বাংলাদেশ

জিন্নাহকে ‘শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায়’ স্মরণ করল হাদির ইনকিলাব মঞ্চ, দেশজুড়ে সমালোচনা

  • 12:43 am - September 13, 2026
  • পঠিত হয়েছে:১৯৮ বার
জিন্নাহকে ‘শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায়’ স্মরণ করল হাদির ইনকিলাব মঞ্চ, দেশজুড়ে সমালোচনা। ছবিঃ সংগৃহীত

ভাষা আন্দোলনের বিরোধিতার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহকে ‘শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায়’ স্মরণ করেছে শহীদ শরীফ ওসমান হাদির প্রতিষ্ঠিত সংগঠন ‘ইনকিলাব মঞ্চ’। শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) রাতে সংগঠনটির ফেসবুক পেজে জিন্নাহর একটি সাদাকালো ছবি প্রকাশ করে তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী স্মরণ করা হয়। পোস্টটি প্রকাশের পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয়েছে তীব্র সমালোচনা।

ইনকিলাব মঞ্চের পোস্টে জিন্নাহকে ‘উপমহাদেশের অন্যতম রাজনীতিবিদ, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রভাবশালী নেতা’, ‘দ্বিজাতিতত্ত্বের প্রবক্তা’, পাকিস্তান রাষ্ট্রের অন্যতম স্বপ্নদ্রষ্টা এবং দেশটির প্রথম গভর্নর জেনারেল হিসেবে উল্লেখ করা হয়। পোস্টের সঙ্গে জিন্নাহর জন্ম ও মৃত্যুর তারিখও দেওয়া হয়েছে, ২৫ ডিসেম্বর ১৮৭৬ থেকে ১১ সেপ্টেম্বর ১৯৪৮।

পোস্টের সঙ্গে দেওয়া বার্তায় বলা হয়, ‘উপমহাদেশের অন্যতম রাজনীতিবিদ, দ্বিজাতিতত্ত্বের প্রবক্তা, পাকিস্তান রাষ্ট্রের অন্যতম স্বপ্নদ্রষ্টা ও পাকিস্তানের প্রথম গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ।’

পাকিস্তানের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৮৭৬ সালের ২৫ ডিসেম্বর করাচিতে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৪৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর মারা যান। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর তিনি দেশটির প্রথম গভর্নর জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

তবে বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে জিন্নাহর রাজনৈতিক ভূমিকা বিশেষভাবে বিতর্কিত। ১৯৪৮ সালের মার্চে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল হিসেবে ঢাকায় এসে রেসকোর্স ময়দান ও কার্জন হলে দেওয়া বক্তব্যে তিনি উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে অবস্থান নেন। তাঁর এই অবস্থানের প্রতিবাদে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্রসমাজ ও বাঙালি জনগণের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনই ১৯৫২ সালের ঐতিহাসিক রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে রূপ নেয়।

ফলে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে যে রাজনৈতিক অবস্থানের বিরুদ্ধে বাঙালিরা রাজপথে নেমেছিল, সেই অবস্থানের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিকে বর্তমান বাংলাদেশের একটি সংগঠনের পক্ষ থেকে ‘গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায়’ স্মরণ করার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।

সমালোচকদের মতে, ইতিহাসের কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে তাঁর সামগ্রিক ভূমিকা বিবেচনা করা প্রয়োজন। বিশেষ করে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও জাতিসত্তার বিকাশের ইতিহাসে ভাষা আন্দোলনের গুরুত্ব বিবেচনায় জিন্নাহর ভাষানীতি ও তৎকালীন রাজনৈতিক অবস্থানকে পাশ কাটিয়ে তাঁকে কেবল একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে প্রশংসা করা ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে আড়াল করার ঝুঁকি তৈরি করে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইনকিলাব মঞ্চের পোস্ট নিয়ে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। পলাশ সাহা লিখেছেন, ‘নাতিরা দাদাকে স্মরণ করবে, অবাক হওয়ার কী আছে?’

সাঈদ সাইদুল ইসলাম লিখেছেন, ‘তারই তো ওয়ারিশ! যেহেতু ওয়ারিশ, সেহেতু স্মরণ করবে, দোয়া করবে, এটাই তো স্বাভাবিক বিষয়! তাই নয় কি? এটা নিয়ে লেখালেখির কী আছে!’

রাশেদ মোহাম্মদ মন্তব্য করেছেন, ‘১৯৭১ সালে বীজ রোপণ করে গেছে, সে বীজ থেকে ২০২৪ সালে এসে চারা গজাল। সেই চারা থেকে দুই বছর পর ফলন আশা শুরু হচ্ছে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও ডাকসুর ভিপি প্রার্থী শামিম হোসেনও বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘১৬ ডিসেম্বরকে শোক দিবস হিসেবে পালন করা বাকি। রাতে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান বলে দাবি করে, সকালে স্বাধীনতার বিরোধিতা। ঐতিহাসিক গ্লানির ঘাম মুছতে বড় মূর্খের মতো মনে হয়?’

জিন্নাহকে স্মরণ করার ঘটনাকে ঘিরে এই বিতর্ক শুধু একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে স্মরণ করার বিষয়েই সীমাবদ্ধ থাকছে না। বরং বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে বর্তমান সময়ে বিভিন্ন পক্ষের অবস্থানও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

একদিকে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের নানা দিক থেকে মূল্যায়নের সুযোগ থাকা উচিত বলে মত রয়েছে। অন্যদিকে সমালোচকদের প্রশ্ন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও জাতিসত্তার বিকাশের সঙ্গে সাংঘর্ষিক রাজনৈতিক অবস্থানের জন্য যাঁরা ঐতিহাসিকভাবে সমালোচিত, তাঁদের প্রতি ‘শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা’ প্রকাশ করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সংগঠনের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক অবস্থান কী, সেটিও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

এই শাখার আরও খবর

উত্তরার অলিগলিতে চীনা নাগরিকদের টানা লাইভ, ঘরে ঢুকেও ভিডিও ধারণ; বিভ্রান্তিতে স্থানীয়রা

ঢাকার উত্তরার বিভিন্ন এলাকায় মাসের পর মাস ধরে লাইভ ভিডিও ধারণ করছেন একদল চীনা নাগরিক। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত রাস্তাঘাট, দোকানপাট, আবাসিক এলাকা এমনকি মানুষের…

ঢাকায় রাতভর ককটেল বিস্ফোরণ, আতঙ্কে নগরবাসী

ওটিএন বাংলা রিপোর্ট :   রাজধানী ঢাকায় এক রাতেই অন্তত পাঁচটি এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার (৬ নভেম্বর) সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত খিলগাঁও, আদাবর,…

আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের প্রভাব পোশাকশিল্পে, শ্রমিক আন্দোলন দমনে ব্যবহৃত হচ্ছে দলীয় পরিচয়!

বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত এখন পোশাকশ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির দাবিতে আন্দোলন দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। রাজনৈতিক অংশগ্রহণের অধিকার সংকুচিত…

বাংলাদেশের পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন, নৈতিকভাবে পোশাক কেনার আহ্বান অস্ট্রেলিয়ায়

বাংলাদেশে পোশাকশ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও উন্নত কর্মপরিবেশের দাবিতে আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক পোশাক ব্র্যান্ডগুলোর সরবরাহব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বৈশ্বিক পোশাকশিল্পের সরবরাহব্যবস্থায় শ্রমিকদের শোষণের ঝুঁকি…

শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বাড়ির সাইনবোর্ড ভাঙল এনসিপি নেতারা

ওটিএন বাংলা ডেস্ক :  ভাষাসৈনিক ও শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের কুমিল্লার ঐতিহাসিক বাসভবনের সামনে স্থাপিত সাইনবোর্ড ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতারা।…

৭ নভেম্বর: সংহতির আড়ালে বিভাজন

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মানুষ শুধু একটি ভূখণ্ডের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেনি। সেই সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত ছিল বাঙালির রাজনৈতিক অধিকার, ভাষা ও সংস্কৃতির মর্যাদা, অর্থনৈতিক মুক্তি…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au