খাগড়াছড়ির গুইমারার রামেসু বাজারে আগুন দেওয়া হয়। ছবি : স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২৯ সেপ্টেম্বর- বাংলাদেশের পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়িতে এক কিশোরীকে দলবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ ঘিরে গত পাঁচ দিন ধরে (বুধবার থেকে রোববার) উত্তেজনা চলছে। সড়ক অবরোধ, সংঘর্ষ, ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনায় পুরো জেলাজুড়ে অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত প্রশাসন অনির্দিষ্টকালের জন্য ১৪৪ ধারা জারি করে। এর মধ্যেই খাগড়াছড়ি সদরের পাশের উপজেলা গুইমারা বাজারে আগুন দেওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। আজ রোববার গুলিতে তিনজন নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন সেনাবাহিনীর সদস্য, পুলিশসহ অন্তত ২০ জন।
খাগড়াছড়ি শহর এখন থমথমে। দোকানপাট বন্ধ, রাস্তায় মানুষজন কম। আতঙ্কে আছেন স্থানীয়রা। তবে পুলিশ বলছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। অন্যদিকে জুম্ম ছাত্র-জনতা জানিয়েছে, তাদের আট দফা দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধ ও কর্মসূচি চলবে। ফেসবুক পেজে দেওয়া এক বিবৃতিতে তারা এই ঘোষণা দেয়।

অবরোধের কারণে চলেনি কোনো যানবাহন। আজ সকালে খাগড়াছড়ির চেঙ্গী স্কয়ার এলাকায়। ছবিঃ প্রথম আলো
ঘটনা ঘটে। এতে উভয় পক্ষের অন্তত চারজন আহত হয়। দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত শহরের মহাজনপাড়া, নারকেলবাগানসহ বিভিন্ন এলাকায় দোকানপাট ভাঙচুর করা হয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে শনিবার বেলা দুইটার পর থেকে সদর, পৌর এলাকা ও গুইমারায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়।
সড়ক অবরোধে আগুন ও গুলিতে নিহত ৩
আজ রোববার দুপুরে গুইমারার রামেসু বাজারে অবরোধ চলাকালে আগুন দেওয়া হয়। আগুনে বেশ কয়েকটি দোকান ও বসতবাড়ি পুড়ে যায়। বাজারটি চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি সড়ক থেকে প্রায় ১০০ গজ দূরে। আগুনের ভিডিও ও ছবি দ্রুত সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
দুপুরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে অবরোধকারীদের পাল্টাপাল্টি ধাওয়া হয়, শোনা যায় গুলির শব্দ। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শান্তিপূর্ণ অবস্থানে থাকা অবস্থায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে কথা-কাটাকাটি হয়, এক পর্যায়ে গুলি চালানো হয়। এরপর মুখোশ পরা একদল লোক এসে দোকানপাট ও বাড়িঘরে লুটপাট চালায় এবং আগুন ধরিয়ে দেয়। মোটরসাইকেলেও আগুন দেওয়া হয়।
চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আহসান হাবিব পলাশ বলেন, “গুইমারায় গুলিতে তিনজন নিহত হয়েছেন। তাঁদের লাশ হাসপাতালে রয়েছে।” আরও তিনজন আহত হয়েছেন।
খাগড়াছড়ি জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ সাবের বলেন, “গুইমারা থেকে তিনজন পুরুষের লাশ এসেছে, ময়নাতদন্ত হবে সোমবার সকালে।” আহতদের মধ্যে বিকাশ ত্রিপুরা (২৬), চিংকেউ মারমা (২৬) ও উগ্য মারমা (২২) চিকিৎসাধীন আছেন। চিংকেউ মারমার পায়ে গুলি লেগে অপর পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেছে, তবে সবাই আশঙ্কামুক্ত।

পাহাড়ি শিক্ষার্থীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় কয়েকদিনের অবরোধ, মিছিল ও সহিংসতার পর খাগড়াছড়িতে টানটান পরিস্থিতি বিরাজ করছে। ছবিঃ সংগৃহীত
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিক্রিয়া
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, গুইমারায় দুষ্কৃতকারীদের হামলায় তিন পাহাড়ি নিহত হয়েছেন এবং মেজরসহ ১৩ সেনাসদস্য, গুইমারার ওসিসহ তিন পুলিশ সদস্য ও আরও অনেকে আহত হয়েছেন। বিবৃতিতে গভীর দুঃখ প্রকাশ করে বলা হয়, ঘটনাটি তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনো অপরাধীকেই ছাড় দেওয়া হবে না। সংশ্লিষ্ট সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানানো হয়।
“তৃতীয় পক্ষের ইন্ধন রয়েছে” — সুপ্রদীপ চাকমা
রোববার দুপুরে জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমা বলেন, “এই সহিংসতার পেছনে তৃতীয় পক্ষের ইন্ধন রয়েছে। আন্দোলনের নামে সহিংসতা সৃষ্টি করে কেউ কেউ নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করতে চাইছে।” তিনি পাহাড়ে অবৈধ অস্ত্রধারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেন।
তিনি বলেন, “সরকারের এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নির্বাচন। কেউ যদি সেটি বানচাল করতে চায়, ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া আর কোনো মিছিল বা সভা করা যাবে না।” সভায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তা, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন।

ধর্ষণবিরোধী অবরোধকে কেন্দ্র করে দুপুরের দিকে পাহাড়ি ও বাঙালি দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ছবিঃ সংগৃহীত
থমথমে খাগড়াছড়ি, আটকে যাত্রীরা
রোববার বিকেলে চট্টগ্রামের অক্সিজেন এলাকায় খাগড়াছড়িগামী বাস কাউন্টারে যাত্রীদের ভিড় দেখা যায়। কিন্তু বাস ছাড়ছে না। কাউন্টারের কর্মীরা জানায়, পথে পথে ব্যারিকেড ও গাছ ফেলে সড়ক বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, তাই গাড়ি পাঠানো সম্ভব নয়।
যাত্রী সাখাওয়াত হোসেন, কৃষক, জানান, “তিন ঘণ্টা ধরে দাঁড়িয়ে আছি। কাউন্টারের লোকজনও নিশ্চিত করে বলতে পারছে না বাস যাবে কি না।” পূজায় গ্রামের বাড়ি মাটিরাঙ্গায় যাওয়ার অপেক্ষায় থাকা এক দম্পতিও শেষ পর্যন্ত যেতে পারেননি।
অন্যদিকে খাগড়াছড়ি শহরে সকাল থেকেই থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। মোড়ে মোড়ে নিরাপত্তা বাহিনীর অবস্থান, দোকানপাট বন্ধ, জরুরি প্রয়োজনে বের হলে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
খাগড়াছড়ির এই অস্থিরতা এখন পুরো পার্বত্য অঞ্চলজুড়েই উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
সুত্রঃ প্রথম আলো