ভারতের চেয়ে বিদ্যুৎ কিনতে চীনের কাছে ১২৭ শতাংশ বেশি দেবে বাংলাদেশ।ছবি: সংগৃহীত
বিদ্যুৎ সংকট ও অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে ভারতের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণেরও বেশি দামে চীনের সহায়তায় নির্মিত বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পের বিদ্যুৎ কিনতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। ২ সেপ্টেম্বর বেইজিংয়ে স্বাক্ষরিত এক চুক্তি অনুযায়ী, ঢাকার আমিনবাজারে নির্মাণাধীন ৪২ মেগাওয়াট ক্ষমতার বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র থেকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ প্রায় ২৫ টাকা দরে কিনবে বাংলাদেশ।
ভারতের কাছ থেকে বর্তমানে বাংলাদেশ যে বিদ্যুৎ আমদানি করে, তার প্রতি ইউনিটের দাম প্রায় ১১ টাকা। সে হিসাবে চীনের প্রকল্পের বিদ্যুতের জন্য প্রতি ইউনিটে প্রায় ১৪ টাকা বেশি দিতে হবে। অর্থাৎ ভারতের বিদ্যুতের তুলনায় চীনের বিদ্যুতের দাম প্রায় ১২৭ শতাংশ বেশি পড়বে।
এই দামের পার্থক্য নিয়েই বাংলাদেশে সমালোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ ঘাটতি, লোডশেডিং এবং বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের সময়ে তুলনামূলক বেশি দামে বিদ্যুৎ কেনার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এক পয়সার চার্জ নিয়েও আপত্তি করেছিল বাংলাদেশ
চীনের প্রকল্পের বিদ্যুতের তুলনামূলক বেশি দামের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে আরও একটি কারণে। সীমান্তপথে বিদ্যুৎ লেনদেন ও গ্রিড-সংক্রান্ত ব্যয়ের জন্য ভারত প্রতি ইউনিটে মাত্র এক পয়সা চার্জ নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। এতে আপত্তি জানিয়েছিল বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড বা বিপিডিবি।
ভারতের সেন্ট্রাল ইলেকট্রিসিটি রেগুলেটরি কমিশন, অর্থাৎ সিইআরসি, এই চার্জের প্রস্তাব দেওয়ার পর বাংলাদেশ আপত্তি জানায়। পরে ভারত প্রস্তাবিত চার্জ কমিয়ে অর্ধেক পয়সা করার প্রস্তাব দেয়। এর বিপরীতে আমিনবাজার প্রকল্পের বিদ্যুতের জন্য প্রতি ইউনিটে ২৫ টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে বাংলাদেশে সমালোচনা আরও জোরালো হয়েছে।
৪২ মেগাওয়াট প্রকল্পের চুক্তি ২৫ বছরের
আমিনবাজারের প্রকল্পটির উৎপাদন ক্ষমতা নির্ধারণ করা হয়েছে ৪২ মেগাওয়াট। এর আওতায় বাংলাদেশ ২৫ বছরের জন্য বিদ্যুৎ কেনার চুক্তি করেছে। প্রকল্পটি বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে। অর্থাৎ ঢাকার বিভিন্ন এলাকার পৌর বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে তা বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা হবে।
প্রকল্পটি ভারতের কাছ থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের সরাসরি বিকল্প নয়। তবে একই সময়ে তুলনামূলক বেশি দামে বিদ্যুৎ কেনার সিদ্ধান্তের কারণে এর অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বিদ্যুৎ সংকটের মধ্যে চুক্তি নিয়ে বিরোধিতা
বর্তমানে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতি, বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে চীনের প্রকল্প থেকে তুলনামূলক বেশি দামে বিদ্যুৎ কেনার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করছেন অনেকে। ঢাকায় এ চুক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদও হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে সমালোচনার মধ্যেও চায়না মেশিনারি ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন, অর্থাৎ সিএমইসি-কে যুক্ত করে প্রকল্পটি এগিয়ে নিচ্ছে বাংলাদেশ সরকার।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনাতেও সমাধানের আশা
আমিনবাজারের এই প্রকল্পের আরেকটি উদ্দেশ্য ঢাকার ক্রমবর্ধমান বর্জ্য সমস্যার মোকাবিলা করা। প্রায় ২ কোটি ৩০ লাখ মানুষের শহর ঢাকায় প্রতিদিন আনুমানিক ৮ হাজার মেট্রিক টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। প্রকল্পে এসব বর্জ্য ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্পটির সমর্থকদের মতে, এতে একদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে, অন্যদিকে ঢাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ওপর চাপও কিছুটা কমবে।
এদিকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামোতে চীনের অংশগ্রহণও ক্রমেই বাড়ছে। তিস্তা নদীভিত্তিক জলবিদ্যুৎসহ বিভিন্ন প্রকল্পে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পৃক্ততা রয়েছে। আমিনবাজারের বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পের মাধ্যমে ভবিষ্যতে মিয়ানমারেও বিদ্যুৎ সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে তুলনামূলক সস্তা ভারতীয় বিদ্যুতের পাশাপাশি বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে চীনের প্রভাবও আরও বাড়তে পারে।