের নেতা অ্যাঙ্গাস টেলর বলেছেন, তিনি বাড়ির দাম মানুষের নাগালের মধ্যে দেখতে চান। গ্রিনস দলের হাউজিং মুখপাত্র বারবারা পককও বাড়ির দাম কমানোর পক্ষে মত দিয়েছেন, যাতে প্রথমবারের মতো বাড়ি কিনতে চাওয়া মানুষ বাজারে প্রবেশের সুযোগ পান।
ক্যানস্টারের ডেটা ইনসাইটস পরিচালক স্যালি টিন্ডালের মতে, এএনজেডের বাড়ির দাম কমার পূর্বাভাস বিশেষ করে তাদের জন্য উদ্বেগজনক, যারা বাজারের সর্বোচ্চ দামের কাছাকাছি সময়ে বাড়ি কিনেছেন।
তবে রিজার্ভ ব্যাংক অব অস্ট্রেলিয়ার জুন মাসের সর্বশেষ তথ্য বলছে, বর্তমানে নেগেটিভ ইকুইটির আওতায় থাকা ঋণগ্রহীতার সংখ্যা মোট ঋণগ্রহীতার ১ শতাংশেরও কম।
এ সপ্তাহে সুদের হার নিয়ে সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর রিজার্ভ ব্যাংকের গভর্নর মিশেল বুলক বলেন, আবাসনবাজারে পতনের গতি ও ব্যাপ্তি দেখে তিনি বিস্মিত হয়েছেন।
তবে তিনি জানান, বাড়ির দাম ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেলেও আনুমানিক ৫ শতাংশ পরিবার নেগেটিভ ইকুইটির মুখে পড়তে পারে।

প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ ও ট্রেজারার জিম চালমার্স জুনে তাদের কর সংস্কারের প্রথম ধাপ পাস করান। — অ্যালেক্স এলিংহাউসেন
বুলকের মতে, নেগেটিভ ইকুইটি মূলত তখনই বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়, যখন কোনো ব্যক্তি আর্থিক সংকটে পড়ে বাধ্য হয়ে বাড়ি বিক্রি করতে চান। যেমন চাকরি হারানো, দাম্পত্য বিচ্ছেদ বা পারিবারিক পরিস্থিতির কারণে বাড়ি বিক্রি করতে হতে পারে।
তিনি বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতি অবশ্যই গুরুতর। তবে এর কারণে অস্ট্রেলিয়ার আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হবে না, কারণ এসব প্রতিষ্ঠান পর্যাপ্ত মূলধন সংরক্ষণ করে।
বুলক বলেন, “আমরা বিষয়টি নিয়ে সতর্ক এবং সম্ভাব্য প্রভাব পর্যবেক্ষণ করছি। তবে আমরা মনে করি না, এর বড় কোনো আর্থিক প্রভাব পড়বে।”
স্বাধীন অর্থনীতিবিদ সল এলস্লেকের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে বাড়ি কিনেছেন এবং একই সঙ্গে লেবার সরকারের ৫ শতাংশ ডিপোজিটে প্রথম বাড়ি কেনার ব্যবস্থার সুবিধা নিয়েছেন, তাদের নেগেটিভ ইকুইটিতে পড়ার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।
তবে তিনি বলেন, যারা এই পরিস্থিতিতে পড়বেন, তাদের জন্য বিষয়টি মানসিকভাবে অস্বস্তিকর হলেও এটি বাস্তবে বড় ধরনের সমস্যা নাও হতে পারে।
এলস্লেকের মতে, সাধারণ পরিস্থিতিতে আবাসনবাজার সময়ের সঙ্গে ঘুরে দাঁড়ায়। ফলে বাড়ির দাম কমে গেলেও মর্টগেজধারীদের ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সীমিত থাকতে পারে, যদি তাদের বাড়ি বিক্রি করার প্রয়োজন না হয়।
চাকরি হারানো, অন্য শহরে বা এলাকায় চলে যাওয়া কিংবা সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার মতো পরিস্থিতিতে যদি বাড়ি বিক্রি করতে হয়, তখন নেগেটিভ ইকুইটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
তিনি বলেন, এমন পরিস্থিতিতে না পড়লে অধিকাংশ ঋণগ্রহীতা নিয়মিত মর্টগেজ পরিশোধের মাধ্যমে ধীরে ধীরে এই অবস্থার বাইরে চলে আসতে পারবেন। বাড়ির দাম আরও কিছু সময় কমলেও ইতিহাস বলছে, একপর্যায়ে দাম কমা থামবে এবং আবার বাড়তে শুরু করবে।
তবে স্যালি টিন্ডাল সতর্ক করে বলেছেন, স্বল্পমেয়াদে নেগেটিভ ইকুইটি বাড়ির মালিকদের আর্থিক নমনীয়তা কমিয়ে দেয়। বিশেষ করে নতুন করে ঋণ নেওয়া বা বিদ্যমান মর্টগেজ পুনঃঅর্থায়ন বা রিফাইন্যান্সিং করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
অর্থাৎ, অস্ট্রেলিয়ায় বাড়ির দাম কমার কারণে নেগেটিভ ইকুইটির ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হলেও বর্তমানে এটি ব্যাপক আকার ধারণ করেনি। তবে বাজারের পতন আরও গভীর হলে এবং বাড়ির মালিকদের কেউ বাধ্য হয়ে সম্পত্তি বিক্রি করতে হলে পরিস্থিতি কিছুটা জটিল হতে পারে।
সূত্র-নাইন.কম.এইউ