সানা ইউসুফের মৃত্যু অনিবার্য ছিল, কারণ তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় ছিলেন। ছবিঃ এবিসি নিউজ
মেলবোর্ন, ৭ সেপ্টেম্বর- পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদের এক সাধারণ ঘর। দেয়ালে রক্তের দাগ, বিছানার পেছনে গুলির চিহ্ন। সেখানেই থেমে গেছে মাত্র ১৭ বছর বয়সী টিকটকার সানা ইউসুফের জীবনের যাত্রা। ঘরটা আজও আগের মতোই রয়ে গেছে, কিন্তু নেই সানার প্রাণবন্ত উপস্থিতি—শুধু ভেসে বেড়ায় তাঁর তৈরি করা গান, নাচ আর হাসির ভিডিও।
“আমি এখনও বিশ্বাস করতে পারি না,” ভাঙা গলায় বললেন সানার মা ফারজানা ইউসুফ।
“মনে হয় হয়তো কলেজে গেছে… কিন্তু না, ও তো আর ফিরবে না।”

মেয়ে সানার শোবার ঘরে বসে আছেন ফারজানা ইউসুফ ও সৈয়দ ইউসুফ হাসান। ছবিঃএবিসি
ভয়ঙ্কর অনুসারীর গুলিতে মৃত্যু
গত জুনে ২২ বছর বয়সী উমর হায়াত নামের এক যুবক সানার শোবার ঘরে ঢুকে গুলি চালায়। পুলিশ বলছে, টিকটক ভিডিও দেখে দীর্ঘদিন ধরে সে সানাকে অনুসরণ করছিল এবং “বন্ধুত্বের প্রস্তাব” প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পরই হত্যার পথ বেছে নেয়।
ঘটনার সময় পাশের ঘরেই ছিলেন সানার মা ও খালা। পরদিন ফয়সালাবাদ থেকে গ্রেপ্তার হয় অভিযুক্ত হায়াত, যার কাছ থেকে সানার মোবাইল ফোন ও হত্যার অস্ত্র উদ্ধার করা হয়।
“আমি পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিলাম। আমার পৃথিবী যেন শেষ হয়ে গেল,” কাঁদতে কাঁদতে বলেন সানার মা।
চিত্রালের মেয়ে সানা ছিলেন তরুণ প্রজন্মের প্রিয় মুখ। মৃত্যুর আগে ইনস্টাগ্রামে তাঁর অনুসারীর সংখ্যা ছিল পাঁচ লাখ; মৃত্যুর পর টিকটকে তা এক মিলিয়ন ছাড়িয়ে যায়। কনটেন্ট ছিল হালকা বিনোদনধর্মী—গান, ফ্যাশন, বন্ধুদের আড্ডা। শেষ পোস্টে দেখা গিয়েছিল জন্মদিনের আনন্দঘন মুহূর্ত।
“তুমি তো কাউকে ক্ষতি করোনি। তাহলে কেন কেউ তোমার শত্রু হবে?” ক্ষোভ প্রকাশ করেন সানার বাবা সৈয়দ ইউসুফ হাসান।
পাকিস্তানে নারী ইনফ্লুয়েন্সারদের ওপর হামলার ইতিহাস
সানার হত্যাকাণ্ড পাকিস্তানকে নাড়া দিয়েছে, তবে এটাই প্রথম নয়।
- এ বছর কোয়েটায় ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরীকে টিকটক ব্যবহারের কারণে নিজ বাবাই গুলি করে হত্যা করে।
- ২০২১ সালে করাচিতে টিকটকার মুসকান শেখ ও তাঁর সহযোগীরা গুলিতে নিহত হন।
- একই বছরে লাহোরে কনটেন্ট ক্রিয়েটর আয়েশা আক্রম ৪০০ পুরুষের হাতে নির্যাতিত হন স্বাধীনতা দিবসে ভিডিও করতে গিয়ে।
সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ঘটে ২০১৬ সালে—যখন পাকিস্তানের সবচেয়ে বিখ্যাত সোশ্যাল মিডিয়া তারকা কন্দিল বালোচ নিজ ভাইয়ের হাতে খুন হন। যদিও তাঁর ভাইকে যাবজ্জীবন সাজা দেওয়া হয়েছিল, ২০২২ সালে তিনি মুক্তি পান আইনের ফাঁকফোকরে।
মানবাধিকার কমিশন অব পাকিস্তানের তথ্য অনুযায়ী, শুধু চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই ৭০০-র বেশি নারী খুন হয়েছেন; এর অন্তত এক-চতুর্থাংশ কথিত ‘সম্মান রক্ষার খুন’। এর বাইরে ৬০০ নারী যৌন সহিংসতার শিকার, ৫০০ নারী অপহৃত হয়েছেন।
হুমকি শুধু বাস্তবেই নয়, অনলাইন জগতেও ছড়িয়ে পড়ছে। সানার মৃত্যুর পর ডিজিটাল রাইটস ফাউন্ডেশন (DRF) অনলাইন মন্তব্য বিশ্লেষণ করে জানায়, অনেক ব্যবহারকারী হত্যাকারীকে প্রশংসা করছে এবং সানার মৃত্যুকে ‘যথাযথ’ বলছে। DRF একে বলছে “জেন্ডারড ডিসইনফরমেশন”—যেখানে অপরাধীর দায় সরিয়ে নারীকেই দোষারোপ করা হয়।
পাকিস্তানে টিকটক ব্যবহারকারী ৫৪ মিলিয়নের বেশি। একাধিকবার “অশ্লীলতা”র অভিযোগে অ্যাপটি নিষিদ্ধ হলেও পরে সীমিত আকারে চালু রাখা হয়। সমালোচকদের মতে, এই সেন্সরশিপ নারীদের ওপর বৈরিতা আরও বাড়িয়ে তুলছে।
নারী অধিকারকর্মী ফারজানা বারি বলেন,
“যখন কোনো নারী নিজের সিদ্ধান্ত নিতে চায় বা কোনো পুরুষের নিয়ন্ত্রণ থেকে বের হতে চায়, তখনই সহিংসতা শুরু হয়। স্বাধীন নারীকে সবসময় ঐতিহ্যগত ক্ষমতার চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হয়।”
শোকাহত পরিবার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
“মেয়েরা স্বাধীন হবে। স্বপ্ন দেখা প্রত্যেক নারীর অধিকার। কেন তাঁর স্বপ্নকে হত্যা করা হবে?” প্রশ্ন তোলেন সানার বাবা।
তিনি কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়ে বলেন,
“সমাজ, আইন কিংবা ইসলাম—কোথাও তো এই হত্যার অনুমতি নেই। হত্যাকারীদের প্রকাশ্যে ফাঁসি দিতে হবে… এদের সঙ্গে কোনো যুক্তি চলে না।”
সূত্রঃ এবিসি নিউজ