কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার দলদলিয়া এলাকার হিন্দুপাড়া। ছবি : সংগৃহীত
তিস্তার ভাঙনে বিপর্যস্ত কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার দলদলিয়া এলাকার হিন্দুপাড়া। গত কয়েক দিনে এই পাড়ার একাধিক বসতভিটা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। ঘর হারিয়ে কেউ উঠেছেন আত্মীয়ের বাড়িতে, কেউবা অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। ভাঙন এখনো অব্যাহত রয়েছে। ফলে উপজেলার পাঁচ শতাধিক পরিবার চরম ঝুঁকিতে রয়েছে।
দলদলিয়া এলাকার হিন্দুপাড়া বাসিন্দা ৭০ বছরের শ্যামল সরকার। গত দুই বছরে তিস্তার ভাঙনে পাঁচবার বসতবাড়ি হারিয়েছেন তিনি। একবার ভাঙনের পর অন্য জায়গায় ঘর তুলেছেন। আবারও সেই ঘর নদীতে চলে গেছে। এভাবে পাঁচবার ঘর হারিয়ে এখন তিনি নিঃস্ব।
আক্ষেপ করে শ্যামল সরকার বলেন, ‘তিস্তা নদী হামার সব কাড়ি নিছে। হামাক একেবারে নিঃস্ব করি ছাড়িল। বাপ-দাদার থুইয়া যাওয়া সহায়-সম্পত্তি যা কিছু আছিল, নদীর ভাঙ্গনে সব শ্যাষ। দুই বছরে ৫ বার ভাঙ্গন। আমি এলা নিঃস্ব হইয়া গেছি।’
সরেজমিনে দলদলিয়া এলাকার হিন্দুপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, তিস্তার পাড়ে ভাঙন ঠেকাতে ব্যস্ত স্থানীয় মানুষ। কেউ ঘর সরিয়ে নিচ্ছেন। কেউ গাছপালা কাটছেন। কেউ শেষ সম্বলটুকু নিরাপদ জায়গায় নেওয়ার চেষ্টা করছেন। নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে নিজেদের বসতভিটা রক্ষার চেষ্টা করছেন অনেকে।
দলদলিয়া এলাকার নালারচর সোলেমানিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক প্রদীপ কুমার সরকার বলেন, ‘আমার বিদ্যালয়টি নদীর কাছাকাছি হওয়ায় ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে। বিদ্যালয়টি ভেঙে গেলে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের নিয়ে কোথায় যাব—সেই দুশ্চিন্তায় রয়েছি।’
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দলদলিয়া এলাকার হিন্দুপাড়া, ডাক্তারপাড়া, মাঝিপাড়া ও গোড়াই পিয়ার এলাকায় চলতি মাসে অন্তত ২০টি বাড়ি তিস্তাগর্ভে বিলীন হয়েছে। ভাঙনে আশ্রয়হীন হয়েছে আরও ২৫টি পরিবার। গত কয়েক দিন ধরে দক্ষিণ দলদলিয়া লাল মসজিদপাড়া এলাকায় ভাঙনে ১০টি পরিবারের বাড়িঘর ও গাছপালা নদীতে চলে গেছে। বিলীন হয়েছে প্রায় ৫০ একর আবাদি জমি। নদীগর্ভে চলে গেছে প্রায় আধা কিলোমিটার এলাকা। ভাঙনের হুমকিতে রয়েছে দক্ষিণ দলদলিয়া ও গোড়াই পিয়ার গ্রামের পাঁচ শতাধিক পরিবার।
ভুক্তভোগীরা জানান, স্থানীয় সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মাহবুবুব আলম ছালেহী ভাঙনরোধে পাঁচ হাজার জিও ব্যাগ চেয়ে ডিও লেটার দিয়েছেন। তবে এখনো তা বরাদ্দ হয়নি। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সরকার থেকে জিও ব্যাগ দেওয়া বন্ধ রয়েছে।
দলদলিয়া ইউপি চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী বলেন, ‘বরাদ্দ না এলে ইউনিয়ন পরিষদের কিছুই করার থাকে না। আমি ভাঙনপ্রবণ এলাকা পরিদর্শন করেছি। কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডকে ভাঙনরোধে জিও ব্যাগ ফেলার জন্য অনুরোধ করেছি।’
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, ‘এলাকার ভাঙনরোধের জন্য জিও ব্যাগের চাহিদা পাঠানো হয়েছে। তবে এখনো অনুমোদন পাইনি। জেলার বরাদ্দ শেষ হওয়ায় বিপদে পড়েছি। স্থানীয় সংসদ সদস্যও জিও ব্যাগের জন্য ডিও লেটার দিয়েছেন।’
এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এটিএম আরিফ বলেন, ‘ভাঙন এলাকা পরিদর্শন করে জিও ব্যাগের জন্য নির্বাহী প্রকৌশলীকে বলেছি। তারা চেষ্টা করছে। জিও ব্যাগ না ফেলালে এত বড় লোকালয় রক্ষা করা যাবে না।’