ইদগাহ জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা আলী হাসান মুজাহিদ। ছবিঃ সংগৃহীত
চাঁপাইনবাবগঞ্জের রানিহাটিতে জুমার খুতবায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্যের অভিযোগ এবং নামাজে অস্বাভাবিক বিলম্বসহ একাধিক অভিযোগকে কেন্দ্র করে মুসল্লিদের তোপের মুখে পদত্যাগ করেছেন রানিহাটি বাজার ইদগাহ জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা আলী হাসান মুজাহিদ। অভিযোগের পর মসজিদ কমিটির পক্ষ থেকে তাঁকে ইমামতির দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াতে বলা হয়। পদত্যাগ না করলে বহিষ্কার করা হবে বলেও জানানো হয়েছিল বলে জানা গেছে।
ঘটনাটি এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন দেশের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও খুতবাকে রাজনৈতিক বক্তব্যের বাইরে রেখে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার ক্ষেত্র হিসেবে রাখার দাবি বিভিন্ন মহল থেকে জোরালো হচ্ছে। বিশেষ করে একজন নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে মসজিদের খুতবায় আপত্তিকর মন্তব্যের অভিযোগ এবং সেই অভিযোগের পর কমিটির পক্ষ থেকে দ্রুত পদত্যাগের সিদ্ধান্ত স্থানীয়ভাবে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
রানিহাটি বাজার ইদগাহ জামে মসজিদ কমিটির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মান্নান শুক্রবার ইমামের অব্যাহতি নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা, মুসল্লি, মসজিদ কমিটি ও লিখিত অভিযোগপত্র সূত্রে জানা যায়, গত শুক্রবার ৪ সেপ্টেম্বর জুমার নামাজের আগে খুতবার সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করার অভিযোগ ওঠে ইমাম মাওলানা আলী হাসান মুজাহিদের বিরুদ্ধে। খুতবা চলাকালীন এবং নামাজ শেষ হওয়ার পর মুসল্লিদের একাংশ এর প্রতিবাদ করেন।
পরে বিষয়টি নিয়ে মসজিদ কমিটির কাছে লিখিত অভিযোগ দেন মুসল্লিদের একাংশ। অভিযোগপত্রে অর্ধশতাধিক মুসল্লি স্বাক্ষর করেন বলে জানা গেছে। শুধু প্রধানমন্ত্রীর বিষয়ে মন্তব্যের অভিযোগ নয়, সেখানে আরও কয়েকটি অভিযোগ তুলে ধরা হয়।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, ইমাম বেগানা নারীদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ ও কথাবার্তায় লিপ্ত হন, ফরজ নামাজে অস্বাভাবিকভাবে সময়ক্ষেপণ করেন, বিতর্কিত ব্যক্তিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা রাখেন এবং মুসল্লিদের বিভিন্ন মতাদর্শের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির মতো কর্মকাণ্ডে জড়িত। এ ছাড়া ইমামের পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধেও আচরণগত সমস্যার অভিযোগ তোলা হয়েছে।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে আলোচনা করতে বৃহস্পতিবার সকালে মসজিদের দ্বিতীয় তলায় বৈঠকে বসে মসজিদ কমিটি। সেখানে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে কমিটির পক্ষ থেকে ইমামকে পদত্যাগের আহ্বান জানানো হয়। পদত্যাগ না করলে তাঁকে বহিষ্কার করা হবে বলেও জানানো হয়।
পরে ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি নেন মাওলানা আলী হাসান মুজাহিদ। তাঁর অব্যাহতিপত্রে বৃহস্পতিবার এশার নামাজ পর্যন্ত ইমামতি করার অনুমতি চাওয়া হলেও মসজিদ কমিটি সেই আবেদন গ্রহণ করেনি। ফলে বৃহস্পতিবার দুপুরের পর থেকেই তিনি আর ইমামতি করেননি।
মসজিদ কমিটির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মান্নান বলেন, ইমাম নিয়োগের সময়ই সাধারণত কোনো ব্যক্তি বা দলের নাম উল্লেখ করে মানহানিকর বক্তব্য না দেওয়ার বিষয়ে সতর্ক করা হয়। এরপরও গত শুক্রবারের খুতবায় ইমামের বক্তব্য নিয়ে মুসল্লিরা লিখিত অভিযোগ করেন।
তিনি বলেন, অভিযোগের বিষয়ে বৃহস্পতিবার সভা করা হয় এবং সভার একপর্যায়ে ইমামকে সেখানে ডাকা হয়। এ সময় তিনি নিজের ভুল স্বীকার করেন বলে দাবি করেন কমিটির এই কর্মকর্তা। পরে মুসল্লিদের একাংশের প্রতিবাদ ও অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তাঁকে পদত্যাগ করতে বলা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন।
তবে মসজিদ কমিটির অভিযোগ ও সিদ্ধান্তের সঙ্গে পুরোপুরি একমত নন অব্যাহতি নেওয়া ইমাম মাওলানা আলী হাসান মুজাহিদ। তাঁর দাবি, গত শুক্রবারের খুতবায় তিনি ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থায় রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব ও কর্তব্য নিয়ে আলোচনা করছিলেন। বক্তব্যের একটি পর্যায়ে উদাহরণ দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নাম উল্লেখ করেন।
মাওলানা আলী হাসান মুজাহিদ বলেন, তিনি প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে কোনো মানহানিকর বা আপত্তিকর মন্তব্য করেননি। মুসল্লিদের একটি পক্ষের তোপের মুখে এবং মসজিদ কমিটির আহ্বানে তিনি স্বেচ্ছায় অব্যাহতি নিয়েছেন।
এশার নামাজ পর্যন্ত ইমামতি করার জন্য আবেদন করলেও তাঁকে সেই সুযোগ দেওয়া হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি।
ঘটনাটিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠেছে, ধর্মীয় উপাসনালয়ের খুতবায় রাজনৈতিক ব্যক্তিকে নিয়ে কী ধরনের বক্তব্য দেওয়া গ্রহণযোগ্য এবং কোনো অভিযোগ উঠলে তা যাচাই-বাছাই ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ কতটা নিশ্চিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে একজন ইমামের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগের ভিত্তিতে তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে মসজিদ কমিটির সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াও স্থানীয়ভাবে আলোচনায় এসেছে।
অন্যদিকে মসজিদ কমিটির বক্তব্য অনুযায়ী, বিষয়টি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে নয়, বরং মুসল্লিদের লিখিত অভিযোগ এবং মসজিদের পরিবেশ স্বাভাবিক রাখার স্বার্থে সমাধান করা হয়েছে। ইমাম নিজেও স্বেচ্ছায় অব্যাহতি নিয়েছেন বলে দাবি করেছে কমিটি।
তবে ইমামের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে আপত্তিকর মন্তব্য করার অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। ফলে অভিযোগপত্রে উল্লিখিত বক্তব্য, ইমামের নিজের ব্যাখ্যা এবং মসজিদ কমিটির সিদ্ধান্তের মধ্যে প্রকৃত ঘটনা কী ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
সরকারের নেতৃত্ব ও রাষ্ট্রপ্রধানকে নিয়ে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের খুতবায় কোনো বক্তব্য দিলে সেটি রাজনৈতিক মতপ্রকাশের সীমা অতিক্রম করছে কি না, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে। একই সঙ্গে সরকারের সমালোচনা বা রাষ্ট্রপ্রধানের সমালোচনাকে কেন্দ্র করে কোনো ধর্মীয় ব্যক্তিকে চাপের মুখে সরিয়ে দেওয়া হলে তা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের স্বাধীন পরিবেশের জন্য কতটা গ্রহণযোগ্য, সেটিও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত মসজিদ কমিটি, মুসল্লিদের অভিযোগকারী অংশ এবং অব্যাহতি নেওয়া ইমামের বক্তব্য পাওয়া গেছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা এবং খুতবায় প্রকৃতপক্ষে কী বক্তব্য দেওয়া হয়েছিল, তা স্বাধীনভাবে যাচাই না হওয়া পর্যন্ত কোনো পক্ষের দাবিকেই চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।