২৩ বছরের আন্তর্জাতিক ফুটবল ক্যারিয়ারের ইতি টানার ঘোষণা দিয়েছেন পর্তুগিজ মহাতারকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। জাতীয় দলের হয়ে ২৩৪ ম্যাচে ১৪৬ গোল করার পর আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ৪১ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত প্রায় পাঁচ মিনিটের এক ভিডিও বার্তায় পর্তুগালের সমর্থকদের উদ্দেশে নিজের বিদায়ের কথা জানান তিনি।
জাতীয় দলের কোচ জর্জে জেজুসের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন, দলের ক্যাম্প ছেড়ে যাওয়াকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বিতর্ক এবং পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশনের নিষেধাজ্ঞার মধ্যে রোনালদোর এই ঘোষণা এল। নভেম্বরে জাতীয় দলের পরবর্তী স্কোয়াড ঘোষণার আগে তিনি আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত প্রকাশ করলেন।
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত ভিডিও বার্তায় রোনালদো বলেন, পর্তুগাল জাতীয় দলের জার্সি ও অধিনায়কের আর্মব্যান্ড এবার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়ার সময় এসেছে। ২০০৩ সালের আগস্টে শুরু হওয়া তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সমাপ্তি টানার সিদ্ধান্ত সহজ ছিল না। কারণ, এ সিদ্ধান্ত শুধু যুক্তি দিয়ে নয়, হৃদয়ের অনুভূতি দিয়েও নিতে হয়েছে।
পর্তুগিজ জনগণের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘জাতীয় দলের জার্সি ও অধিনায়কের আর্মব্যান্ড ফিরিয়ে দেওয়ার দিন এসেছে। এই জার্সি শুধু আমার একার ছিল না, এটি আমাদের সবার। তবে ২৩ বছর ধরে এটি পরার, এর মর্যাদা রক্ষা করার এবং বিশ্বের বিভিন্ন স্টেডিয়ামে পর্তুগালের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ ও দায়িত্ব আমার ছিল।’
রোনালদো বলেন, জাতীয় দলের হয়ে এত বছরের পথচারের দিকে ফিরে তাকালে তাঁর মনে শুধু ম্যাচ, গোল, রেকর্ড কিংবা ট্রফির কথা আসে না। মনে পড়ে অসংখ্য মানুষের কথা, যাঁরা এই যাত্রার অংশ হয়েছেন। বিদেশে বসবাসকারী পর্তুগিজদের কথাও স্মরণ করেন তিনি, যাঁরা তাঁর খেলা দেখার ৯০ মিনিটে নিজেদের দেশের আরও কাছাকাছি অনুভব করতেন।
তাঁর ভাষায়, ফুটবল কেবল একটি খেলা নয়, এর সঙ্গে মানুষের আবেগ ও অনুভূতি জড়িয়ে রয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে যাঁদের কখনো দেখা হয়নি, এমন লাখো পর্তুগিজ মানুষও তাঁর জীবনের অংশ হয়ে উঠেছেন।
আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে নিজের লক্ষ্য ও প্রত্যাশার কথাও তুলে ধরেছেন রোনালদো। তিনি জানান, জাতীয় দলের হয়ে সব সময় নিজের সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। জিততে চেয়েছেন, সেরা হতে চেয়েছেন এবং ইতিহাস গড়তে চেয়েছেন। নিজের কাছে সব সময় কঠোর প্রত্যাশা রেখেছেন এবং পর্তুগালের জার্সির জন্য সর্বোচ্চটা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।
ক্যারিয়ারের সাফল্যের পাশাপাশি ব্যর্থতা ও হতাশার কথাও স্বীকার করেছেন এই তারকা। তিনি বলেন, জাতীয় দলের হয়ে এমন অনেক জয় পেয়েছেন, যা কখনো ভুলবেন না। আবার কিছু পরাজয় রয়েছে, যেগুলোর কথা মনে পড়লে এখনো কষ্ট হয়। কখনো কখনো পর্তুগিজ সমর্থকদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেননি, নিজেও ব্যর্থ হয়েছেন এবং কষ্ট পেয়েছেন। তবে কখনো হাল ছাড়েননি। সবচেয়ে বড় কথা, পর্তুগালের প্রতিনিধিত্ব করার গর্ব কখনো হারাননি।
রোনালদোর মতে, গোল একসময় থেমে যায়, ট্রফি জাদুঘরে স্থান পায় এবং রেকর্ড একসময় ভেঙে যায়। কিন্তু মানুষের হৃদয়ে যে জায়গা তৈরি হয়, সময় তা মুছে দিতে পারে না।
সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, তাঁর কোনো গোল যদি কাউকে আনন্দ দিয়ে থাকে, কাউকে প্রিয়জনকে জড়িয়ে ধরার উপলক্ষ তৈরি করে থাকে কিংবা কিছুক্ষণের জন্য হলেও কারও দুশ্চিন্তা ভুলিয়ে দিয়ে থাকে, তাহলে তাঁর সব প্রচেষ্টা সার্থক হয়েছে। দেশের প্রতিনিধিত্ব করার আনন্দ ও গর্বের মধ্যেই এর প্রকৃত অর্থ নিহিত।
পর্তুগালের হয়ে রেকর্ডের পর রেকর্ড
আন্তর্জাতিক ফুটবলে রোনালদোর অর্জনের তালিকা দীর্ঘ। জাতীয় দলের হয়ে ২৩৪ ম্যাচে ১৪৬ গোল করেছেন তিনি। আন্তর্জাতিক ফুটবলে পুরুষ খেলোয়াড়দের মধ্যে সর্বোচ্চ ম্যাচ ও গোলের রেকর্ড দুটিই তাঁর দখলে। এ ছাড়া পর্তুগালের হয়ে ৪৫টি গোলে সহায়তা করেছেন তিনি।
রোনালদোর নেতৃত্বে ২০১৬ সালে প্রথমবারের মতো ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জেতে পর্তুগাল। এরপর ২০১৯ ও ২০২৫ সালে উয়েফা নেশন্স লিগের শিরোপাও জেতে দলটি। পর্তুগালের ফুটবল ইতিহাসে অন্যতম সফল অধিনায়ক হিসেবে বিবেচিত হন তিনি।
বিশ্বকাপের শিরোপা জিততে না পারলেও এই প্রতিযোগিতায়ও একাধিক রেকর্ড গড়েছেন রোনালদো। যৌথভাবে সর্বোচ্চ ছয়টি বিশ্বকাপে খেলার কৃতিত্ব রয়েছে তাঁর। পাশাপাশি ছয়টি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করা একমাত্র পুরুষ ফুটবলারও তিনি। তবে বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফি জয়ের স্বপ্ন অপূর্ণই থেকে গেল তাঁর।
সতীর্থ, কোচ ও পরিবারের প্রতি কৃতজ্ঞতা
বিদায়বার্তায় জাতীয় দলের সতীর্থদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন রোনালদো। একসঙ্গে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত, মাঠে দৌড়ানো, আনন্দ ভাগাভাগি, মতবিরোধ, ম্যাচের আগে নীরব অপেক্ষা, জয় উদ্যাপন এবং পরাজয় থেকে শিক্ষা নেওয়ার অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করেন তিনি।
রোনালদো বলেন, অধিনায়ক হওয়ার সৌভাগ্য তাঁর হয়েছিল, কিন্তু কোনো অধিনায়ক একা পথ চলেন না। জাতীয় দলের প্রত্যেক সতীর্থ তাঁর গল্পের অংশ। একই সঙ্গে কোচ, পরিচালক, চিকিৎসক, ফিজিওথেরাপিস্ট, কিট ম্যানেজার এবং দলের পেছনে কাজ করা অন্য কর্মীদেরও ধন্যবাদ জানান তিনি।
তাঁর মতে, দলের অনেক সদস্য কখনো সংবাদমাধ্যমের ছবিতে জায়গা পাননি। কিন্তু তাঁদের অবদান ছাড়া সেসব সাফল্যের ছবি তৈরি হওয়া সম্ভব হতো না।
পরিবারের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন রোনালদো। জাতীয় দলের হয়ে খেলতে গিয়ে দীর্ঘ সময় বাড়ির বাইরে থাকা, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে না পারা এবং বিভিন্ন ত্যাগের বিষয়গুলো বুঝে নেওয়ার জন্য তাঁদের ধন্যবাদ জানান তিনি। রোনালদোর ভাষায়, এত দূর আসতে পেরেছেন পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতা ও পাশে থাকার কারণেই।
পর্তুগালের ঐক্যের প্রতীক হয়ে থাকার প্রত্যাশা
বিদায়বার্তার শেষাংশে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী পর্তুগিজ নাগরিকদের উদ্দেশে আবেগঘন বার্তা দেন রোনালদো। জাতীয় সংগীত শুরুর মুহূর্তের একটি দৃশ্যের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, তখন তাঁর চোখে ভেসে ওঠে সতীর্থ, গ্যালারিতে থাকা দর্শক, শিশু, মা-বাবা, দাদা-দাদি এবং দূরদূরান্ত থেকে খেলা দেখতে আসা পর্তুগিজ সমর্থকদের মুখ।
সেই মুহূর্তে মানুষের মধ্যে ক্লাব, রং, শ্রেণি, পেশা কিংবা মতের কোনো বিভেদ থাকে না। সবার পরিচয় একটাই, তারা পর্তুগালের মানুষ। এই আবেগ ও ঐক্যের অনুভূতিই তিনি আজীবন নিজের সঙ্গে রাখতে চান।
পর্তুগালের ভবিষ্যৎ নিয়েও আশাবাদী রোনালদো। তিনি বলেন, দেশটির প্রয়োজন এমন তরুণ, যারা স্বপ্ন দেখতে জানে; এমন খেলোয়াড়, যারা কখনো হাল ছাড়ে না; এবং এমন নতুন প্রজন্ম, যারা বিশ্বাস করে আগে কেউ পৌঁছাতে পারেনি, এমন উচ্চতাতেও পৌঁছানো সম্ভব।
তাঁর মতে, যে দেশ নতুন নতুন বীর তৈরি করতে পারে, সেই দেশ কখনো নিজের ওপর বিশ্বাস হারায় না।
২০০৩ সালের আগস্টে মাত্র ১৮ বছর বয়সে পর্তুগালের জাতীয় দলে অভিষেক হয়েছিল রোনালদোর। এরপর দুই দশকের বেশি সময় ধরে দলটির অন্যতম প্রধান খেলোয়াড় ও অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। তাঁর নেতৃত্বে পর্তুগাল পেয়েছে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ ও নেশন্স লিগের শিরোপা। ব্যক্তিগত অর্জন, গোলের রেকর্ড এবং দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের মাধ্যমে বিশ্ব ফুটবলে নিজের অবস্থানও প্রতিষ্ঠা করেছেন।
আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে বিদায় নিলেও ক্লাব ফুটবলে তাঁর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে এই বার্তায় কিছু জানাননি রোনালদো। ফলে জাতীয় দলের জার্সিতে তাঁর দীর্ঘ পথচলার সমাপ্তি ঘটলেও ক্লাব পর্যায়ে খেলা চালিয়ে যাওয়ার বিষয়টি আলাদা থাকছে।