রোহিঙ্গা সংকট: মিয়ানমারের বিবৃতিতে নতুন শঙ্কা
মেলবোর্ন, ১৯ আগষ্ট: মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আবারও ‘বাঙালি’ দাবি করে মিয়ানমার সরকারের সাম্প্রতিক বিবৃতির পর বাংলাদেশ সরকার জানিয়েছে যে,…
মেলবোর্ন, ১৯ আগষ্ট- বাংলাদেশের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে পানি, স্যানিটেশন, হাত ধোয়ার সুবিধা, পরিবেশ পরিচ্ছন্নতা ও চিকিৎসাবর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর তুলনামূলক চিত্রেও বেশির ভাগ সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান নিচের সারিতে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ)-এর যৌথ মনিটরিং প্রোগ্রামের (জেএমপি) সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। ‘প্রোগ্রেস অন ওয়াটার, স্যানিটেশন, হাইজিন, এনভায়রনমেন্টাল ক্লিনিং অ্যান্ড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট ইন হেলথ কেয়ার ফ্যাসিলিটিজ ২০১৫-২০২৫’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) প্রকাশ করা হয়। এতে বিশ্বের শতাধিক দেশের স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বিভিন্ন জরিপ ও তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পানি, স্যানিটেশন, হাইজিন, পরিবেশ পরিচ্ছন্নতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে মৌলিক পাঁচটি সেবা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। কোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এসব সেবার ন্যূনতম মান পূরণ করা হলে তাকে মৌলিক সেবা হিসেবে ধরা হয়েছে। আংশিক বা দুর্বল সুবিধাকে সীমিত সেবা এবং ন্যূনতম মানও না থাকলে কোনো সেবা নেই হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে।
পানি সেবার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ৭১ শতাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মৌলিক সুবিধা রয়েছে। ১৮ শতাংশে রয়েছে সীমিত সুবিধা এবং ১১ শতাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কোনো পানি সেবাই নেই। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে পাকিস্তানে মৌলিক পানি সেবার হার ৭৫ শতাংশ। অন্যদিকে ভারত ও ভুটানে ৯৭ শতাংশ, শ্রীলঙ্কায় ৯৬ শতাংশ, ইরানে ৮৮ শতাংশ, নেপালে ৮৩ শতাংশ এবং আফগানিস্তানে ৮২ শতাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মৌলিক পানি সেবা রয়েছে। মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ায় এ সেবার গড় হার ৮৯ শতাংশ।
স্যানিটেশন ব্যবস্থায় বাংলাদেশের পরিস্থিতি আরও নাজুক। দেশের মাত্র ২৫ শতাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মৌলিক স্যানিটেশন সুবিধা রয়েছে। ৫৭ শতাংশে সেবা সীমিত এবং ১৮ শতাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কোনো স্যানিটেশন সুবিধাই নেই।
এই সূচকে ভারত ৭৩ শতাংশ মৌলিক সেবা নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় অনেক এগিয়ে। শ্রীলঙ্কায় এ হার ৩৩ শতাংশ, ইরান ও ভুটানে ২২ শতাংশ এবং নেপালে ২১ শতাংশ। তবে কোনো সেবা না থাকার দিক থেকে বাংলাদেশের পরিস্থিতি নেপাল ও ভারতের তুলনায় বেশি খারাপ। বাংলাদেশে ১৮ শতাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কোনো স্যানিটেশন সেবা নেই, যেখানে নেপালে এ হার ৫ শতাংশ এবং ভারতে ৬ শতাংশ।
প্রতিবেদনে ২০২২ সালের একটি স্বাস্থ্যসেবা জরিপের তথ্য তুলে ধরে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের মাত্র ১৯ শতাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্র পয়ঃনিষ্কাশন লাইনের সঙ্গে যুক্ত। ৫৬ শতাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্র সেপটিক ট্যাংক এবং ১১ শতাংশ পিট ল্যাট্রিনের ওপর নির্ভরশীল।
হাত ধোয়ার সুবিধাসহ মৌলিক হাইজিন সেবার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের অবস্থান উদ্বেগজনক। দেশের মাত্র ৩২ শতাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মৌলিক হাইজিন সুবিধা রয়েছে। ৪০ শতাংশে সেবা সীমিত এবং ২৭ শতাংশে কোনো হাইজিন সেবাই নেই।
এ ক্ষেত্রে ভাVisit Site

পরিবেশ পরিচ্ছন্নতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পরিস্থিতি আরও খারাপ। ছবিঃ সংগৃহীত
রত ৯৪ শতাংশ, ইরান ৯৩ শতাংশ, শ্রীলঙ্কা ৯২ শতাংশ এবং ভুটান ৮৫ শতাংশ মৌলিক সেবা নিশ্চিত করেছে। নেপালে এ হার ৭০ শতাংশ এবং পাকিস্তানে ৫৫ শতাংশ।
পরিবেশ পরিচ্ছন্নতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পরিস্থিতি আরও খারাপ। মাত্র ২০ শতাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মৌলিক পরিবেশ পরিচ্ছন্নতা সেবা রয়েছে। ৩১ শতাংশে সেবা সীমিত এবং প্রায় অর্ধেক, অর্থাৎ ৪৯ শতাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এ ধরনের কোনো সেবাই নেই।
এই সূচকে আফগানিস্তানে ৮৩ শতাংশ, ভারতে ৭৮ শতাংশ এবং শ্রীলঙ্কায় ৫৭ শতাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মৌলিক সেবা রয়েছে। তবে নেপালের অবস্থা বাংলাদেশের চেয়েও খারাপ। দেশটির মাত্র ৪ শতাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মৌলিক পরিবেশ পরিচ্ছন্নতা সেবা রয়েছে এবং ৮৪ শতাংশে কোনো সেবাই নেই।
চিকিৎসাবর্জ্য ব্যবস্থাপনাতেও বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল। দেশের মাত্র ১৬ শতাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মৌলিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সুবিধা রয়েছে। ৫৫ শতাংশে রয়েছে সীমিত সুবিধা এবং ২৮ শতাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কোনো ব্যবস্থাই নেই।
প্রতিবেদনে তথ্যযুক্ত ১৬টি দেশের তুলনায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় মৌলিক সেবা না থাকার হার বাংলাদেশে তৃতীয় সর্বোচ্চ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ তালিকায় সুদানে মৌলিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সেবার হার ৬৭ শতাংশ এবং পাকিস্তানে ৫৫ শতাংশ। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত ৮৯ শতাংশ এবং আফগানিস্তান ৮২ শতাংশ মৌলিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সেবা নিশ্চিত করেছে।
২০১৮ সালের একটি জরিপের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের কোনো নন-হাসপাতাল স্বাস্থ্যকেন্দ্রেই ধারালো চিকিৎসাবর্জ্য নিরাপদে ধ্বংসের জন্য ইনসিনারেটর ব্যবহারের তথ্য পাওয়া যায়নি। এতে এসব কেন্দ্রে সংক্রামক ও ধারালো বর্জ্য নিরাপদে ধ্বংস করার সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
প্রতিবেদনে বাংলাদেশের কক্সবাজার অঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার তথ্যও তুলে ধরা হয়েছে। জাতিসংঘের হেলথ রিসোর্সেস অ্যান্ড সার্ভিসেস অ্যাভেইলঅ্যাবিলিটি মনিটরিং সিস্টেমের আওতায় অঞ্চলভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ করা হয়। পাশাপাশি শেরপুর জেলা সদর হাসপাতালের একটি চিত্র প্রতিবেদনে ব্যবহার করা হয়েছে, যেখানে প্রসূতি কক্ষের বাইরে একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মীকে মেঝে পরিষ্কার করতে দেখা যায়।
সামগ্রিকভাবে পানি, স্যানিটেশন, হাইজিন, পরিবেশ পরিচ্ছন্নতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, এই পাঁচ সূচকের মধ্যে চারটিতেই দক্ষিণ এশিয়ার তুলনামূলক তথ্য থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল। বিশেষ করে ভারত ও শ্রীলঙ্কার সঙ্গে ব্যবধান অনেক ক্ষেত্রে ৪০ থেকে ৭০ শতাংশ পয়েন্ট পর্যন্ত। পানি সেবায় বাংলাদেশের অবস্থান তুলনামূলক ভালো হলেও এ ক্ষেত্রেও ভারত ও শ্রীলঙ্কার চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে। মালদ্বীপের ক্ষেত্রে এসব সূচকে পর্যাপ্ত তথ্য পাওয়া যায়নি।
বিশ্বজুড়েও স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পানি, স্যানিটেশন ও পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থার ঘাটতি বড় উদ্বেগের বিষয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের প্রতি ১০টি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের একটি করে স্যানিটেশন সেবা থেকে বঞ্চিত। এতে প্রায় ৯৩ কোটি ৬০ লাখ মানুষ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বিশ্বব্যাপী মাত্র ৪০ শতাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্র মৌলিক স্যানিটেশন সেবার সব শর্ত পূরণ করে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পর্যাপ্ত পানি, স্যানিটেশন, হাত ধোয়া ও পরিচ্ছন্নতার ব্যবস্থা না থাকলে সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ে। এতে রোগী ও স্বাস্থ্যকর্মী উভয়ের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে। বিশেষ করে প্রসূতি ও নবজাতক সেবাকেন্দ্রে এসব ঘাটতি থাকলে সংক্রমণসহ বিভিন্ন জটিলতার ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
তবে গত এক দশকে বিশ্বব্যাপী কিছু অগ্রগতিও হয়েছে। ২০১৫ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মৌলিক পানি সেবার বৈশ্বিক আওতা ৭৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ৮৫ শতাংশে পৌঁছেছে।
বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য উন্নয়নের উদাহরণ হিসেবে প্রতিবেদনে ভারতের ‘কায়াকল্প’ উদ্যোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। নিয়মিত মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশটিতে ২০১৫ সালে ১০০টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে ২০২৫ সালে ৫১ হাজারের বেশি স্বাস্থ্যকেন্দ্র নির্ধারিত মানদণ্ড অর্জন করেছে।
এ ছাড়া ডব্লিউএইচও ও ইউনিসেফের ‘ওয়াশ-ফিট’ পদ্ধতি ব্যবহার করে স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো নিজেদের পানি, স্যানিটেশন ও পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থার ঘাটতি চিহ্নিত করে ধাপে ধাপে উন্নয়ন পরিকল্পনা করতে পারে বলে প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়েছে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে উৎসেই বর্জ্য তিন ভাগে পৃথক করা, খোলা জায়গায় বর্জ্য পোড়ানোর পরিবর্তে উপযুক্ত মাল্টি-চেম্বার ইনসিনারেটর ব্যবহার এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্রে অন্তত দুই দিনের প্রয়োজনীয় পানি সংরক্ষণের সক্ষমতা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিরাপদ পানি, উন্নত স্যানিটেশন, হাত ধোয়ার ব্যবস্থা ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করা চিকিৎসাসেবার মানের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তাই অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি নিয়মিত তদারকি, প্রশিক্ষিত পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োগ, নিরাপদ চিকিৎসাবর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং হালনাগাদ তথ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au