বাংলাদেশের অর্থনীতি কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ সংকটে পড়েছে। প্রতিকী ছবি
মেলবোর্ন, ২৩ সেপ্টেম্বর- বাংলাদেশের অর্থনীতি কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ সংকটে পড়েছে। ব্যাংক খাত, নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) এবং শেয়ারবাজার অর্থনীতির এই তিনটি প্রধান স্তম্ভই গভীর অস্থিরতায় নিমজ্জিত। ঋণ খেলাপি, দুর্বল নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্নীতি ও অকার্যকর কোম্পানির দৌরাত্ম্যে অর্থনীতি অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।
বছরের পর বছর শিথিল নীতি, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও দুর্নীতির কারণে ব্যাংক খাত খেলাপি ঋণের চাপে ভেঙে পড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, জুন শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ লাখ কোটি টাকা। এর বাইরে আরও ৩.১৮ লাখ কোটি টাকার লুকানো খেলাপি ধীরে ধীরে প্রকাশ করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে অর্থঋণ আদালতে আটকে থাকা ১.৭৮ লাখ কোটি টাকা, বাদ দেওয়া ৮০ হাজার কোটি টাকা এবং আদালতের স্থগিতাদেশে থাকা ৬০ হাজার কোটি টাকা। সব মিলিয়ে এ সংখ্যা ৯ লাখ কোটির কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে।
এমন অবস্থায় সরকার নতুন ব্যাংকিং কোম্পানি আইনের খসড়ায় “ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি” শব্দটি বাদ দেওয়ার প্রস্তাব করেছে। যুক্তি দেখানো হয়েছে, ইচ্ছাকৃত খেলাপি শনাক্ত করা জটিল এবং বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অথচ ২০২৩ সালের সংশোধিত আইনে প্রতিটি ব্যাংককে ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের তালিকা তৈরি করে বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা ছিল। এক বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তা গোপনীয়তার শর্তে বলেন, আগের সরকারে ঋণের নামে ব্যাপক লুটপাট হয়েছে। অনেক প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও দেননি। তাই নতুন খসড়ায় সংজ্ঞাটি বাদ দেওয়ার প্রস্তাব এসেছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃত খেলাপিদের হিসাব প্রকাশ করা হলে ইচ্ছাকৃতদের শনাক্ত করা সম্ভব।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. মঈনুল ইসলাম বলেন, পুনঃতফসিল, ঋণ মওকুফ বা সুদ বাতিলের সংস্কৃতি শুধু কাগজে-কলমে খেলাপি কমায়, কিন্তু ব্যাংকের আর্থিক স্বাস্থ্য উন্নত করে না। আসল চিত্র প্রকাশ করলে দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংক খাত উপকৃত হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মন্সুর বলেছেন, এখন থেকে কোনো তথ্য গোপন রাখা হবে না, সব খেলাপি ঋণ প্রকাশ করা হবে এবং কঠোরভাবে আদায় করা হবে।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) জানিয়েছে, খেলাপি ঋণের পরিমাণে বাংলাদেশ এখন এশিয়ার শীর্ষে। ২০২৪ সালে মোট বিতরণকৃত ঋণের ২০.২ শতাংশ খেলাপি হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ২৮ শতাংশ বেশি। এডিবি বাংলাদেশের ব্যাংক খাতকে এশিয়ার সবচেয়ে দুর্বল হিসেবে বর্ণনা করেছে। তুলনায় ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা সংস্কারের মাধ্যমে অকার্যকর ঋণ কমাতে সক্ষম হয়েছে।
সাবেক বিশ্বব্যাংক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেছেন, কঠোর নিয়মই খেলাপি ঋণ আরও বাড়াচ্ছে। ভারত যেভাবে সাহসী সংস্কার করেছে, তেমন পদক্ষেপ ছাড়া সংকট কাটবে না। সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান বলেছেন, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ না হলে এবং বিচারব্যবস্থা শক্তিশালী না হলে সমস্যার সমাধান হবে না।
এ অবস্থায় বাংলাদেশ ব্যাংক অভূতপূর্বভাবে পাঁচটি ইসলামী ব্যাংককে একীভূত করে একটি নতুন রাষ্ট্রায়ত্ত “ইউনাইটেড ইসলামী ব্যাংক” গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকার এতে অন্তত ২০ হাজার কোটি টাকা পুঁজি দেবে। এসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৪৮ থেকে ৯৮ শতাংশ। গভর্নর বলেছেন, এই উদ্যোগ আমানতকারীদের সুরক্ষার জন্য নেওয়া হয়েছে এবং আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। তবে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর অবস্থাও শোচনীয়। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে শীর্ষ ২০ খেলাপির ৩১,৯০৮ কোটির মধ্যে আদায় হয়েছে মাত্র ২১৯ কোটি টাকা। সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় আছে জনতা ব্যাংক, যার খেলাপি ঋণ ৭০,৮৪৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৭৫ শতাংশ। যদিও জুলাইয়ে ব্যাংকে আমানত প্রবৃদ্ধি ৮.৪২ শতাংশে পৌঁছেছে, যা সামান্য হলেও আস্থার পুনরাবৃত্তির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ব্যাংক খাতের অস্থিরতা নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতেও ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০টি সমস্যাগ্রস্ত এনবিএফআইয়ের খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ২১,৪৬২ কোটি টাকা, যা তাদের মোট ঋণের ৮৩ শতাংশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এর মধ্যে ৯টি প্রতিষ্ঠান বন্ধ করার সুপারিশ করেছে। ডিসেম্বর ২০২৪ পর্যন্ত এসব প্রতিষ্ঠানের মোট ঋণ ছিল ২৫,৮০৮ কোটি টাকা, অথচ জামানত রয়েছে মাত্র ৬,৮৯৯ কোটি টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে খাতটি পুরোপুরি ধসে পড়তে পারে।
অর্থনীতির তৃতীয় স্তম্ভ শেয়ারবাজারও দীর্ঘমেয়াদী মন্দার মধ্যে আছে। গত ১৬ বছরে বাজার ৩৮ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে। মূল্যস্ফীতি হিসাব করলে বিনিয়োগকারীরা প্রতিবছর গড়ে ৩ শতাংশ করে মূলধন হারিয়েছেন। এ সময় প্রভাবশালী একটি মহল বাজারকে ব্যবহার করে বিপুল সম্পদ অর্জন করেছে। বর্তমানে তালিকাভুক্ত ৩৯৭ কোম্পানির মধ্যে ৯৮টির শেয়ার ১০ টাকার মূল্যের নিচে লেনদেন হচ্ছে। এর অর্ধেকেরও বেশি ৫ টাকার নিচে নেমে গেছে। এর মধ্যে রয়েছে ৩৩টি ব্যাংক ও এনবিএফআই, ৩৫টি মিউচুয়াল ফান্ড ও ১৭টি টেক্সটাইল কোম্পানি।
শান্তা অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের সিইও কাজী মনিরুল ইসলাম বলেছেন, এত বেশি শেয়ারের দাম মূল্যের নিচে নেমে যাওয়া এসব প্রতিষ্ঠানের দুর্বল অবস্থার প্রমাণ। ফলে বিনিয়োগকারীরা কেবল শক্তিশালী কিছু প্রতিষ্ঠানের দিকে ঝুঁকছেন। ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেছেন, শেয়ারবাজারে এত বেশি অকার্যকর কোম্পানি বিদেশি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করছে। দুর্বল কোম্পানিগুলো দ্রুত বন্ধ বা একীভূত করতে হবে এবং নতুন শক্তিশালী কোম্পানি বাজারে আনতে হবে।
সুত্রঃ ঢাকা ট্রিবিউন