বাংলাদেশ

‘আওয়াজ’ প্ল্যাটফর্ম

বাংলাদেশে দুই দিনে যৌন নিপীড়নের ৭৮ অভিযোগ, বেশিরভাগই মাদ্রাসার

  • 2:04 am - September 10, 2026
  • পঠিত হয়েছে:১৬ বার
মাদ্রাসায় যৌন নির্যাতন নিয়ে উদ্বেগ। ।ছবিঃ সংগৃহীত

“খুবই ছোটকালে শুরু, লজিং হুজুর সকালে পড়া থেকে তাড়াতাড়ি ছুটি দেওয়ার লোভ দেখিয়ে…। হুজুরের পরিবর্তন হয় কিন্তু আমার ভাগ্যের পরিবর্তন হতো না। মাদ্রাসার বোডিং এ বড় ভাইরাও আমাকে তাদের খাদ্য তালিকায় রেখেছিলো। তবে আলহামদুলিল্লাহ, ঢাকায় পড়াকালীন কোন হুজুর আমাকে তাদের খাদ্য তালিকায় রাখে নাই। পরবর্তীতে দাওরা শেষ করে হঠাত আপন বিবাহিত চাচাতো ভাইর (বয়স প্রায়-৪৫/৫০) খাদ্য তালিকায় চলে আসি। তবে সেখানে আমার কিছুটা মৌন সমর্থন ছিল। তখন আমার বয়স ২১/২২ হবে।”

এভাবেই ‘আওয়াজ ডট বিডি’ নামের একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে শৈশবে ঘটে যাওয়া যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়ার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন একজন বেনামী ভুক্তভোগী।

আওয়াজ প্লাটফর্মে এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, “বর্তমানে আমি বিবাহিত বয়স প্রায়-৩৫ বছর। এখন স্ত্রীর সাথে প্রাইভেট সময় কাটাতে গেলে ছোটকালের সেই বিশ্রী অতীত চোখের সামনে ভেসে আসে। সেই ট্রমাট্রাইজড বাচ্চাকাল থেকে বের হতে আমার সাইকোথেরাপিস্টের কাছে নিয়মিত যেতে হচ্ছে। ৫টা সেশন শেষ করেও আমি স্বাভাবিক হতে পারছি না। বউর সাথে প্রাইভেট সময় কাটাতে গেলে মনের মধ্যে সেই বিশ্রী অতীত ঝেঁকে বসে। সাইকোথেরাপিস্ট বলেছেন, ১০ এর অধিক সেশন নিতে হবে। বাহিরে আছি এজন্য হয়তো, ডাক্তারের কাছে সবকিছু খোলাখুলি বলতে পারছি। দেশে থাকলে তো তাও সম্ভব হতো না। দেশের ডাক্তাররা এতো গোপনতা রক্ষা করেন না।যদিও বিয়ের প্রথম ২বছর স্বাভাবিক ছিলাম।”

২ দিনে ৭৮টি যৌন নিপীড়নের অভিযোগ

বাংলাদেশে, বিশেষত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে, শিশু যৌন নিপীড়নের প্রকৃত মাত্রা বোঝাতে গত ৭ সেপ্টেম্বর বিকেলে চালু হয় আওয়াজ ডট বিডি

প্ল্যাটফর্মটিতে প্রবেশ করলে স্ক্রিনে ভেসে ওঠে ‘আওয়াজ উঠাও’ লেখা। সঙ্গে বলা হয়েছে, ‘আপনার নীরবতা অপরাধকে প্রশ্রয় দেয়, আপনার তথ্য অপরাধ দমনে সহায়তা করে।’ উদ্যোক্তাদের ভাষ্য, মানুষের দেওয়া বেনামি তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশে, বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয়, শিশুদের নিপীড়নের প্রকৃত মাত্রা বোঝার চেষ্টা করা হচ্ছে। এখানে কোনো নাম, ছবি বা পরিচয় প্রকাশ করা হয় না। কোনো কুকি বা ট্র্যাকিং করা হয় না এবং ব্যবহারকারীর কোনো তথ্য সংরক্ষণ করা হয় না।

গত ৭ সেপ্টেম্বর বিকেলে প্ল্যাটফর্মটি চালুর পর ৯ সেপ্টেম্বর বিকেল ৪টা পর্যন্ত মোট ৭৮টি রিপোর্ট জমা পড়েছে। রিপোর্টের সংখ্যা সময়ের সাথে সাথে বাড়ছে।  প্ল্যাটফর্মটির উদ্যোক্তারা বলছেন, মূলত ছেলেশিশুদের যৌন নিপীড়নের ঘটনা সামনে আনার লক্ষ্যেই প্ল্যাটফর্মটি তৈরি করা হয়েছিল। তবে চালুর পর মেয়েরাও এতে সাড়া দিচ্ছেন। তাঁরাও শিশু বয়সে যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরছেন।

একজন ভুক্তভোগী লিখেছেন, “ক্লাস ফাইভের সময় বাবার ইচ্ছে হয়েছিল ছেলেকে আলেম বানাবে। শহরের এক মাদ্রাসায় ভর্তি করে দিয়ে এসেছিল। এসব তখন বুঝতাম না। একদিন মাদ্রাসায় একটা বাৎসরিক অনুষ্ঠান ছিল, শুতে হয়েছিল এলোমেলো ভাবে বড় ছোট মিলিয়ে। সকালে উঠে দেখি পাজামার পায়ের কাছে কি যে কফ ফেলে রেখেছে। ওটা কফ ছিল না। তার কয়েক দিন পর, মাদ্রাসায় দুপুরে ঘুমাবার নিয়ম ছিল। এক বড় ছাত্র, সে তখন অনেক বড় বিভাগের , নাম ভুলে গেছি ওটাকে কি বলে, তার পাশে শুতে বলল। না করব কীভাবে বা কেনই বা না করতে হবে বুঝি নি। শুয়েছিলাম। একটু পর দেখি পিছনে সেই স্পর্শ অস্বস্তি লাগছিল প্রস্রাব করতে হবে বলে পালিয়ে চলে আসি। পরে বাবাকে বলার পর বাবা গিয়ে হুজুরদের বিচার দেয়। আর আমাকে নিয়ে চলে আসে। ওই ছাত্র আলেমের কিছু হয়নি।”

আরেকজন ভুক্তভোগী লিখেছেন, “৬ষ্ঠ শ্রেণীতে পড়াকালীন আবাসিক স্কুলের হুজুর মারধোর করে জোর করে শারিরিক সম্পর্ক করতো। ভয়ে কাউকে বলা যেত না। এখন পর্যন্ত বলাৎকার এর কোন নিউজ দেখলে ছোট বেলার সেই বিভৎস কথা মনে পড়ে।”

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন নিপীড়নের ৬৪ শতাংশই কওমী মাদ্রাসায়

৯ সেপ্টেম্বর বিকাল ৪টা পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সংঘটিত ঘটনাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘটনা ঘটেছে কওমি মাদরাসায়।  এসব প্রতিষ্ঠানে মোট ২৫টি ঘটনার মধ্যে কওমি মাদরাসায় ঘটেছে ১৬টি, যা মোট ঘটনার ৬৪ শতাংশ। এছাড়া স্কুলে ৪টি (১৬ শতাংশ), মসজিদে ৩টি (১২ শতাংশ), ইউনিভার্সিটি ও আলিয়া মাদরাসায় একটি করে (৪ শতাংশ) ঘটনা ঘটেছে। কলেজ, মন্দির ও প্যাগোডায় কোনো ঘটনা এখনো পর্যন্ত রিপোর্ট হয়নি।

অপরাধী কে ছিল

অপরাধীর সঙ্গে ভুক্তভোগীর সম্পর্কের ক্ষেত্রে ছেলে ও মেয়ে ভুক্তভোগীদের মধ্যে কিছু পার্থক্য দেখা যায়। ছেলে ভুক্তভোগীদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি, ২১টি ঘটনায় (৩৮ শতাংশ) অপরাধী ছিলেন পরিচিত ব্যক্তি। এরপর ১২টি ঘটনায় (২১ শতাংশ) বিশ্বস্ত পরিচিত, ৭টি করে ঘটনায় (১৩ শতাংশ) নিকটাত্মীয় ও অন্যান্য ব্যক্তি, ৫টি ঘটনায় (৯ শতাংশ) অপরিচিত এবং ৪টি ঘটনায় (৭ শতাংশ) দূর সম্পর্কের আত্মীয় জড়িত ছিলেন। অন্যদিকে, মেয়ে ভুক্তভোগীদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ৮টি ঘটনায় (৩৬ শতাংশ) অপরাধী ছিলেন দূর সম্পর্কের আত্মীয়। এছাড়া পরিচিত, বিশ্বস্ত পরিচিত ও নিকটাত্মীয়—প্রতিটি ক্ষেত্রে ৩টি করে (১৪ শতাংশ) এবং অন্যান্য ৪টি (১৮ শতাংশ) ও অপরিচিত একজন (৫ শতাংশ) অপরাধী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এখানে ছেলে ও মেয়ের হিসাব আলাদাভাবে তাদের নিজ নিজ মোট সংখ্যার ভিত্তিতে করা হয়েছে।

৯ সেপ্টেম্বর বিকাল ৪টা পর্যন্ত মোট ৭৮টি ঘটনা রিপোর্ট করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ শতাংশ ঘটনায় নিকটাত্মীয় জড়িত ছিলেন। অর্থাৎ, প্রতি পাঁচজন ভুক্তভোগীর মধ্যে প্রায় একজন পরিবারের ভেতরের কারও দ্বারা আক্রান্ত হয়েছেন। শুধু মেয়ে ভুক্তভোগীদের হিসাব করলে নিকটাত্মীয়ের দ্বারা সংঘটিত ঘটনার হার ১৪ শতাংশ। বয়সের হিসাবে ১০ থেকে ১২ বছর বয়সীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে ছিল। জেলা হিসেবে সবচেয়ে বেশি ১৫টি রিপোর্ট এসেছে ঢাকা থেকে।

রুমে ডেকে বলাৎকার, পালিয়ে বেরাচ্ছেন রংপুরের এক মাদ্রাসা শিক্ষক। ছবিঃ সংগৃহীত

কীভাবে শুরু, কীভাবে চলল

ঘটনাগুলো কীভাবে শুরু হয়েছিল এবং পরে তা একবার, একাধিকবার নাকি দীর্ঘদিন চলেছে—এমন তথ্যও সংগ্রহ করা হয়েছে। মোট ৭৮টি ঘটনার মধ্যে ৩৩টির (৪২ শতাংশ) ক্ষেত্রে কীভাবে শুরু হয়েছিল, তা জানা যায়নি। ২৮টি ঘটনায় (৩৬ শতাংশ) ক্ষমতা বা কর্তৃত্বের অপব্যবহারের বিষয়টি পাওয়া গেছে। আর ১৭টি ঘটনায় (২২ শতাংশ) প্রথমে জোরপূর্বক শুরু হওয়ার পর ভয়ের কারণে তা চলতে থাকে। যেসব ঘটনার শুরু সম্পর্কে তথ্য জানা যায়নি, সেগুলোর মধ্যে ৪৫ শতাংশ একবার, ৪৫ শতাংশ একাধিকবার এবং ৯ শতাংশ দীর্ঘমেয়াদি ছিল।

কোন বয়সে বেশি

ভুক্তভোগীর বয়স বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১০ থেকে ১২ বছর বয়সীদের মধ্যেই সবচেয়ে বেশি ঘটনা রিপোর্ট হয়েছে। এই বয়সের ভুক্তভোগীর সংখ্যা ২৫, যা মোট রিপোর্টের ৩২ শতাংশ। এরপর ৭ থেকে ৯ বছর বয়সীদের মধ্যে ২০টি (২৬ শতাংশ) ঘটনা ঘটেছে। ৪ থেকে ৬ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে ৮টি (১০ শতাংশ), ১৩ থেকে ১৫ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে ৮টি (১০ শতাংশ), ১৯ থেকে ৩০ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে ১০টি (১৩ শতাংশ) এবং ৩১ থেকে ৫০ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে ৩টি (৪ শতাংশ) ঘটনা রিপোর্ট হয়েছে। ১৬ থেকে ১৮ বছর বয়সীদের মধ্যে ২টি এবং ৫১ থেকে ৭০ বছর বয়সীদের মধ্যে ২টি ঘটনা পাওয়া গেছে। ০ থেকে ৩ বছর এবং ৭০ বছরের বেশি বয়সীদের ক্ষেত্রে কোনো রিপোর্ট নেই।

ঘটনাস্থলের হিসাবে বাসা বাড়ি ছাড়াও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দিক দিয়ে সবচেয়ে বেশি ঘটনা মাদ্রাসায়। এছাড়াও, জেলাভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি রিপোর্ট পাওয়া গেছে ঢাকা জেলায়। সেখানে মোট ১৫টি ঘটনা রিপোর্ট হয়েছে। এরপর চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, নারায়ণগঞ্জ ও নোয়াখালী—এই চার জেলায় ৫টি করে ঘটনা রিপোর্ট হয়েছে। বাগেরহাট ও কুমিল্লায় ৩টি করে ঘটনা পাওয়া গেছে।

কতবার ঘটেছে

ঘটনার পুনরাবৃত্তির হিসাবে দেখা যায়, ৭৮টি রিপোর্টের মধ্যে ৩৬ শতাংশ ঘটনা একবার ঘটেছে। ৪৯ শতাংশ বা ৩৮টি ঘটনা ঘটেছে একাধিকবার এবং ১৫ শতাংশ ঘটনা ছিল দীর্ঘমেয়াদি। অর্থাৎ, একবারের চেয়ে একাধিকবার সংঘটিত ঘটনার সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি।

দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবের কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা

শিশু বয়সে যৌন নিপীড়নের শিকার হলে এর দীর্ঘমেয়াদি নানা ধরনের প্রভাব পড়তে পারে বলে জানান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিকাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক কামাল উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী ।

তিনি বলেন, বিশেষ করে কওমি মাদ্রাসায় আমরা যেসব ঘটনা দেখতে পাচ্ছি, সেখানে মূলত ছেলেশিশুরাই ভুক্তভোগী। বিভিন্ন বয়সের শিশু এসব ঘটনার শিকার হলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তারা কৈশোরে পৌঁছানোর আগেই নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। মনোবিজ্ঞানের দিক থেকে দেখলে, যৌন নিপীড়নের শারীরিক ক্ষত সময়ের সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে সেরে উঠতে পারে। কিন্তু মানসিক আঘাত দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। কোনো শিশু যদি ঘটনাটিকে অত্যন্ত কষ্টদায়ক অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখে, তাহলে সেটি তার জীবনে ট্রমা হিসেবে থেকে যেতে পারে। এর ফলে পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ধরনের মানসিক ও সামাজিক সমস্যা তৈরি হতে পারে।

তিনি বলেন, শৈশবে ট্রমার মধ্য দিয়ে যাওয়া শিশুদের পরবর্তী জীবনে ব্যক্তিত্বের ওপরও প্রভাব পড়তে পারে। তারা যদি মনে করে যে তারা নির্যাতিত হয়েছে এবং তাদের রক্ষা করার জন্য কেউ এগিয়ে আসেনি, তাহলে হতাশা বা বিষণ্নতার মতো মানসিক সমস্যাও দেখা দিতে পারে। আবার কেউ কেউ এমন ধারণাও তৈরি করতে পারে যে, ক্ষমতাবানদের হাতে যেহেতু সে নির্যাতিত হয়েছে, ভবিষ্যতে নিজে ক্ষমতাবান হলে অন্যের ওপর একই ধরনের আচরণ করবে।

এ ছাড়া শৈশবের যৌন নিপীড়নের অভিজ্ঞতা একজন মানুষের ভবিষ্যৎ যৌন ও সামাজিক সম্পর্কের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে বলে জানান এই অধ্যাপক।

তিনি বলেন, প্রাথমিক যৌন অভিজ্ঞতা যদি নিপীড়নের মাধ্যমে হয়, তাহলে কেউ কেউ সেটিকে ভুলভাবে স্বাভাবিক অভিজ্ঞতা হিসেবে গ্রহণ করতে পারে। এর ফলে ভবিষ্যৎ সম্পর্কের ক্ষেত্রে তার আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গিতে জটিলতা তৈরি হতে পারে। তবে এমন অভিজ্ঞতার কারণে কেউ সমকামী হয়ে যাবে—বিষয়টি এমন নয়। যৌন অভিমুখিতার পেছনে বিভিন্ন ধরনের জৈবিক ও জেনেটিক কারণ থাকতে পারে। তবে শৈশবের নিপীড়নের অভিজ্ঞতা ভবিষ্যৎ সম্পর্কের ক্ষেত্রে একজন মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণে প্রভাব ফেলতে পারে।

অধ্যাপক কামাল উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী বলেন, এই ধরনের ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হলেও এটি নতুন কোনো সমস্যা নয়। দীর্ঘদিন ধরেই এ ধরনের ঘটনা ঘটে আসছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে এখন বিষয়গুলো তুলনামূলকভাবে বেশি সামনে আসছে এবং অভিভাবকেরাও আগের চেয়ে সচেতন হচ্ছেন।

কওমি মাদ্রাসার আবাসিক ব্যবস্থার মধ্যেও বড় ধরনের সমস্যা রয়েছে বলে তিনি মনে করেন। অল্প জায়গায় অনেক শিশুকে একসঙ্গে রাখা হয়। পাশাপাশি মাদ্রাসার শিক্ষক বা সিনিয়রদের বিভিন্ন ব্যক্তিগত কাজে শিশুদের ব্যবহার করার ঘটনাও রয়েছে। পড়াশোনা ও ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি অনেক শিশুকে গা-হাত-পা টিপে দেওয়া বা বিভিন্ন ধরনের ব্যক্তিগত কাজ করতে হয়। এ ধরনের পরিবেশে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে এবং সেখানে নিপীড়নের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তাঁর মতে, যতটা সম্ভব আবাসিক ব্যবস্থা নিরুৎসাহিত করা উচিত। যদি তা সম্ভব না হয়, তাহলে অন্তত এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কার্যকর নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। নিয়মিত সেখানে খোঁজখবর নেওয়া এবং শিশুদের আলাদাভাবে তাদের নিরাপত্তা ও অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের এই সংস্কৃতির কারণে যারা শিশুদের ওপর যৌন নিপীড়ন চালায়, তাদেরও একটি শক্ত নেটওয়ার্ক থাকতে পারে। তারা অনেক সময় একে অন্যকে রক্ষা করে এবং ঘটনা গোপন রাখার চেষ্টা করে।

অনেক ক্ষেত্রে মাদ্রাসার ভেতরে কর্তৃপক্ষ ঘটনাটি জানার পর অভিযুক্ত শিক্ষককে শুধু প্রতিষ্ঠান থেকে বের করে দেওয়া হয়, কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো শাস্তিমূলক বা আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। ফলে ওই ব্যক্তি পরে অন্য কোনো মাদ্রাসায় চাকরি নিয়ে একই ধরনের ঘটনায় জড়াতে পারেন। এ কারণে শুধু কোনো শিক্ষককে একটি মাদ্রাসা থেকে বের করে দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। তাঁদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া এবং কোথাও নতুন করে নিয়োগ দেওয়ার আগে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ বা আগের কোনো ঘটনার রেকর্ড আছে কি না, তা যাচাই করা জরুরি।

তিনি মনে করেন, কওমি মাদ্রাসার আবাসিক ব্যবস্থাটি নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। মাদ্রাসার শিক্ষকদের সবাই খারাপ—এমনটি তিনি মনে করেন না। বরং যারা ভালো এবং শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী, তাঁদের সহযোগিতা নিয়ে কীভাবে আবাসিক ব্যবস্থার ঝুঁকি কমানো যায়, সে বিষয়ে উদ্যোগ নিতে হবে।

তিনি বলেন, কার্যকর নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে এ ধরনের ঘটনা বন্ধ করা কঠিন হবে। বরং বিষয়টি পাশ কাটিয়ে গেলে ভবিষ্যতে যারা এ ধরনের অপরাধ করে, তারা আরও সতর্কভাবে নিজেদের আড়াল করে একই ধরনের ঘটনা ঘটাতে পারে। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

প্ল্যাটফর্মটির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য

‘আওয়াজ ডট বিডি’ তৈরির পেছনে কাজ করেছেন রাকিবুল হাসান ও সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর নামের দুই তরুণ। রাকিবুল হাসান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষ করেছেন। বর্তমানে তিনি অনলাইনে উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করছেন। সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে এমফিল করছেন এবং একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন।

প্ল্যাটফর্মটির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানতে চাইলে রাকিবুল হাসান দ্য ডিসেন্টকে জানান, শুরু থেকেই তাঁদের লক্ষ্য ছিল ম্যাস লেভেলে ধারাবাহিক সচেতনতা তৈরি করা, বিশেষ করে কওমি মাদ্রাসায় শিশুদের যৌন নিপীড়নের ঘটনাগুলো নিয়ে। তাঁর ভাষ্য, একটি ঘটনা ঘটার পর সেটি কিছুদিন আলোচনায় থাকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়, এরপর আবার চাপা পড়ে যায়। পরে আরেকটি ঘটনা ঘটলে একইভাবে আলোচনা শুরু হয়। ‘আওয়াজ ডট বিডি’র অন্যতম উদ্দেশ্য হলো এই চক্র থেকে বের হয়ে বিষয়টিকে ধারাবাহিক আলোচনার মধ্যে রাখা।

তিনি বলেন, তাঁদের মূল লক্ষ্য কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড ও সরকারকে এ বিষয়ে সক্রিয় করা। পর্যাপ্ত মানুষ যদি তাঁদের অভিজ্ঞতা ও তথ্য জানান, বিষয়টি নিয়ে আলোচনা ও সংবাদ প্রকাশ হয়, তাহলে কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড এবং সরকার এ বিষয়ে আরও সচেতন হবে বলে তাঁরা মনে করেন। একই সঙ্গে শিশুদের যৌন নিপীড়ন বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতাও সরকারের রয়েছে।

রাকিবুল হাসান বলেন, সরকার চাইলে এ বিষয়ে আইন করতে পারে। একইভাবে কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডগুলো মাদ্রাসা পরিচালনা, শিক্ষক নিয়োগ এবং শিক্ষকদের বিষয়ে নীতিমালা তৈরি করতে পারে। শিক্ষকদের বিরুদ্ধে আগে বা পরে কোনো অভিযোগ রয়েছে কি না, সে বিষয়ে একটি তথ্যভান্ডার বা পোর্টফোলিও তৈরি করাও সম্ভব। তাঁর মতে, সরকারের বড় বাজেট ও অবকাঠামো রয়েছে, ফলে এসব ব্যবস্থা নেওয়া তাদের জন্য সম্ভব।

তিনি বলেন, সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সক্রিয় করা, তাদের ওপর সামাজিক চাপ তৈরি করা এবং এ বিষয়ে গণসচেতনতা বাড়ানোই ‘আওয়াজ ডট বিডি’র মূল উদ্দেশ্য।

সূত্রঃ দ্য ডিসেন্ট

এই শাখার আরও খবর

লাইফ সাপোর্টে মেঘমল্লার বসু

বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি ও ন্যাশনাল পিপলস অ্যাকশন (এনপিএ)-এর কেন্দ্রীয় কাউন্সিল সদস্য মেঘমল্লার বসু ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে রয়েছেন। শারীরিক অবস্থার অবনতি…

সহযোগী ন্যাটালি হার্পকে ৪৫ হাজার ডলার নগদ উপহার ট্রাম্পের

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর তিন সহযোগীকে ৪৫ হাজার ডলার করে নগদ উপহার দিয়েছেন। সম্প্রতি প্রকাশিত সরকারি আর্থিক নথিতে এ তথ্য উঠে এসেছে বলে জানিয়েছে…

চুরির অভিযোগে তরুণীকে শেকল দিয়ে রাস্তায় হাঁটানোর ভিডিও ভাইরাল

সিলেট নগরের শাহজালাল উপশহর এলাকায় চুরির চেষ্টার অভিযোগে এক তরুণীকে কোমরে শেকল ও তালা দিয়ে বেঁধে রাস্তায় হাঁটানোর অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক…

মাদ্রাসায় না ফেরায় বাড়ি থেকে ধরে এনে ছাত্রকে পিটুনি

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে মাদ্রাসায় ফিরে না যাওয়ায় ১১ বছরের এক ছাত্রকে বাড়ি থেকে ধরে এনে বেত দিয়ে অমানবিকভাবে মারধরের অভিযোগ উঠেছে এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে। মারধরে আব্দুল্লাহ…

সালমান শাহ হত্যা মামলায় ডনের বিরুদ্ধে মিলছে প্রমাণ: সিআইডি

চিত্রনায়ক সালমান শাহ হত্যা মামলায় খলনায়ক আশরাফুল হক ডনের আচরণ ও চালচলন বিশ্লেষণ করে হত্যাকাণ্ডে তার জড়িত থাকার বিষয়ে বেশ কিছু তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে বলে…

২২ বছরের সোফিয়াকে হত্যার পর দুর্ঘটনার নাটক, বাবা-ভাই গ্রেপ্তার

ভারতের আহমেদাবাদে ২২ বছর বয়সী এক তরুণীকে ‘সম্মান রক্ষার’ নামে বাবা ও ভাই হত্যা করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। হত্যার পর ঘটনাটি সড়ক দুর্ঘটনা হিসেবে দেখানোর…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au