ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজে গান-নাচ নিয়েও মৌলবাদীদের আপত্তি। ছবিঃ সংগৃহীত
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজে নবীনবরণ অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে আপত্তি তুলেছে জেলা কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদ। আগামী ১৪ সেপ্টেম্বর কলেজে নবীনবরণ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও সংগঠনটি সেখানে ‘গানবাজনা ও নাচানাচি’ না করার দাবি জানিয়েছে। এমনকি অনুষ্ঠান স্থগিতের দাবিতে কলেজের অধ্যক্ষসহ স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের কাছে স্মারকলিপিও দিয়েছে তারা।
ঘটনাটি শুধু একটি কলেজের একটি অনুষ্ঠান নিয়ে বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের স্বাধীনতা, ধর্মীয় মূল্যবোধের নামে অন্যদের সাংস্কৃতিক চর্চায় হস্তক্ষেপ এবং একটি গোষ্ঠীর আপত্তির কারণে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক সাংস্কৃতিক আয়োজন সীমিত করা হবে কি না, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।
এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয়েছে সমালোচনা। এর আগে গত রাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পুলিশ লাইনে কনসার্ট চলাকালে কয়েকশ মাদ্রাসাছাত্র ও শিক্ষক সেখানে গিয়ে ভাঙচুর চালান। তাঁদের অভিযোগ ছিল, রাতের কনসার্টের শব্দে তাঁদের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটছিল। তবে এবার দিনের বেলায় আয়োজিত একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নিয়েও আপত্তির খবর সামনে আসায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে প্রশ্ন তুলছেন, রাতের ঘুমের ব্যাঘাতের অভিযোগের পর কি দিনের সাংস্কৃতিক আয়োজনও তাদের জন্য আপত্তিকর? অনেকেই মন্তব্য করছেন, তারা কি দিনেও ঘুমান? কেউ কেউ আরও প্রশ্ন তুলছেন, এ ধরনের ধারাবাহিক আপত্তি কি শেষ পর্যন্ত দেশের সাংস্কৃতিক পরিসরকে সংকুচিত করে একটি মৌলবাদী রাষ্ট্রের দিকে ঠেলে দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করছে?
শনিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে জেলা কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদের সদস্য ফুযায়েল আহমেদ খানের স্বাক্ষরিত একটি স্মারকলিপি ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ওবায়দুর রহমানের কাছে দেওয়া হয়। একই দাবিতে শুক্রবার রাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সভাপতি খালেদ হোসেন মাহবুব এবং জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলামের কাছেও স্মারকলিপি দেওয়া হয়।
স্মারকলিপিতে বলা হয়, ১৪ সেপ্টেম্বর কলেজে নবীনবরণ উপলক্ষে কনসার্ট আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে তারা জানতে পেরেছেন। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নবীনদের বরণ আনন্দঘন ও উৎসবমুখর হওয়া স্বাভাবিক হলেও সেই আয়োজন যেন শিক্ষার পরিবেশ, সামাজিক শৃঙ্খলা, জননিরাপত্তা এবং এলাকার ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হয়, সে বিষয়টি বিবেচনায় রাখার দাবি জানানো হয়েছে।
তবে কলেজ কর্তৃপক্ষ বলছে, ‘কনসার্ট’ আয়োজনের কোনো ঘোষণা তারা দেয়নি। নবীনবরণের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।
কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ওবায়দুর রহমান বলেন, ১৪ সেপ্টেম্বর তিনটি ধাপে অনুষ্ঠান হবে। প্রথম ধাপে একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের নিয়ে নবীনবরণ, দ্বিতীয় ধাপে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং তৃতীয় ধাপে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি থাকবে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, সেখানে কোনো কনসার্ট হবে এমন ঘোষণা কলেজ কর্তৃপক্ষ দেয়নি। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করা হবে।
কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদের সদস্য ফুযায়েল আহমেদ খান বলেন, ‘সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বলতে কী বোঝায়, সেটা বুঝতে হবে। গানবাজনা ও নাচানাচি থাকলে আমাদের আপত্তি আছে। আমরা চাই না সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের নামে কলেজে গানবাজনা ও নাচানাচি হোক।’
তিনি দাবি করেন, এর আগেও কলেজে কনসার্ট হয়েছিল এবং সে সময় একজন তরুণী হয়রানির শিকার হয়েছিলেন। তাঁর দাবি, ওই ঘটনার পর কনসার্ট বন্ধ হয়ে যায়। এ বিষয়ে কলেজের অধ্যক্ষের সঙ্গে তাঁরা কথা বলেছেন এবং অধ্যক্ষ স্থানীয় সংসদ সদস্যের সঙ্গে পরামর্শ করে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
তবে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা বা শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার যুক্তি দেখিয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া এবং অনিয়ম বা হয়রানির ঘটনা ঘটলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এক বিষয় নয়। কোনো অনুষ্ঠানে হয়রানি বা বিশৃঙ্খলার অভিযোগ থাকলে তার সমাধান হওয়া উচিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার, অপরাধীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং আয়োজকদের দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে। তার পরিবর্তে গান, নাচ বা সাংস্কৃতিক আয়োজনকেই সমস্যার উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা হলে শিক্ষার্থীদের সাংস্কৃতিক অধিকার নিয়েই প্রশ্ন তৈরি হয়।
মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, একটি সরকারি কলেজে বিভিন্ন মত, বিশ্বাস ও সাংস্কৃতিক রুচির শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করেন। সেখানে একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় বা সামাজিক গোষ্ঠীর পছন্দ-অপছন্দের ভিত্তিতে অন্য শিক্ষার্থীদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নির্ধারিত হবে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ধর্মীয় মূল্যবোধ পালনের অধিকার যেমন রয়েছে, তেমনি অন্য শিক্ষার্থীদের আইনসম্মত সাংস্কৃতিক চর্চার অধিকারও থাকা প্রয়োজন।
কলেজ শাখা ছাত্রদলের সভাপতি শাহাদাত হোসেন বলেন, প্রায় চার বছর ধরে কলেজে নবীনবরণ অনুষ্ঠান হয় না। জেলা বিএনপির সভাপতি খালেদ হোসেন মাহবুবকে জানিয়ে তাঁরা এবার অনুষ্ঠান আয়োজনের উদ্যোগ নিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘ইসলামের প্রতি আমাদেরও শ্রদ্ধা ও সম্মান আছে। আমরা সমঝোতার মাধ্যমে বিষয়টি সমাধান করব। আমরা চাই না, জেলায় কোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হোক। কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদের প্রতিও আমাদের একই আহ্বান থাকবে। তবে আমরা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করব।’
ছাত্রদল নেতার এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, আয়োজকেরাও বিষয়টি সংঘাতের দিকে নিতে চান না। তবে একই সঙ্গে তাঁরা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের সিদ্ধান্তে অটল রয়েছেন।
এদিকে শুধু ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজের অনুষ্ঠানই নয়, সাম্প্রতিক সময়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে ধর্মীয় রক্ষণশীল গোষ্ঠীর আপত্তি ও বাধার ঘটনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
গত ১৮ আগস্ট রাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পুলিশের আয়োজিত একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষের পর অনুষ্ঠানটি পণ্ড হয়ে যায়। এর আগে গত ৩০ মে জেলা কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদের শিক্ষার্থীদের আপত্তির মুখে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমাটির প্রদর্শনী বন্ধ হয়ে যায়।
পরপর এসব ঘটনার ফলে প্রশ্ন উঠছে, কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নিয়ে আপত্তি থাকলে তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান হবে, নাকি একটি গোষ্ঠীর চাপের মুখে অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়ার প্রবণতা তৈরি হবে।
ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতি সম্মান দেখানো অবশ্যই সামাজিক সম্প্রীতির অংশ। কিন্তু সেই মূল্যবোধের ব্যাখ্যা যদি অন্যের সাংস্কৃতিক অধিকার নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তাহলে তা বহুত্ববাদী সমাজের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে। একজন ব্যক্তি কোনো গান, নাচ, সিনেমা বা সাংস্কৃতিক আয়োজন পছন্দ নাও করতে পারেন। কিন্তু ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত অপছন্দের কারণে অন্যদের বৈধ সাংস্কৃতিক চর্চা বন্ধ করে দেওয়ার দাবি কতটা গ্রহণযোগ্য, সেই প্রশ্ন এ ঘটনায় নতুন করে সামনে এসেছে।
অন্যদিকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের ক্ষেত্রেও কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব রয়েছে। অনুষ্ঠানটি যেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রেখে অনুষ্ঠিত হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, হয়রানি প্রতিরোধ, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং অনুষ্ঠানের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে অতীতের কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কাও কমানো সম্ভব।
সবশেষে বিষয়টি এখন কলেজ কর্তৃপক্ষ, শিক্ষার্থী এবং আপত্তি জানানো সংগঠনের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের অপেক্ষায়। অধ্যক্ষ জানিয়েছেন, ১৪ সেপ্টেম্বর নবীনবরণ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠানটি কীভাবে অনুষ্ঠিত হয় এবং সাংস্কৃতিক আয়োজন নিয়ে আপত্তির বিষয়টি কীভাবে সমাধান করা হয়, সেদিকেই এখন নজর স্থানীয়দের।
তবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো একটি বড় প্রশ্ন সামনে এনেছে: ধর্মীয় অনুভূতি ও সামাজিক শৃঙ্খলার প্রতি সম্মান দেখানোর পাশাপাশি একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা এবং মতপ্রকাশের পরিসর কতটা নিশ্চিত করা হবে? এই ভারসাম্য রক্ষা করতে না পারলে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে ঘিরে একের পর এক বিরোধ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।