আগুনে বসতবাড়ির সবটুকু পুড়ে ছাই হয়ে মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। পড়ে রয়েছে পুড়ে যাওয়া টিন, ছড়িয়ে–ছিটিয়ে আছে ভস্মীভূত নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। ছবিঃ প্রথম আলো
মেলবোর্ন, ৩০ সেপ্টেম্বর- আগুনে বসতবাড়ির সবটুকু পুড়ে ছাই হয়ে মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। পড়ে রয়েছে পুড়ে যাওয়া টিন, ছড়িয়ে–ছিটিয়ে আছে ভস্মীভূত নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। উঠানে পড়ে আছে পোড়া মোটরসাইকেলের কাঠামো। রক্ষা পায়নি আয়–উপার্জনের দোকানটিও।
এই বিধ্বস্ত বসতভিটার পাশে বিষণ্ন মনে বসেছিলেন মিবু মারমা। ঘর হারানোর কষ্টের কথা বলতে গিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন তিনি। তাঁর স্বামী স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের ওয়ার্ড সদস্য।

বিধ্বস্ত বসতভিটার পাশে বিষণ্ন মনে বসেছিলেন মিবু মারমা। ছবিঃ সংগৃহীত
গতকাল সোমবার দুপুরে খাগড়াছড়ির গুইমারা উপজেলার রামেসু বাজার এলাকায় দেখা যায় এ দৃশ্য। গত রোববার বিক্ষোভ ও সহিংসতার সময় আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয় মিবু মারমার বাড়ি ও খাবারের দোকান। ওই দিন বাজারের দোকানপাট, বসতঘর ও ভবনে আগুন দেওয়া হয়। বাজারের দোকানমালিকদের অধিকাংশই পাহাড়ি, কিছু প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী বাঙালি। গতকাল সকালেও বিভিন্ন দোকান থেকে ধোঁয়া উঠছিল।
মিবু মারমা বলেন, “আমার ঘরবাড়ি না পুড়ে, আমাকেও আগুনের মধ্যে দিয়ে দিত। তাহলে আর এত দুঃখ–কষ্ট সহ্য করতে হতো না।”
শুধু মিবু মারমার ঘর নয়, পুরো বাজারজুড়ে আগুনের ক্ষতচিহ্ন। কিছু ঘর আংশিকভাবে টিকে থাকলেও সেগুলো আর মেরামতের উপযোগী নেই। সব হারানো মানুষের চোখে জল, কারও মধ্যে ক্ষোভ, কারও মধ্যে ভয়। আগুনের পরও ভয়ের ছায়া ভর করেছে পাড়ায়।
মিবু মারমা এখন সামনে দিন নিয়ে অনিশ্চয়তায়। আগুনে তাঁর মেয়ের আদরের বিড়ালও পুড়ে গেছে। ভেতর থেকে উঠে আসা যন্ত্রণায় তিনি বলেন, “কিছুই নাই, সব ছাই। ছাইয়ের ভেতরে ঢুকে যেতে ইচ্ছে করছে। ঢুকেও গিয়েছিলাম, কিন্তু স্বজনেরা আটকিয়েছিল।”

খাগড়াছড়ির গুইমারার রামেসু বাজারে আগুন দেওয়া হয়। ছবি : স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত
খাগড়াছড়িতে পাহাড়ি কিশোরীকে দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনার প্রতিবাদে অবরোধ কর্মসূচি দেয় পাহাড়ি সংগঠন ‘জুম্ম ছাত্র জনতা’। এই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে রোববার গুইমারার রামেসু বাজারে বিক্ষোভ ও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। পাহাড়িদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাল্টাপাল্টি ধাওয়া হয়, তাতে যুক্ত হয় স্থানীয় একটি পক্ষও।
ওসি এনামুল হক চৌধুরী জানান, সহিংসতায় তিনজন নিহত হলেও এখনো পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি। নিহতদের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়নি।
বিক্ষোভ চলাকালে সেনাবাহিনীর এক মেজরসহ আহত হন অন্তত ২০ জন। আগুনে পুড়ে গেছে অন্তত ৪০টি দোকান ও ৫০টির মতো বসতঘর। পুরো এলাকায় প্রায় এক হাজার মানুষের বসবাস।
রোববার থেকে খাগড়াছড়ি জেলা সদর ও গুইমারা উপজেলায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করেছে। যান চলাচল বন্ধ, দোকানপাট বন্ধ, জনজীবন অচল। সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্তও ১৪৪ ধারা বহাল ছিল। ‘জুম্ম ছাত্র জনতা’ তখনো অবরোধ প্রত্যাহার করেনি।
পুলিশ সুপার আরেফিন জুয়েল বলেন, “পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী টহলে আছে। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে।”

পাহাড়ি শিক্ষার্থীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় কয়েকদিনের অবরোধ, মিছিল ও সহিংসতার পর খাগড়াছড়িতে টানটান পরিস্থিতি বিরাজ করছে। ছবিঃ সংগৃহীত
সোমবার সকাল থেকে গুইমারা রামেসু বাজারে উত্তেজনা বিরাজ করে। সকালে অবরোধকারীরা অবস্থান নিলেও দুপুর নাগাদ সরে যান। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ক্ষতিগ্রস্তদের সঙ্গে কথা বলেন। বেলা একটার দিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বাজারে প্রবেশ করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন।
রোববার গুলিতে নিহত তিনজনের পরিচয়ও শনাক্ত হয়েছে। তাঁরা সবাই গুইমারা উপজেলার বাসিন্দা—আথুই মারমা (২১), আথ্রাউ মারমা (২২) ও তৈইচিং মারমা (২০)।
খাগড়াছড়ি সিভিল সার্জন মো. ছাবের জানান, আহত ১৪ জনকে সদর হাসপাতালে আনা হয়। ১৩ জন চিকিৎসাধীন, একজনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে পাঠানো হয়েছে।
জুম্ম ছাত্র জনতার ফেসবুক পেজে জানানো হয়, আহতদের চিকিৎসা ও নিহতদের সৎকারের সুবিধার্থে দুপুর ১২টা থেকে চট্টগ্রাম–খাগড়াছড়ি ও ঢাকা–খাগড়াছড়ি সড়কে অবরোধ শিথিল করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আহসান হাবিব পলাশ বলেন, ময়নাতদন্ত শেষে তিনজনের লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে। হামলাকারীদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার এবং অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান চালানো হবে।
চিয়া প্রু মারমা, নার্সিং কলেজের ছাত্রী, পুড়ে যাওয়া বসতঘরের সামনে বসে কাঁদছিলেন। বলেন, “আমাদের পাড়ার কেউ অবরোধে অংশ নেয়নি। এরপরও বাইরে থেকে লোকজন এসে ঘর পুড়িয়ে দিয়েছে। বই, খাতা, কলম—সব পুড়ে গেছে। এক কাপড়ে বের হয়েছি, এখনো সেভাবেই আছি।”
চিয়া প্রুর বাবার বাড়িটি ছিল আধাপাকা, চারপাশে আম, লিচু, নারকেল, সুপারির গাছ। আগুনের উত্তাপে সব পুড়ে গেছে। পাশে রামেসু বাজারে একই চিত্র—দোকানপাটের পোড়া কাঠামো, রাস্তার পাশে ছাই আর পোড়া মোটরসাইকেল।
বৃদ্ধা পাইসং মারমা গণমাধ্যমকর্মীদের দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তাঁর কাপড়ের দোকানটিও ছাই হয়ে গেছে। স্থানীয়রা জানান, রামেসু বাজার পাহাড়িদের কাপড়ের জন্য বিখ্যাত ছিল। এবারের আগুনে সেই দোকানগুলোরই সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে।
সাহ্লা প্রু মারমা বলেন, “কারা হামলা করেছে, তা বলার কিছু নেই। পাহাড়ি–বাঙালির মধ্যে এই ঘটনা ঘটেছে। বুঝে নিন, কারা পাহাড়িদের পাড়ায় আগুন দিয়েছে। অন্তত ৪০টি দোকান, ৫০টি বসতবাড়ি পুড়ে গেছে।”
বাজারে আগুন নিয়ে পাহাড়ি ও বাঙালি—দুই পক্ষই একে অপরকে দায়ী করছে, তবে কেউই নিজেদের সম্পৃক্ততা স্বীকার করছে না।
একই দিন ৮ দফা দাবি নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমা ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে জুম্ম ছাত্র জনতা। বৈঠকে অবরোধ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত হয়নি।
বিজিবির খাগড়াছড়ি সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মো. আবদুল মোত্তাকিম বিকেলে সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “এখানে পাহাড়ি–বাঙালি কোনো ভেদাভেদ নেই। আমরা সবাই মিলে সবার জন্য কাজ করছি। যারা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ঘটাচ্ছে, তাদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।” তিনি জানান, “শহরে ১০ প্লাটুন বিজিবি দিনরাত টহলে রয়েছে।”
সুত্রঃ প্রথম আলো