ময়মনসিংহে মন্দিরে তালা ভেঙে কালী-লক্ষ্মী প্রতিমা ভাঙচুর
মেলবোর্ন, ২৯ জুন- ময়মনসিংহ সদর উপজেলার একটি সার্বজনীন পূজা মন্দিরের তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে কালী ও লক্ষ্মী প্রতিমা ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে। সোমবার (২৯ জুন)…
মেলবোর্ন, ৬ অক্টোবর- বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা ভারতের শাড়ি শিল্পে মিশ্র প্রভাব ফেলেছে—কিছু ব্যবসায়ী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, আবার কিছু লাভবানও হয়েছেন।
ভারতের বারাণসির বাসিন্দা ৫৫ বছর বয়সী মোহাম্মদ আহমদ আনসারি সারা জীবন কাটিয়েছেন শহরের সরু, জনাকীর্ণ অলিগলিতে। ভারতের আধ্যাত্মিক রাজধানী বলে পরিচিত এই শহর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নির্বাচনী এলাকা। আনসারি কয়েক দশক ধরে বেনারসি শাড়ি বুনে আসছেন। তাঁতের মেশিনের টুংটাং শব্দ, মন্দিরের ঘণ্টা আর আজানের ধ্বনিতে ভরা এই প্রাচীন শহরটি হিন্দু-মুসলিম সংস্কৃতির মিলনস্থল হিসেবে পরিচিত।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর ব্যবসা নানা কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর মধ্যে নতুন সংযোজন হলো বাংলাদেশ-ভারত উত্তেজনা।
গত বছরের আগস্টে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর তিনি দিল্লিতে আশ্রয় নেন। সেই সময় থেকেই দুই দেশের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। বাংলাদেশে অভিযোগ ওঠে, ভারতের সমর্থনেই হাসিনা ক্ষমতায় টিকে ছিলেন। তাঁর পতনের পর দেশে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা হয়েছে, কারণ অনেকের ধারণা তারা হাসিনার সমর্থক ছিলেন। পাশাপাশি, বাংলাদেশের কিছু অংশে ভারতীয় পণ্যের বয়কট ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনাও ঘটেছে। বাংলাদেশ সরকার দাবি করছে, ভারত যেন হাসিনাকে ফেরত পাঠায়, যাতে তিনি দেশে মামলার মুখোমুখি হতে পারেন।
এপ্রিল মাসে বাংলাদেশ ভারত থেকে সুতা ও চালসহ কিছু পণ্য আমদানি সীমিত করে। প্রতিক্রিয়ায় ১৭ মে ভারত স্থলপথে বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত খাবার আমদানি নিষিদ্ধ করে। যদিও বাংলাদেশ এখনো সমুদ্রপথে শাড়ি রপ্তানি করতে পারে, কিন্তু তাতে সময় ও খরচ দুই-ই বাড়ছে।
বেনারসি শাড়ি তাদের নিখুঁত কারুকাজ, বিলাসবহুল রেশম ও সোনালি-রুপালি জরি কাজের জন্য বিখ্যাত। একটি শাড়ি তৈরি করতে ছয় মাস পর্যন্ত সময় লাগে, আর দাম হয় প্রায় এক লাখ রুপি পর্যন্ত।
আনসারি বলেন, “বাংলাদেশে উৎসব ও বিয়ের মৌসুমে এই শাড়ির ব্যাপক চাহিদা থাকে। কিন্তু এখন ব্যবসা ৫০ শতাংশেরও বেশি কমে গেছে।”
এর আগেও শিল্পটি নানা ধাক্কা খেয়েছে—দ্রুত নোটবন্দি, বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি, কোভিড-১৯ মহামারি, এবং সস্তা মেশিনে তৈরি শাড়ির প্রতিযোগিতা। এসবের প্রভাবে অনেক তাঁতি পেশা বদলাতে বাধ্য হয়েছেন। আগে যেখানে প্রায় ৪ লাখ তাঁতি ছিল, এখন তা নেমে এসেছে প্রায় ২ লাখে। কেউ কেউ শহর ছেড়ে চলে গেছেন, কেউ আবার রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন।
বারাণসির পাইকারি শাড়ি ব্যবসায়ী ৬১ বছর বয়সী পবন যাদব বলেন, “ঢাকায় সরকার পরিবর্তনের পর থেকে ব্যবসা একেবারে থমকে গেছে। আগে বছরে ১০ হাজার শাড়ি পাঠাতাম বাংলাদেশে, এখন পুরোপুরি বন্ধ।” তাঁর দাবি, বাংলাদেশের ক্রেতাদের কাছ থেকে প্রায় ১৫ লাখ রুপি পাওনা রয়ে গেছে, যা ফেরত পাওয়া এখন প্রায় অসম্ভব।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, কৃষিখাতের পর ভারতের বস্ত্রশিল্পেই সবচেয়ে বেশি মানুষ কাজ করেন—প্রায় ৩৫ লাখ। শাড়ি শিল্পের বাজারমূল্য প্রায় ৮০ হাজার কোটি রুপি, যার মধ্যে রপ্তানি আয় প্রায় ৩০ কোটি ডলার।
বেনারসের তাঁতি ও ব্যবসায়ীরা, যারা মোদিকে টানা তৃতীয়বার সংসদে পাঠিয়েছেন, এখন প্রধানমন্ত্রীর দিকে তাকিয়ে আছেন—বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য সংকটের সমাধান হবে কি না, সেটি দেখার অপেক্ষায়।
২০১৫ সালে মোদি সরকার ৭ আগস্টকে ‘জাতীয় তাঁত দিবস’ ঘোষণা করে তাঁতশিল্পের উন্নয়ন ও তাঁতিদের জীবনমান পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে খুব একটা পরিবর্তন দেখা যায়নি, অভিযোগ তাঁদের।
‘সেভ দ্য লুম’ নামের একটি সামাজিক উদ্যোগের প্রতিষ্ঠাতা রমেশ মেনন বলেন, “ভারতের তাঁতশিল্প অনন্য, কোনো দেশ এর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারে না। কিন্তু পর্যাপ্ত আয় না থাকায় অনেক শিল্পী পেশা ছেড়ে দিয়েছেন। এখন তরুণ তাঁতি খুঁজে পাওয়াই কঠিন হয়ে পড়েছে। তাঁতশিল্পকে টিকে থাকতে হলে এটিকে বিলাসবহুল পণ্য হিসেবে উপস্থাপন করতে হবে, দারিদ্র্যের প্রতীক নয়।”
অন্যদিকে, বেনারস থেকে প্রায় ৬০০ কিলোমিটার দূরের পশ্চিমবঙ্গে পরিস্থিতি একেবারে উল্টো। বাংলাদেশের সঙ্গে শাড়ি বাণিজ্যে নিষেধাজ্ঞা জারি হওয়ার পর রাজ্যের তুলার শাড়ি ব্যবসায়ীরা যেন নতুন প্রাণ ফিরে পেয়েছেন।
পশ্চিমবঙ্গের শান্তিপুরের ৬৫ বছর বয়সী তুলার শাড়ি ব্যবসায়ী তারকনাথ দাস বলেন, “বাংলাদেশি শাড়ি আমাদের বাজারের অন্তত ৩০ শতাংশ দখল করেছিল। এখন সেই জায়গা আমরা ফিরে পাচ্ছি। দুর্গাপূজার আগে বিক্রি গত বছরের তুলনায় ২৫ শতাংশ বেড়েছে।”
শান্তিপুর ও আশপাশের এলাকাগুলো (নদিয়া, হুগলি, মুর্শিদাবাদ) বহুদিন ধরেই ভারতের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্পের কেন্দ্র। এখানকার সূক্ষ্ম তুলার শাড়ি শুধু দেশে নয়, গ্রিস, তুরস্কসহ বিদেশেও রপ্তানি হয়।
নদিয়ার পাইকারি ব্যবসায়ী সঞ্জয় কর্মকার বলেন, “বাংলাদেশি শাড়ির কাপড় একটু উন্নত আর প্যাকেজিং আকর্ষণীয় হওয়ায় অনেক মহিলা সেগুলো কিনতেন। ফলে আমাদের বিক্রি কমে গিয়েছিল। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার পর বাজার আবার ঘুরে দাঁড়াচ্ছে।”
ফ্যাশন ডিজাইনার শান্তনু গুহ ঠাকুরতা বলেন, “বাংলাদেশের আমদানিতে সীমাবদ্ধতা সঠিক সময়েই এসেছে—উৎসবের মৌসুমের আগে। এতে দেশীয় তাঁতি ও ব্যবসায়ীরা ব্যাপকভাবে উপকৃত হয়েছেন।”
এইভাবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা ভারতের শাড়ি ব্যবসায় দুই রকম প্রভাব ফেলেছে—বারাণসিতে ক্ষতি, আর পশ্চিমবঙ্গে লাভ।
সুত্রঃ আল জাজিরা
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au