বিশ্ব

রিপাবলিকানদের পরাজয়ের নেপথ্যে ট্রাম্পের ভুল কৌশল, দায় কার?

  • 10:10 pm - November 04, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৪৭ বার
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: সংগৃহীত

নিজের পছন্দের প্রার্থী বাছাই, দলীয় প্রাইমারিতে হস্তক্ষেপ এবং জনমত বুঝতে ব্যর্থতা। সব মিলিয়ে মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের দায় এখন ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপরই চাপাচ্ছেন দলটির নেতারা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থীদের পক্ষে ভোটারদের এমনভাবে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, যেন ব্যালটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন তিনি নিজেই। গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সিনেট আসনে প্রার্থী মনোনয়নেও ছিল তাঁর সরাসরি প্রভাব। কিন্তু নির্বাচনের ফল বলছে, ট্রাম্পের সেই সমর্থন ভোটারদের মন জয় করতে পারেনি। বরং তাঁর পছন্দের একাধিক প্রার্থীকে প্রত্যাখ্যান করেছেন ভোটাররা।

সাউথ ক্যারোলিনা, নর্থ ক্যারোলিনা, টেক্সাস ও মিশিগানে ট্রাম্প-সমর্থিত প্রার্থীদের পরাজয় রিপাবলিকানদের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে এসেছে। এর ফলে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে চলে গেছে। একই সঙ্গে দলটির ওপর ট্রাম্পের রাজনৈতিক প্রভাবের সীমাবদ্ধতাও সামনে এসেছে।

এক দশকের বেশি সময় ধরে নিজের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ বা ম্যাগা আন্দোলনের মাধ্যমে রিপাবলিকান পার্টির রাজনৈতিক চরিত্রে বড় পরিবর্তন এনেছেন ট্রাম্প। দলীয় প্রার্থী বাছাইয়ের লড়াইয়ে তাঁর প্রভাব ক্রমেই বেড়েছে। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে পুরোপুরি একমত নন কিংবা যথেষ্ট অনুগত নন, এমন অনেক রক্ষণশীল নেতাকে পাশ কাটিয়ে গেছেন তিনি।

স্থানীয় পর্যায়ে শক্তিশালী সাংগঠনিক যোগাযোগ, জনসমর্থন এবং নির্বাচনে জয়ের অভিজ্ঞতা থাকা প্রার্থীদের পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রে নিজের অনুগত ও আদর্শিক মিত্রদের বেছে নিয়েছেন ট্রাম্প। তাঁর ধারণা ছিল, নিজের জনপ্রিয়তা ও রাজনৈতিক সমর্থন দিয়ে এসব প্রার্থীর দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। কিন্তু এবারের নির্বাচনের ফল সেই কৌশলের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

চার রাজ্যে ট্রাম্পের পছন্দের প্রার্থীদের পরাজয়

সবচেয়ে বিস্ময়কর ফল এসেছে সাউথ ক্যারোলিনা থেকে। ১৯৯৮ সালের পর রাজ্যটিতে কোনো ডেমোক্র্যাট সিনেটর নির্বাচিত হননি। এমনকি ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্প সেখানে ১৮ শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে জয় পেয়েছিলেন। এবার প্রয়াত রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের বোন ডারলিন গ্রাহামকে সমর্থন দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যানি অ্যান্ড্রুসের কাছে পরাজিত হয়েছেন ডারলিন।

নর্থ ক্যারোলিনায় ট্রাম্পের পছন্দের প্রার্থী ছিলেন রিপাবলিকান পার্টির সাবেক জাতীয় প্রচার কর্মকর্তা মাইকেল হোয়াটলি। কিন্তু সাবেক ডেমোক্র্যাট গভর্নর রয় কুপারের কাছে বড় ব্যবধানে হেরে গেছেন তিনি।

টেক্সাসে রিপাবলিকান প্রার্থী মনোনয়ন নিয়েও সরাসরি হস্তক্ষেপ করেছিলেন ট্রাম্প। দলটির নিরাপদ প্রার্থী হিসেবে পরিচিত সিনেটর জন করনিনের পরিবর্তে বিতর্ক ও কেলেঙ্কারিতে জড়ানো অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটনকে সমর্থন দেন তিনি। শেষ পর্যন্ত ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেমস ট্যালারিকোর কাছে পরাজিত হন প্যাক্সটন। এর মধ্য দিয়ে ১৯৮৮ সালের পর প্রথমবারের মতো আসনটি ডেমোক্র্যাটদের দখলে যায়।

মিশিগানেও ট্রাম্পের সমর্থন কাজে আসেনি। তাঁর পছন্দের প্রার্থী সাবেক মার্কিন প্রতিনিধি মাইক রজার্স পরাজিত হয়েছেন ডেমোক্র্যাট আবদুল এল-সায়েদের কাছে। এই জয়ের মধ্য দিয়ে মার্কিন সিনেটে প্রথম মুসলিম সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের ইতিহাস গড়েছেন এল-সায়েদ।

ভোটারদের অসন্তোষ বুঝতে পারেননি ট্রাম্প?

নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল রিপাবলিকান শিবিরেই। রয়টার্স ও ইপসোসের জরিপে দেখা যায়, ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি মার্কিন ক্যাপিটলে হামলার পরবর্তী সময়ের তুলনায়ও নির্বাচনের আগে তাঁর জনপ্রিয়তা কমে গিয়েছিল। এতে দলের নেতাদের মধ্যে আশঙ্কা তৈরি হয়, রিপাবলিকান পার্টির ওপর একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করতে গিয়ে ট্রাম্প নিজেই নির্বাচনী রাজনীতিতে দলের জন্য বাড়তি বোঝা হয়ে উঠছেন।

শুল্কনীতি, ইরান যুদ্ধ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্য নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষকে পরাজয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন অভিজ্ঞ রিপাবলিকান কৌশলবিদ ডৌ হাই।

তাঁর ভাষায়, এটি একটি ‘ট্রাম্প-কম্পন’। পুরো বছরজুড়ে ট্রাম্প ভোটারদের কাছে নিজের অগ্রাধিকারের বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে কোন বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ, সেদিকে যথেষ্ট মনোযোগ দেননি।

পরাজয়ের দায় নিয়ে ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া

নির্বাচনের ফল আসতে শুরু করার পরও নিজের অবস্থান থেকে সরে আসেননি ট্রাম্প। মঙ্গলবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘আমি তো ব্যালটে ছিলাম না! আর যদি থাকতাম, তবে আমরা ভূমিধস জয় পেতাম!’

হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে রয়টার্সকে বলেন, ব্যালটে থাকা প্রার্থীদের নিজেদের প্রচারের চেয়েও ট্রাম্প তাঁদের পক্ষে বেশি প্রচারণা চালিয়েছিলেন।

হোয়াইট হাউসের আরেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার দাবি, প্রায় ছয় সপ্তাহ আগে প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ জরিপেই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে রিপাবলিকানরা প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট, দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণই হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং দলের নির্বাচনী সম্ভাবনা ধরে রাখতে শেষ মুহূর্তে দেশজুড়ে মাসব্যাপী প্রচারে নেমেছিলেন ট্রাম্প। তবে সেই উদ্যোগও ফল বদলাতে পারেনি।

দলীয় প্রাইমারিতে হস্তক্ষেপই কি কাল হয়েছে?

স্বাধীন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, ট্রাম্পের ভুল প্রার্থী নির্বাচন এবং দলীয় মনোনয়নপ্রক্রিয়ায় অযাচিত হস্তক্ষেপ রিপাবলিকানদের পরাজয়ের অন্যতম কারণ।

আমেরিকান ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক থমাস কান বলেন, টেক্সাসের রিপাবলিকান প্রাইমারিতে ট্রাম্পের হস্তক্ষেপের কারণে দলটি নিশ্চিতভাবে একটি নিরাপদ আসন হারিয়েছে। তাঁর মতে, জন করনিনকে মনোনয়ন দেওয়া হলে আসনটি রিপাবলিকানদের হাতেই থাকত।

নর্থ ক্যারোলিনার ক্ষেত্রেও ট্রাম্পের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন কান। প্রেসিডেন্টের কর ও ব্যয়সংক্রান্ত বিলে মেডিকেডের বাজেট কমানোর প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছিলেন তৎকালীন রিপাবলিকান সিনেটর থম টিলিস। এর জেরে ট্রাম্প তাঁকে দলীয় প্রাইমারিতে চ্যালেঞ্জ করার হুমকি দিয়েছিলেন। এই বিরোধের পর গত বছর পুনর্নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার ঘোষণা দেন টিলিস।

কানের ভাষায়, এর ফলে ট্রাম্প কার্যত কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই আসনটি ডেমোক্র্যাটদের হাতে তুলে দিয়েছেন। টিলিস নির্বাচনে অংশ নিলে রয় কুপার প্রার্থী হওয়ার সাহস পেতেন কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

নর্থ ক্যারোলিনার সাবেক রিপাবলিকান গভর্নর প্যাট ম্যাকক্রোরিও মনে করেন, দলীয় প্রাইমারিতে ট্রাম্পের অতিরিক্ত হস্তক্ষেপের কারণে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে রিপাবলিকানদের মধ্যে বিভক্তি তৈরি হয়েছে।

ম্যাকক্রোরির মতে, সাউথ ক্যারোলিনায় ট্রাম্প স্থানীয় দুই প্রভাবশালী কংগ্রেস সদস্যের বিরোধিতা করে দলের অভ্যন্তরীণ ঐক্য দুর্বল করেছেন। তাঁর ভাষায়, এটি এমন একটি উদাহরণ, যেখানে একজন প্রেসিডেন্ট নিজের রাজনৈতিক পুঁজি নিজের দলের বিরুদ্ধেই ব্যয় করেছেন।

সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ছে ট্রাম্পের?

তবে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পেছনে শুধু প্রার্থী বাছাই কিংবা দলীয় কোন্দলকেই দায়ী করছেন না ম্যাকক্রোরি। তাঁর মতে, ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক শক্তি ছিল সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনের ক্ষমতা। সেই ভোটারদের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব তৈরি হওয়াও দলটির জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ম্যাকক্রোরি বলেন, খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের সঙ্গে সহজাত যোগাযোগই ছিল প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় শক্তি। কিন্তু দুঃখজনকভাবে তিনি সেই দক্ষতা হারিয়ে ফেলেছেন। দেশের বৃহত্তর স্বার্থে তাঁর উচিত দ্রুত সাধারণ মানুষের সঙ্গে সেই সংযোগ ফিরিয়ে আনা।

সব মিলিয়ে এবারের নির্বাচনের ফল রিপাবলিকান পার্টির সামনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। দলীয় প্রার্থী বাছাইয়ে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত পছন্দ কতটা প্রভাব ফেলবে, ভোটারদের অর্থনৈতিক উদ্বেগকে দলটি কীভাবে মোকাবিলা করবে এবং ম্যাগা আন্দোলনের বাইরে থাকা সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে সম্পর্ক কীভাবে পুনর্গঠন করবে, এখন সেদিকেই নজর রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের।

এই শাখার আরও খবর

রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয়ে শত শত শিক্ষার্থী ভোগান্তিতে: হিউম্যান রাইটস ওয়াচ

বাংলাদেশের বিভিন্ন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আওয়ামী লীগের সঙ্গে কথিত রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে নির্বিচারে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার…

গ্যাব্রিয়েলকে পেতে রিয়ালের সঙ্গে লড়াইয়ে বার্সা-পিএসজি

ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের ১৬ বছর বয়সী প্রতিভাবান ফরোয়ার্ড জেজে গ্যাব্রিয়েলকে দলে ভেড়াতে আগ্রহী রিয়াল মাদ্রিদ। তাঁকে পেতে বার্সেলোনা ও পিএসজির মতো ক্লাবও প্রতিযোগিতায় থাকলেও স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যমের…

ইকবাল সোবহান চৌধুরীকে ধরে নিয়ে গেছে গোয়েন্দা পুলিশ

ওটিএন বাংলা ডেস্ক :  সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তথ্য উপদেষ্টা ও সাংবাদিক ইকবাল সোবহান চৌধুরীকে আটক করেছে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। বুধবার (৪ নভেম্বর) দুপুরে রাজধানীর…

কুমিল্লায় ভারতীয় শিক্ষার্থীকে হত্যা, ডোবার পানিতে ভাসছিল লাশ

ওটিএন বাংলা ডেস্ক :  কুমিল্লার বুড়িচংয়ে ইস্টার্ন মেডিকেল কলেজের হোস্টেল থেকে নিখোঁজ হওয়ার দুই দিন পর আদনান আলতাফ (২৮) নামের এক ভারতীয় মেডিকেল শিক্ষার্থীর মরদেহ…

সাভারে পুলিশের গাড়িতে আগুন, সাংবাদিক-পুলিশসহ আহত ১০

ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি, কালো তালিকাভুক্তি বন্ধসহ তিন দফা দাবিতে সাভারের হেমায়েতপুরে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক প্রায় দুই ঘণ্টা অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন পোশাকশ্রমিকেরা। এ সময় বিক্ষুব্ধ শ্রমিকেরা…

ডিসেম্বর থেকে কার্যকর পোশাকশ্রমিকদের নতুন মজুরি, জানুয়ারি থেকে বাড়তি বেতন

তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের জন্য নতুন মজুরি কাঠামো আগামী ডিসেম্বর থেকে কার্যকর করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সে অনুযায়ী, জানুয়ারি মাস থেকে শ্রমিকেরা বাড়তি বেতন হাতে পেতে…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au